# এই দুঃসময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো নেতাই দায়িত্ব পাবে : তৃণমূল
# যেকোন চাপ সহ্য করার শক্তি আমাদের আছে : লুৎফর রহমান খোকা
# এখনও আমি নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করিনি : মামুন মাহমুদ
নির্বাচনের বছর। তাই রাজনৈতিক মাঠ গরম করার মাধ্যমে নেতা কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও কৌশল অবলম্বন করছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি। তবে ব্যাপক চাপের মধ্যে থেকেই তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হচ্ছে বলে দলটি থেকে বিভিন্ন সময় দাবি করা হয়। একদিকে সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের হুঙ্কার, বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের অনুমতি প্রাপ্তিতে প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং তার সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে আসা-যাওয়া।
তবে এসব চাপের মধ্যেও বড় চাপ হিসেবে সহ্য করতে হচ্ছে নিজ দলীয় কমিটির পদ নিয়ে বিরোধিতার চাপ। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সম্মেলনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে এই সম্মেলনকে সফলভাবে সম্পন্ন করাটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে সম্মেলনকে উৎসবমূখর করার জন্য জেলা বিএনপি সব রকমের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য দলের বেশ কয়েকজন নেতা প্রতিযোগিতায় থাকছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এরই মধ্যে তারা কাউন্সিলরদের সাথে যোগাযোগসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে কর্মী সংযোগ বাড়ানো এবং দলীয় হাই কমান্ডের বিভিন্ন মাধ্যমে লবিং করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছেন। শুধু জেলা বিএনপি নয়, খুব শীঘ্রই নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি, জেলা যুবদলসহ বিএনপির আর বেশ কিছু সংগঠনের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে।
তবে দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জেলা বিএনপির এবারের সম্মেলনকে সফল করতে দলীয় হাই কমান্ড থেকে শুরু করে স্থানীয় নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে চলছে সর্বোচ্চ চেষ্টা। সম্মেলনকে সফল করার জন্য একাধিক বৈঠক, সভা-সমাবেশসহ কেন্দ্রীয় কমিটির দিক নির্দেশনা চাওয়া এবং পরামর্শ আদান প্রদান চলছে ব্যাপকভাবে। তবে দলীয় এই কমিটিসহ নেতা কর্মীদের সঠিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য লোকেরাই এবার দায়িত্বে আসবে বলে তৃণমূলের প্রত্যাশা। একই সাথে সুবিধাবাদী, হাইব্রীড এবং সরকারের লিয়াজো করা নেতাদের কাছ থেকে সংগঠনটি মুক্তি পাবে বলেও মনে করেন তারা।
বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আসন্ন কাউন্সিলে সভাপতি পদের জন্য এখন পর্যন্ত তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম শোনা যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তারা হলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির বর্তমান আহবায়ক নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, জেল বিএনপির বর্তমান যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ও যুগ্ম আহবায়ক লুৎফর রহমান খোকা।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদকের পদের প্রার্থী তালিকায় চারজনের নাম শোনা যাচ্ছে বলে জানা যায়। তারা হলেন, জেলা বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব গোলাম ফারুক খোকন, যুগ্ম আহবায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীব, যুগ্ম আহবায়ক মোশারফ হোসেন ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শরীফ আহমেদ টুটুল। তবে এর মধ্যে সভাপতি এখন পর্যন্ত গিয়াস উদ্দিনের নামই বেশি শোনা যাচ্ছে। অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এখন পর্যন্ত নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে প্রস্তুত নন বলে জানা গেছে।
তিনি এখন পর্যন্ত দলীয় কাউন্সিলর ও নেতা কর্মীদের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি যাচাই বাছাই করছেন বলে জানা গেছে। একইভাবে মামুন মাহমুদ প্রার্থী না হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গিয়াস উদ্দিন সভাপতি পদে নির্বাচিত হবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক প্রার্থী থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষ করে বর্তমান সদস্য সচিব গোলাম ফারুক খোকন, যুগ্ম আহবায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত যোগ্য নেতৃত্বই কমিটির দায়িত্বে আসবে বলে তৃণমূল বিএনপির ধারণা। এরই মধ্যে জেলা বিএনপির এই কাউন্সিলকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার জন্য দলের পক্ষ থেকে ৬টি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উপকমিটিগুলো হলো- অর্থ, প্রচার, শৃঙ্খলা, অভ্যর্থনা, প্রকাশনা ও আপ্যায়ন উপ কমিটি। এর বাইরেও উপদেষ্টা ও নির্বাচন পরিচালনা নামে আরও দুটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে এর আগে সর্বশেষ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাবস্থায় ২০০৩ সালে শহরের চাষাঢ়ায় জিয়া হলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নারায়ণঞ্জ-৩ আসনের তৎকালীন এমপি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম সভাপতি এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার তৎকালীন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার (বর্তমানে বহিষ্কৃত) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে সময় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান নারায়ণঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন। এরপর থেকেই ক্ষমতার বাইরে আছে দলটি।
বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকাবস্থায়ই সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর শহরের আলী আহমেদ চুনকা পাঠাগারে দলের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে এড. তৈমূর আলম খন্দকার সভাপতি ও কাজী মনিরুজ্জামান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। একই সাথে সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন শিল্পপতি মুহাম্মদ শাহ আলম। এরপর সংগঠনটির আর কোন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ সাত বছর তারা এই কমিটির দায়িত্বে বহাল থাকলেও এর মধ্যে তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে ব্যর্থ হন।
এরপর কোন প্রকার সম্মেলন ছাড়াই ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে সময় জেলা বিএনপির কমিটিতে সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান সভাপতি এবং জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মামুন মাহমুদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের পহেলা জানুয়ারি এডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে আহ্বায়ক এবং অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সদস্য সচিব করে ৪১ সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
পরে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাহিরে গিয়ে মেয়র পদে নির্বাচন করায় সভাপতির পদসহ বিএনপির সকল পদ থেকে তৈমূর আলম খন্দকারকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটির মধ্যকার বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৫ নভেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনকে আহ্বায়ক ও গোলাম ফারুক খোকনকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
সেখানে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, মনিরুল ইসলাম রবি, শহিদুল ইসলাম টিটু, মাসুকুল ইসলাম রাজীব, লুৎফর রহমান খোকা, মোশারফ হোসেন ও জুয়েল আহমেদকে। সেই আহবায়ক কমিটিই বর্তমানে বলবৎ রয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১৭ জুন জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্মেলনের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন প্রতিকুলতার বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক লুৎফর রহমান খোকা বলেন, নারায়ণগঞ্জ বিএনপি এখন যেকোন সময়ের চেয়ে অনেক কম চাপে আছে। এর কারণ হলো এখন আমরা অনেক ঐক্যবদ্ধ এবং আমাদের সাংগঠনিক শক্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই যেকোন চাপ সহ্য করার মতো শক্তি আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। আমরা এখন ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে, তাদের (ক্ষমতাসীনদের) দিন শেষ।
আমাদের নিয়ে নিয়ে অবজার্ভ করতে করতে তাদের চোখ এখন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা কোন প্রতিবন্ধকতাকে তোয়াক্কা করছি না, মাথায়ও নিচ্ছি না। আমরা বিশ্বাস করি দায়িত্বশীলরাও এখন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এখানে কোন পদে একজন প্রার্থী থাকলে সেই পদে নির্বাচন হবে না। একাধিক প্রার্থী থাকলে সেখানে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দলীয় হাই কমান্ড যদি আমাদের নির্দেশনা দেয় আমরা সেটাও মেনে নিব। সব মিলিয়ে আমরা আশা করি ভালো কিছুই হবে। পদ পদবী পাওয়া রাজনীতিরই একটি অংশ।
তিনি আরও জানান, আমাদের যতটুকু দেখছি, বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে যা জানতে পারছি তাতে মনে হয় সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী সংখ্যা বেশি হবে। কিন্তু সভাপতি প্রার্থী হিসেবে এখনও কেউ নিজেদের ইচ্ছে প্রকাশ করেনি। তাই মামুন মাহমুদ প্রার্থী না হলে গিয়াস ভাই (জেলা বিএনপির আহবায়ক সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন) একাই থাকবেন। তবে শোনা যাচ্ছে মামুন মাহমুদও প্রার্থী হতে পারে। এখনও এক সপ্তাহের মতো সময় আছে, তাই সময় এলেই বুঝা যাবে। সাধারণত কাউন্সিলের দুই তিন আগে থেকেই এই বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসে।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, সম্মেলনের বিষয়ে আমরা সার্বিক আলোচনা বা প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। সমস্ত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করেই আমাদের বিভিন্ন থানায়, বিভিন্ন ওয়ার্ডে সম্মেলন হচ্ছে। আমরা যেসব কর্মসূচী পালন করছি সেখানেও বাধা থাকে, সেগুলো ওভারকাম করেই আমরা সম্মেলন করে আসছি। তিনি আরও জানান, সম্মেলনে আমাদের কাউন্সিলর, ডেলিগেটর ও নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিবেন যে, জেলার রাজনীতিতে কাকে প্রয়োজন।
অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে যারা জেলার নেতৃত্ব দেয়, তাদের মধ্য থেকেই একজন সভাপতি একজন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। এটা ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ওয়েতে হবে। তবে এখনও কোন পদের জন্য আমি নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করিনি। আমি আমার কাউন্সিলর, ডেলিগেটর এবং নির্বাহী কমিটির যারা আছেন তাদের সাথে আলাপ আলোচনা করছি। এখানে দলীয় নেতৃত্বের জন্য দলের ১০টি ইউনিটের ভোটার যারা আছেন সেই ১০১০ জন কাউন্সিলরের ভোটের নির্বাচন।
যদি তারা আমাকে বলে প্রার্থী হতে কিংবা আমার উপর যদি তাদের চাপ, পরামর্শ, প্রয়োজন কিংবা দাবি থাকে যে আমাকে নির্বাচন করতে হয় তাহলে আমি করবো। তবে সফল সম্মেলনে আমরা শতভাগ আশাবাদী। সম্মেলন সফল হবে, সার্থক হবে এবং সকলের উপস্থিতিরি মধ্য দিয়েই এই সম্মেলনকে আমরা সফল করবো।এস.এ/জেসি


