‘গডফাদার’ বজলুর সহযোগীকেই বেছে নিলেন ভোটাররা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৩, ০৮:১৭ পিএম
# চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের (৯ নম্বর ওয়ার্ড) উপনির্বাচনে বিজয়ী ‘ডেঞ্জার’ শমসের
রূপগঞ্জ উপজেলার অপরাধীদের আঁতুড়ঘর হিসেবে খ্যাত কায়েতপাড়ার ইউনিয়নের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল উপনির্বাচন। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তায় গতকাল সোমবার সকাল ৮টা থেকে ভোট শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে স্থানীয় গডফাদার হিসেবে পরিচিত প্রয়াত বজলুর রহমানের সহযোগী শমসের আলী খান ওরফে ডেঞ্জার শমসেরকেই বেছে নিলেন ভোটাররা। হাতি প্রতীকে তিনি ৩ হাজার ৬৪০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নূর আলম টিউবওয়েল প্রতীকে পেয়েছেন ৩ হাজার ১৯৭ ভোট। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তাজাল্লি ইসলাম সন্ধ্যায় এ ফলাফল ঘোষণা করেন।
কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে ১০টি ভোটকেন্দ্রে ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, দুই প্লাটুন বিজিবি, দুটি র্যাব টিম, ২৪৫ জন পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওয়ার্ডটিতে মোট ভোটার ২২ হাজার ৭ জন। ১০টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হয়। এই উপনির্বাচনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ১৬ জন। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল হক বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি।
চনপাড়ার পুনর্বাসন কেন্দ্রের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ছিল ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বজলুর রহমান বজলুর হাতে। বজলু মারা যাওয়ার পর চনপাড়ার ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য পদটি শূন্য হলে এখানে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। গতকাল অনুষ্ঠিত ভোটে বজলুর সহযোগী শমসের আলী খান ওরফে ডেঞ্জার শমসেরকেই নির্বাচিত করলেন ভোটাররা। শমসের আলী খান দীর্ঘদিন ধরে চনপাড়ার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় অস্ত্র, মাদক, হত্যা ও হামলা-ভাঙচুরসহ ১৩টি মামলা রয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র সাধারণ মানুষের কাছে চনপাড়া বস্তি নামে পরিচিত। গত দুই যুগে চনপাড়া অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ইয়াবা, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসা, নারী ব্যবসা ও অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই যে চনপাড়ায় ঘটে না। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকাগুলোর মাদকের অন্যতম প্রধান ডিলার পয়েন্ট চনপাড়া। চনপাড়া থেকেই এসব অঞ্চলে মাদক সরবরাহ করা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র চনপাড়া থেকে রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করা হয়। চনপাড়ায় টাকা হলেই মেলে ভাড়াটে খুনি। এখানকার অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশও পেরে ওঠে না। প্রায় সময় মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চনপাড়ায় অভিযান পরিচালনা করতে গেলে অপরাধীরা আগে থেকেই টের পেয়ে সটকে পড়েন। এতে চনপাড়ার বড় বড় অপরাধী রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এসব অপরাধের নিয়ন্ত্রণ করেন ওই ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অর্ধযুগ আগে চনপাড়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৭, ৮, ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বিউটি আক্তার কুট্টির হাতে। ২০১৯ সালের ২৬ জুন বিউটি আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর পর চনপাড়ার আধিপত্য চলে যায় বজলুর রহমান বজলুর হাতে। তিনি বনে যান চনপাড়ার অঘোষিত ডন। ২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর চনপাড়ায় র্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় বজলুকে গ্রেপ্তার করা হয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে বজলু কারাগারে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরে গত ৩১ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বজলুর মৃত্যুর পর থেকে চনপাড়ায় আধিপত্য নিতে কয়েকজন মরিয়া হয়ে ওঠেন। কয়েক মাসে চনপাড়ায় প্রায় এক ডজন হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষের মূলে রয়েছে জয়নাল গ্রুপ, ইয়াছমিন গ্রুপ, শমসের গ্রুপ, রায়হান গ্রুপ, শাহাবুদ্দিন গ্রুপ। তবে সবাইকে পেছনে ফেলে গতকালের উপনির্বাচনে শমসের আলী খান জয়লাভ করেন।
গত ১১ এপ্রিল জয়নাল গ্রুপ, শমসের গ্রুপ ও শাহাবুদ্দিন গ্রুপের মধ্যে রাতভর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৩ জন গুলিবিদ্ধসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। পরে ৩০ এপ্রিল পুলিশ চনপাড়ায় অভিযান পরিচালনা করে ১৩ জনকে দেশীয় অস্ত্রসহ আটক ও মাদক উদ্ধার করে। আবারও গত ১১ মে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে জয়নাল গ্রুপ, শমসের গ্রুপ ও শাহাবুদ্দিন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ওই ঘটনায় সৈয়দ নামে একজন গুলিবিদ্ধসহ তিন পক্ষের ২৪ জন আহত হন।
এলাকাবাসী মনে করেন, নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে চনপাড়ার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গেল শমসেরের কাছে। এতে চনপাড়ার মানুষের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এস.এ/জেসি


