Logo
Logo
×

রাজনীতি

আস্থা-বিশ্বাসের সাথে দায়িত্ব অর্পণ

Icon

মাহফুজ সিহান

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৩, ০৯:৩৬ পিএম

আস্থা-বিশ্বাসের সাথে দায়িত্ব অর্পণ
Swapno

 

# অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছি সবাইকে সম্মান দিয়ে কর্ম অনুযায়ী ফল দিতে চাই : গিয়াসউদ্দিন

 

 

প্রায় দেড় যুগের বেশি ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। ২০০৮’র নির্বাচনে আওয়ামীলীগের কাছে হারের পর ২০১৪ এবং ২০১৮ এর নির্বাচনে নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারেনি দলটি। মামলা-হামলা আর দ্বন্দ্ব-বিবাদে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির অবস্থা ছিলো একেবারে খাদের কিনারে। এরমধ্যে বারবার নেতৃত্ব বদল করলেও ঠিক যেন নেতৃত্বের অভাবেই বারবার হোঁচট খাচ্ছিল দলের নেতাকর্মীরা। তবে এরপর যেন রূপকথার গল্প।

 

২০২২ সালের নভেম্বরে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনকে আহবায়ক এবং জেলা যুবদলের সভাপতি গোলাম ফারুক খোকনকে সদস্য সচিব করে দায়িত্ব দেয়ার পরপর মোড় ঘুরে যায় জেলা বিএনপির। জেলার বিএনপির ইউনিটগুলো শক্তিশালী করার পাশাপাশি কেন্দ্র ঘোষিত প্রত্যেকটি কর্মসূচিতে ভালো পারফরমেন্স দেখায় জেলা বিএনপি। সততা- নেতৃত্বগুন আর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে তাই ১৪ বছর পর অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির সম্মেলনে মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের উপরই আস্থা রাখে বিএনপির কর্মীরা।

 

সম্মেলনের আগে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিনেই মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়ী হয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক পদেও গোলাম ফারুক খোকনকেই চাইছিলেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব প্রার্থী হলেও সম্মেলনের আগের রাতে গোলাম ফারুক খোকনকে সমর্থন দিয়ে সরে যান রাজীব। ফলে আর সম্মেলনে আর ভোট গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি।

 

তাই যেন জেলা বিএনপির সম্মেলনে আস্থা ও বিশ্বাসের সাথেই সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকনের সাথে দায়িত্ব অর্পণ করলেন নেতাকর্মীরা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই সম্মেলন নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের জন্য টনিক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। কেননা এই সম্মেলনের আগেই সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লার ইউনিট কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে।

 

গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল আবাসিক এলাকায় গিয়াসউদ্দিন ইসলামিক মডেল স্কুল এন্ড কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির সম্মেলনে নেতাকর্মীদের উৎসাহ ও উদ্দীপনার কোন কমতি ছিল না। সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দীর্ঘ সম্মেলনে নেতাকর্মীদের আগ্রহের হেরফের হয়নি। সম্মেলনে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন উদ্দিনের সভাপতিত্বে সদস্য সচিব গোলাম ফারুক খোকনের সঞ্চালনায় সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান।

 

প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ। বিশেষ বক্তা হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ টিটু। অতিথি হিসেবে ছিলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী মনিরুজ্জামান, মোস্তাফিজুর রহমান দিপু, আজহারুল ইসলাম মান্নান, নূরজাহান মাহবুব, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি আবু আসফাক ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মিলন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু।

 

সম্মেলনে জেলা বিএনপির নবনির্বাচিত সভাপতি ও সম্মেলন অনুষ্ঠানের সভাপতি সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন সামনের দিনগুলোতে কীভাবে তার দায়িত্ব পালন করবেন তাও স্পষ্ট করেছেন। বক্তব্যে মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘আমি ছাত্রজীবন থেকে সংগঠন করে আসছি। আমাদের ঐক্যের প্রয়োজন। আমাদের দলে অনেক সময় ভাল মন্দ থাকবেই। কারও বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মিথ্যাচার বা সত্য বলেও মান সম্মানে আঘাত করা যাবে না।

 

কোন ভাই নয়, শুধুমাত্র দলের নেতার প্রতি আনুগত্যশীল করে কাজ করতে হবে। ভাই ভাই করে দলকে বিভক্ত করা হচ্ছে। এভাবে কোন রাজনৈতিক দল সফলভাবে কাজ করতে পারে না। শুধুমাত্র আমরা যারা এমপি হতে চাই নেতৃত্ব দিতে চাই তাদের মধ্যে এই গলদ। শুধুমাত্র দলের নেতা ও দল হবে আমাদের। বাকি সব পরিহার করতে হবে। দলের মধ্যে একটি গুণ আনতে হবে। যারা নবীন, নেতৃত্বের প্রতিযোগীতা থাকবেই। তবে মুরুব্বিদের সম্মান দিতে হবে। এগুলো ভাল মানুষের কাজ না। মুরুব্বিদের সম্মান দিয়ে দল করতে হবে।

 

গিয়াসউদ্দিন আরো বলেন, ‘দলে প্রতিযোগীতা থাকবেই। এই প্রতিযোগিতা যেন হিংসাত্মক না হয়৷ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর বিদ্বেষ থাকা যাবে না। আমাদের কাছে আজ উদাহরণ তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে অনেক যোগ্য নেতা আছে। তারা অনেক সেক্রিফাইজ করেছেন। আমাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত করার জন্য তারা দলের কথা বিবেচনা করে মনোনয়ন নেননি। আমি অবশ্যই আপনাদের সম্মান দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করবো। যখন তা পারবো না এ দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাবো। আমি আপনাদের অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি প্রত্যেককে সম্মান দিতে চাই এবং কর্ম অনুযায়ী ফল দিতে চাই। ঘরে বসে থাকবে আর পকেটের হবে সে কাজ করতে আমি আসিনি’।

 

গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘দেশের মানুষ দোয়া করে তারেক রহমানের জন্য। কবে তিনি আসবেন আর এদেশের নেতৃত্ব দিবেন। আজ তিনি যদি ঢাকা এয়ারপোর্টে এসে নামেন কারও বাবার ক্ষমতা নেই ঠেকানোর। আজ চিটাগাংরোডে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা চাঁদা তোলে। দল ক্ষমতায় আসলে আমরা চাঁদা তুলবো, এ সকল আশা করে যারা রাজনীতি করেন তারা বাদ দেন। আসুন ভাল মানুষ দিয়ে সংগঠন করি খারাপ মানুষদের বিদায় করি। ভাল মানুষ ছাড়া এ রাষ্ট্রের উদ্ধার সম্ভব নয়। একটি প্রতীক‚ল অবস্থায় আমাদের রাজনীতি করতে হচ্ছে। এমন সময়ে এখানে কাউন্সিল করতে গিয়ে কী দুর্বিসহ অবস্থায় আমাদের পড়তে হয়েছে আপনারা তা জানেন।

 

আমি আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই। জেলা বিএনপি গঠনকাল থেকে যারা এ জেলাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের শ্রদ্ধা না জানালে কাজটি সঠিক হবেনা।’ এর আগে গিয়াসউদ্দিন আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক রাজীবকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আজ উদাহরণ তৈরি করেছে রাজীব। সে তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে খোকনকে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এটা যে কত বড় সেক্রিফাইজ। তোলারাম কলেজের মত জায়গায় সে প্রথম নির্বাচিত ছাত্রদলের ভিপি। সাংগঠনিক ক্ষমতা বক্তব্য দেয়ার যোগ্যতা সব তার আছে। তারপরেও তার এই সেক্রিফাইজ সবার মনে রাখতে হবে। যদি এমন সেক্রিফাইজ যদি করতে পারি তাহলেই দল করতে পারবো।’

 

সম্মেলনে জেলা বিএনপির দশটি ইউনিট কমিটির ১০১ জন করে মোট এক হাজার ১০ জন কাউন্সিলর এছাড়াও বিভিন্ন ইউনিট ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় দেড় হাজার ডেলিগেট উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনকে ঘিরে তিনটি নিরাপত্তা চৌকিতে প্রায় পুলিশের ৬০ জন সদস্য মোতায়েন ছিল। গত ১২ জুন রাতে রিটার্নিং কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল তফসিল ঘোষণার পর। ১৩ জুন মনোনয়নপত্র বিক্রি ও জমা নেয়া হয়।

 

সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের আলী আহমেদ চুনকা পৌর মিলনায়তনে এড. তৈমূর আলম খন্দকারকে সভাপতি ও কাজী মনিরুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সাত বছরেও তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে না পারায় ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাজী মনিরুজ্জামানকে সভাপতি ও অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি করা হয়। সাড়ে তিন বছর পর সে কমিটি ভেঙে দিয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুনরায় তৈমূর আলম খন্দকারকে আহ্বায়ক ও অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সদস্য সচিব করে ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়।

 

তবে ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচন করায় তৈমূর আলম খন্দকারকে আহ্বায়কসহ বিএনপির সকল পদ থেকে বহিষ্কার করে মনিরুল ইসলাম রবিকে ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক করা হয়। একই বছরের ১৫ নভেম্বর মনিরুল ইসলাম রবি ও মামুন মাহমুদের আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে আহ্বায়ক ও জেলা যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম ফারুক খোকনকে সদস্য সচিব করে নয় সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন