অতিনিকটে ঘনিয়ে এসেছে আগামী জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন সুত্রমতে এই বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কিংবা আগামী ২০২৪ সনের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন হতে পারে। নারায়ণগঞ্জ ঢাকার লাঘব জেলা হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে এ জেলাটি গুরুত্বপুর্ণ। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জকে আওয়ামী লীগের সুথিকাগার বলা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও বিভিন্ন সভায় তাদের বক্তব্যে তা বলে থাকেন।
তবে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে উত্তর দক্ষিন মেরু নিয়ে দলের মাঝে কোন্দল তৈরী হয়ে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের অনুসারীদের উত্তর মেরু হিসেবে চিনেন দলীয় নেতা কর্মীরা। তাদের বিপরীতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা.সেলিনা হায়াত আইভী বলয়ের নেতা কর্মীদের দক্ষিণ মেরু হিসেবে জানেন। স্থানীয় ভাবে ক্ষমতাসীন দলের মাঝেও তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এই দুই মেরুর কোন্দল নিরসনের জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ একাধিকবার বসেও তা সমাধান করতে পারে নাই। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সহ অন্যান্য নির্বাচন আসলেই তাদের এই কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসে।
এদিকে ঢাকঢোল বাজিয়ে ঝাঁকজমক ভাবে ২০২২ সনের ২৩ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে নতুন নেতৃত্ব আশা করলেও পুরাতনরাই বহাল থাকায় নেতা কর্মীরা হতাশ হয়ে সম্মেলন থেকে ফিরে যান। তবে সম্মেলনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ১ মাসের মাঝে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা দিতে নির্দেশ দিলেও তা মানা হয় নাই। সম্মেলনের ছয় মাস পরে কেন্দ্রে জেলা আওয়ামী লীগের তালিকা পৃথক ভাবে পাঠানো হয়।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহিদ বাদল পৃথক ভাবে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দেন। তবে এই তালিকা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। দেখা যায় তালিকা নিয়ে উত্তর দক্ষিন মেরুর প্রভাব রয়েছে। এছাড়া তালিকা জমা দেয়া নাম নিয়ে নানা সমালোচনা তৈরী হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় জেলার শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ উঠেছে দুই নেতার জমা দেয়া নামের তালিকায় ত্যার্গী নেতাদের নাম বাদ দিয়ে নতুন বিতর্কিতদের নাম পাঠিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে যুক্ত এবং দুঃসময়ে পাশে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেরই ঠাঁই হয়নি খসড়া কমিটিতে। চেনা-জানা নেই, আওয়ামীলীগের রাজনীতির ইতিহাসও নাকি এমন ব্যক্তিরাই খসড়া তালিকায় স্থান পাওয়াটাও রহস্য জনক।
তাছাড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকায় কারা স্থান পাবে সেটি নিয়ে সম্মেলনের পরপরই বিভেদে জড়িয়ে পড়েন সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছায় কর্মসূচির অনুষ্ঠানেও পাল্টাপাল্টি করতে দেখা যায়। বিষয়টি কেন্দ্রে গড়ানোর পরও কেন্দ্রও সমাধান করতে বেগ পেতে হয়। গোপনীয়তায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একত্রিত হলেও তাতে কোন সুরাহা হয়নি। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রের কঠোর চাপে পৃথকভাবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জেলা আওয়ামীলীগের খসড়া তালিকা জমা দেন।
দলীয় সুত্র মতে, নির্দেশনা ছিল তারা সবার সঙ্গে আলোচনা করে জেলা আওয়ামলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দিবে। তারপর কেন্দ্র যাচাই-বাছাই করে সেই কমিটি অনুমোদন দিবেন। কিন্তু ৭ মাসেও আলোর মূখ দেখেনি জেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে। তাদের মতে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলকে শক্তিশালী করার জন্য আওয়ামীলীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা দিয়েছেন।
অথচ নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ নেতারা নিজের পছন্দের লোককে কমিটিতে অন্তুর্ভুক্ত করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে দুরত্বের সৃষ্টি করছেন। আর এর প্রভাব পড়ছে তৃণমূলে। এভাবে চলতে থাকলে এবং অচিরেই জেলা আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হলে আগামী নির্বাচনে দলের সাংগঠনিক অবস্থা নড়বড়ে হয়ে যাবে।
দলীয় সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক এড. আবু হাসনাত মো. শহিদ বাদল পৃথক পৃথক ভাবে ৭৫ সদস্যের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি তৈরি করে তা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জমা দিয়েছেন। তবে এই কমিটি কবে নাগাত জমা হবে তা জেলার নেতৃবৃন্দ জানেন না। তাই জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা এই কমিটির অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
অপরদিকে আগামী নির্বাচন ঘিরে নারায়ণগঞ্জের-৫টি আসনের মাঝে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৫ এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী দেয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দলে নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন যাবৎ দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০১৮ সনের নির্বাচনের পর তাদের এই দাবী জোরালো হতে থাকে। সম্প্রতি সময়ে দলীয় কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের নেতারা দাবী জানান তারা নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে নৌকা চান।
বিশেষ করে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা নৌকায় ভোট দিতে পারছে না। আর এ নিয়ে তাদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ- ৩ আসনে একই অবস্থা হয়ে রয়েছে। তারা এখানে নৌকায় ভোট দিতে চান। তাছাড়া এখানে আওয়ামী লীগের দলীয় এমপি না থাকায় নেতা কর্মীরা অবহেলিত হয়ে রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
এই দুই আসনে আওয়ামী লীগের অন্তত ডজন খানিক মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি নানাভাবে তারা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই সাথে এখন থেকে নৌকার জন্য ভোট চেয়ে যাচ্ছেন। তবে তারা চান নির্বাচনের আগে জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অুনমোদন হোক। আর এজন্য নেতারা কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুল হাইকে সভাপতি, তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহসভাপতি করে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও মত পার্থক্যের কারণে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও ৬টি পদ পূরণ করা হয়নি। এস.এ/জেসি


