এমপির দাপটে গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে বিতর্কিত কাউন্সিলর মতি
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৩, ০৮:২২ পিএম
# এটা হচ্ছে প্রশাসনের দুর্বৃত্ত লালনের উদাহরণ : রফিউর রাব্বি
এক সময়ের দুর্ধর্ষ ত্রাস হিসেবে খ্যাত সিদ্ধিরগঞ্জের ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতির হাতে আলাদীনের চেরাগের ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তারা বলছেন, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুদকের মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও মতি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনকি তাকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের সাথে সিদ্ধিরগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে হাস্যেজ্বল অবস্থায় দেখা গেছে।
অথচ সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, দুদকের মামলায় কাউন্সিলর মতির বিরুদ্ধে যে গ্রেফতারি ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে সেটি তারা হাতে পাননি। হাতে পেলেই তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এদিকে নাম প্রকাশ করার শর্তে একাধিক সূত্র বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছে, দুদকের মামলা ঈদুল আজহার আগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও তা এখনো থানায় না পৌঁছানোর বিষয়টি সত্যিই বিষ্ময়কর।
তারা বলেন, বিতর্কিত কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত। এমনকি নানা সময়ে মতির কার্যকলাপ নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মিয়ার সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে মতির ব্যাপারটিকে বড় করে দেখার নজির ছিল। আর এ কারণেই মনে হয়, দুদকের মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে অদৃশ্য ক্ষমতার বলে। এখানে মতির আলাদীনের চেরাগ কাজ করছে বলে মনে করেন অনেকে।
মতির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো প্রসঙ্গে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে এটাকে বিচার ব্যবস্থা বলা চলে না। আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা এটা সম্পূর্ণ শাসক দলের নিয়ন্ত্রণাধীন। শাসকদলভুক্ত যারা আছে তাদের পক্ষ নেয়ার জন্য এই পুলিশ প্রশাসন সেখানে কাজ করে ভূমিকা রাখে।
যার ফলে মতির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার পরেও সে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। আর পুলিশ বলবে আমরা এই পাইনি, ওই পাইনি, তাকে খুঁজে পাইনি। এরকমটা তারা দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে। এটা হচ্ছে প্রশাসনের দুর্বৃত্ত লালনের উদাহরণ।’ ঈদের আগে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
এ ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এদিকে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও ঈদুল আজহার পর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের পাশে সিদ্ধিরগঞ্জের এক কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছে কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতিকে। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালকের দায়ের করা মামলায় (নং ৭(২)২২) নাসিক ৬নং ওয়ার্ডের সিদ্ধিরগঞ্জ আদমজী নগর সুমিলপাড়া এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে কাউন্সিলর মতির বিরুদ্ধে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আদালত সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ১৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মতিউর রহমান (মতি) ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বও দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. ইব্রাহীম আদালতে মতি ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক চার্জশিট দাখিল করেন।
সূত্র জানায়, তদন্তকালে আসামি মতিউর রহমান মতির নামে ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ও তার স্ত্রী রোকেয়া রহমানের নামে ৮ কোটি ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পায় দুদক। এর আগে ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মতিউর রহমান ৬ কোটি ৬২ লাখ ৮২ হাজার টাকা ও তার স্ত্রী রোকেয়া রহমান ২ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকার সম্পদের হিসাব প্রদর্শন না করে মিথ্যা তথ্য দেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রথম মামলায় কাউন্সিলর মো. মতিউর রহমানের (মতি) বিরুদ্ধে ৬ কোটি ১ লাখ ৭২ হাজার ২৬৫ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনসহ ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৫ হাজার ৬৩৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে ৮২ কোটি ৫১ লাখ ৪২৪ টাকা জমা করে পরবর্তীতে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৮৯ টাকা উত্তোলন করে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর করে অবস্থান গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্যদিকে অপর মামলার এজাহারে কাউন্সিলর মতির স্ত্রী রোকেয়া রহমানের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৬১ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৭ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন ব্যাংকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ১ কোটি ৮৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩৯৫ টাকা জমা করে সেখান থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৮ টাকা উত্তোলন করে তা স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরপূর্বক অবস্থান গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
দুদকের মামলায় মতির গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন যুগের চিন্তাকে বলেন, যুবলীগ নেতা মতি কেন, কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ভুল ত্রুটি, অন্যায়ের দায় দল কখনো বহন করবে না। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলেছেন, কোন দুর্নীতিবাজের পক্ষে তিনি এবং দল থাকবেনা। আমরা শেখ হাসিনার কর্মী, তাই তার কথাই আমাদের কথা। মতির কুকর্ম একান্ত তার ব্যক্তিগত। এখানে দল কোন দুর্নীতিবাজের দায় নেবে না।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান যুগের চিন্তাকে বলেন, মতি আমাদের দলের যুবলীগ নেতা। সে আমাদের সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতে এসেছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে এটা আমরা জানি। কিন্তু কোথায় গিয়ে কি কি দুর্নীতি করেছে কোন কুকর্ম করেছে সেটা তো দল এবং দলের নেতাকর্মীরা জানেনা। কারো ব্যক্তিগত কুকর্মের দায় কখনোই দলের উপর বর্তায়না। মতির দুর্নীতির যে তদন্ত হচ্ছে তা আইনের নিজস্ব গতিতেই চলবে। দল কিংবা দলের নেতাকর্মীরা কোন ব্যক্তির কুকর্মের জন্য দায়ী না। এস.এ/জেসি


