# জাতীয় পার্টি থেকে কেন নিবে, আওয়ামী লীগে চলে আসুক : মেয়র আইভী
# তাদের জন্যই নিশ্চিত জয়ের পথে থেকেও পরজিত হয়েছিল নাজমা রহমান
# গাঞ্জার নৌকা আখ্যা দিয়ে তাল গাছে উঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন সেলিম ওসমান
আওয়ামী লীগের নৌকা এবং জাতীয় পার্টির লাঙ্গল, এই দুইয়ের মধ্যে অনেক আগে থেকেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবার। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবতই আলোচনা সমালোচনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক বোদ্ধাদের প্রশ্ন করতে দেখা যায় ওসমান পরিবার আসলে কোন দলের রাজনীতি করে ? জাতীয় পার্টি নাকি আওয়ামী লীগ। বলা যায় নৌকার চেয়েও লাঙ্গলের প্রতি তাদের এক ধরণের বিশেষ টান আছে।
যা এর আগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নির্বাচনের সময় তার প্রমাণ তারা দিয়েছে বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রে একটি বক্তব্যে বিষয়টিকে যেন আরও তাতিয়ে দিয়েছে। গত ১৬ জুলাই জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জেলা আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত বর্তমান এমপি একেএম সেলিম ওসমানকে জাতীয় পার্টি ছেড়ে আওয়ামী লীগে এসে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার আহবান জানান নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী।
এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই নৌকার প্রার্থী দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়ে এবং সেলিম ওসমানকে আওয়ামী লীগের ঘরের ছেলে উল্লেখ করে লাঙ্গল ছেড়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার আহবান জানান। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ এই শহরের মধ্যে জাতীয় পার্টি থেকে যাকে (মনোনয়ন) দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টি থেকে কেন নিবে, আওয়ামী লীগে চলে আসুক। আওয়ামী লীগের ঘরের সন্তান আওয়ামী লীগ থেকে (মনোনয়ন) নিক, তা না হলে অন্য কাউকে দেক। প্লিজ এইভাবে আমাদের আর ডিপ্রেশনে রাখার দরকার নাই। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কবির বিন আনোয়ার।
নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের দাবি একেএম সেলিম ওসমান একদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন একই সাথে লাঙ্গলের গুণকীর্তন করতে গিয়ে নৌকা প্রতীককে নাজেহাল করেন। এর আগে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বন্দরে একটি স্কুলের নবনির্মিত ভবন উদ্বোধন করতে গিয়ে নৌকা প্রর্তীককে গাঞ্জার নৌকা আখ্যায়িত করে তা তালগাছে উঠবে বলে ঘোষণা করেন।
সে সময় তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে লুটেরা উল্লেখ করে তাকে খারাপ প্রমাণের চেষ্টা করেন এবং একই সাথে তার নিজ দলীয় (লাঙ্গলের) প্রার্থী যিনি দুর্নীতিবাজ ও স্থানীয়ভাবে অপরাধ জগতের রাজা হিসেবে পরিচিত সেই প্রার্থীকে সাধু এবং দুধে ধোয়া বলে প্রমাণের চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকেও এই খারাপ ও ভালো মানুষকে চিনে রাখার জন্য বলেন তিনি। এমন লোকের নির্বাচনে কাজে যাওয়ার জন্য বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিদকেও ভর্ৎসনা করেন তিনি।
একই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ হিসেবে দাবিদার একেএম শামীম ওসমানের সমর্থকরা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে জাতীয় পার্টির পক্ষে কাজ করেন। এতে শামীম ওসমানের সমর্থন না থাকলে তার ভক্তরা এমন সাহস পেতেন না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সচেতন মহল।
তবে ওসমান পরিবারের বা শামীম ওসমানের এই লাঙ্গল প্রীতি এই প্রথম নয় বলে দাবি তৃণমূল আওয়ামী লীগের। ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে যখন জাতীয় পার্টির স্বৈরাচার সরকার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে পতনের চেষ্টায় জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে একেএম নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে লড়াই করায় শামীম ওসমান তখনকার আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী অধ্যাপিকা নাজমা রহমানের বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের অনেকে। আর এই বিরোধিতা করার জন্যই নিশ্চিত জয়ের পথে থেকেও পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল নাজমা রহমানকে।
বিভিন্ন তথ্য সুত্রে জানা যায়, গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপস্থিতিতে সেলিম ওসমান বলেছিলেন প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী দেয়া হবে। অন্যদিকে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর যাবৎ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের কোন এমপি না থাকায় এখানকার আওয়ামী লীগের হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
অবহেলিত উপেক্ষিত এসব নেতা কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্য দীর্ঘদিন যাবতই এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। সম্প্রতি এই দাবি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রায় সকল স্তর থেকেই জোরালোভাবে শুরু হয়েছে। তাই মেয়রের এরকম দাবির পর নড়েচড়ে বসেছে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি বিরাট অংশ। যদিও জাতীয় পার্টির নেতা কর্মীদের ধারণা সেলিম ওসমানের পক্ষে এমনটা করা সম্ভব হবে না। তিনি জাতীয় পার্টি ছেড়ে অন্যকোন দলের প্রার্থী হবেন না।
কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু অংশ মনে করেন রাজনীতিতে যেমন শেষ বলে কোন কথা নেই, তেমনি ওসমান পরিবারের পক্ষেও করবে না বলে কোন শব্দ নেই। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে যদি নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ভয় থাকে এবং আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণ পর্যায় থেকে যদি গ্রীণ সিগন্যাল পাওয়া যায় তাহলে হয়তো ওসমান পরিবার রাজী হতেও পারে।
কিন্তু লেবাস পরিবর্তন করে লাঙ্গল ছেড়ে নৌকার কান্ডারী হলেও তিনি তার দলীয় চেল্লাদের ছাড়তে বা আওয়ামী লীগের অবহেলিত, নির্যাতিত ও অভিমানকারী নেতা কর্মীদের কাছে টানতে পারবেন কি না সেসব বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন তারা। এস.এ/জেসি


