বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত কারণে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেয় জাতীয় পার্টিকে। এরপর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ এই দুটি আসন জাতীয় পার্টির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই থেকেই এই দুই আসনে আর নৌকার প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
তবে গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এই দুই আসন থেকে নৌকার প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার জোর দাবি তোলা হয়। সেই মতে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মী তাদের তৃণমূলের সাথে তাল মিলিয়ে নৌকার দাবি তুললে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের অনেকেরই ধারণা ছিল হয়তো এবার এই আসন দুটি থেকে নৌকার প্রার্থী দিবেন। আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা বেশ জোর দিয়েই বলেছিলেন জাতীয় পার্টিকে নারায়ণগঞ্জের কোন আসনেই ছাড় দেয়া হবে না।
তবে শেষ পর্যায়ে ওসমান পরিবারের পক্ষ থেকে যখন জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে একেএম সেলিম ওসমানের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় তখন আওয়ামী লীগের সেসব নেতাদের অনেকেই সেই দাবি থেকে সরে আসেন এবং বলতে শুরু করেন নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিবেন তার পক্ষেই কাজ করবেন। তবে গত নির্বাচনের আগের পরিবেশের সাথে এবারের আওয়ামী লীগের নির্বাচন পূর্ব পরিবেশও প্রায় একই রকমের বলে মনে করছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগ।
তৃণমূলের দাবি গত নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে এসে ওসমান পন্থী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের দাবির সুর ঘুরে তাদের প্রভূ সেলিম ওসমানের প্রতি যেমন সহানুভূতিশীল হতে দেখা যায়। যার ফলে শেষ মুহুর্তে এসে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসন থেকে নৌকার সেই দাবি ধুপে টিকেনি। এবারের নির্বাচনের হাওয়ার শুরুতেও সেই একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়।
গত বছরের শেষ দিকে এবং এই বছরের শুরুর দিকে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসন থেকেই নৌকার দাবিতে সোচ্চার হন ওসমান পরিবার ব্যতীত নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রায় সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তাদের দাবি এতটাই জোরালো ছিল যে, অনেকেরই ধারণা ছিল এবার আর গতবারের মতো হবে না। একটি পক্ষ থেকে দূরে এসে দল ও তৃণমূলের সাথে মিলে মিশে তারাও একাকার হয়ে গেছেন।
কিন্তু স্বার্থের কাছে তারা আবারও দলকে বিকিয়ে দিচ্ছেন বলে তৃণমূলের দাবি। বরং এখন তারা জাতীয় পার্টিকে এই আসন দুটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য কৌশলে বিভিন্ন সভা সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে লাঙ্গলের দাবিতে কাজ করতে শুরু করে দিয়েছেন জাতীয় পার্টির জনপ্রতিনিধিগণ। তাই জাতীয় পার্টির জনপ্রতিনিধি, নেতা ও কর্মীদের সাথে আওয়ামী লীগের জাতীয় পার্টি মার্কা নেতাদের বক্তব্যে ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের দাবি।
সূত্র মতে, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসন থেকেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থী দেওয়ার দাবি উঠে। এমনকি গত নির্বাচনের আগে এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূলসহ জেলা পর্যায়ের নেতারা অনেকটাই আশাবাদী ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়ে ছিলেন, জোটবদ্ধ নির্বাচন হলেও এবার জাতীয় পার্টিকে নারায়ণগঞ্জের কোন আসনে মনোনয়ন দেয়া হবে না। বিষয়টি নিয়ে তারা দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথেও আলাপ করেছেন বলে জানান তারা।
অন্যদিকে স্বাধীনতা বিরোধীদের ঠেকাতে প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই লাঙ্গলের প্রার্থী দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়ে ছিলেন জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। সেলিম ওসমানের এমন মন্তব্যে হাসি ঠাট্টাও করেছেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তার এ ধরণের বক্তব্য এরশাদের মতোই লাগামহীন বলে উল্লেখ করেন তারা।
তাদের মতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী ও সমর্থক থাকার পরও লিয়াকত হোসেন খোকাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এমন কি লিয়াকত হোসেন খোকা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাঁড়ালেও উৎরাতে পারবেন না বলে হাসি ঠাট্টা করেন তারা। সে সময় খোকার দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নাম আসে এরশাদকন্যা খ্যাত অনন্যা হোসাইন মৌসুমীর নাম।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সেলিম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ (প্রয়াত) একেএম নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমান কিংবা সন্তান আজমেরী ওসমান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন বলেও বিভিন্ন মাধ্যমে আভাস পাওয়া যায়। তবে শেষ পর্যায়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে একটি পক্ষ তাদের দাবি থেকে সরে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির দাবিকে প্রাধান্য করে তুলে এবং প্রতিষ্ঠিত করে।
এবারেও সেই একই নাটকের মঞ্চায়ন হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের দাবি। বছরের শুরুতেও নৌকার দাবিতে সোচ্চার থেকে অনেকেই এখন লাঙ্গলের দায়িত্ব কাধে তুলে নিতে সম্মতি জানিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন বলে মনে করেন তারা। নির্বাচনের মাঠে এখন লাঙ্গলের দাবি যতটা জোরালো হচ্ছে নৌকার দাবি ততটাই দুর্বল হচ্ছে উল্লেখ করে এবারও নৌকার দাবি প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে বলে হতাশা প্রকাশ করছেন তারা। এস.এ/জেসি


