নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির জটিল হিসাব-নিকাশ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৭:৫৪ পিএম
# দুই আসনে জাতীয় পার্টির দখলেই থাকবে আশাবাদ নেতাদের
বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের ভারত সফর ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দলটিকে নিয়ে রাজনীতির ময়দানে নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি দেখা গেছে, জিএম কাদের ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে একাধিক বৈঠক যেমন করেছেন, তেমনি ভারত সফরে গিয়ে বিভিন্ন মহলে বৈঠক করেছেন। কিন্তু বৈঠকের বিষয়ে কি কথা বলেছেন তা নিয়ে তিনি মুখ খুলেন নাই। দলটির একাধিক সিনিয়র নেতাদের মতে, নির্বাচন আসলেই জাতীয় পার্টিতে এ ধরণের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এটিকে তারা 'নতুন খেলা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়ায় ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল।
কিন্তু আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি কি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে থাকবে নাকি বিএনপির সাথে থাকবে- এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। যদিও দলের কেউ কেউ বলছে আওয়ামী লীগ বিএনপি দুই দলই তাদের টানছে। তবে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেই জাতীয় পার্টিকে নিয়ে এক ধরনের টানা হেচরা চলে। যা নিয়ে তাদের দলের মাঝেও অস্বস্তি তৈরী হয়। আর এ নিয়ে জাতীয় পার্টির এমপিরাও ধোয়াশায় পড়ে যান।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের মাঝে দুটি আসন দীর্ঘ দিন যাবৎ জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন ২০০৮ সন থেকে এখন পর্যন্ত জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। তখন জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের মহাজোটের সাথে জোট গঠন করে ক্ষমতায় আসে। পরবর্তীতে একই ভাবে ২০১৪ এবং ২০১৮ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শরীক দল হয়ে মহাজোট গঠন করে নির্বাচনে আসেন।
জানা যায়, ২০০৮ সনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনীত হয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত নাসিম ওসমান এমপি নির্বাচিত হন। একই ভাবে এই আসন থেকে ২০১৪ সনের নির্বাচনেও তিনি বিনা ভোটে সংসদ সদস্য হন। কিন্তু নির্বাচনের কিছু দিন পরে প্রয়াত সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর এই আসন থেকে তারই সেলিম ওসমান উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেও পরিচিত।
২০১৮ সনের নির্বাচনেও সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। তবে তিনি আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবেন কি না তা নিয়ে এখনো মুখ খুলেন নাই। কিন্তু নিবার্চন তার কাছে কোন বিষয় নয়। সদর বন্দরের মানুষ চাইলে তিনি আবারও সেবা করতে চান।
অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনটিও টানা দুইবার জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। ২০১৪ সনে এখান থেকে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনীত হয়ে লিয়াকত হোসেন খোকা বিনা ভোটে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তখন জাতীয় পার্টির আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোটে থাকায় তারা সহজে জয় পেয়ে যান। কেননা ওই তখন বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তারা আওয়ামী লীগের সাথে একক ভাবে নির্বাচন করেন।
পরবর্তীতে ২০১৮ সনের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাথে লড়াই করে এই আসন থেকে জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন খোকা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির এই এমপির পক্ষে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাও কাজ করেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতরাও বিভিন্ন সভা সমাবেশে দাবী করে বলে থাকেন তারা কাজ করে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নির্বাচিত করেছেন। কেননা তারা মহাজোট থেকে প্রধামন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত হয়ে নির্বাচন করছেন।
যদিও আগামী নির্বাচনে নারয়ণগঞ্জ-৩ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগেে নেতারা। ২০১৮ সনের নির্বাচনের পর থেকে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী দেয়ার দাবী জানিয়ে আসছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছেও এই দাবী তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাদের দাবী পুরণে নেতারা আশ্বাস দিলেও তা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে গুঞ্জন উঠেছে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সাথে মহাজোটে থাকতে পারে। অন্যথায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একক ভাবে নির্বাচন করতে পারে। আওয়ামী লীগ একক ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জাতীয় পার্টির জন্য দুঃসংবাদ হতে পারে। কেননা আগামী নির্বাচন হবে চ্যালেঞ্জের নির্বাচন। চ্যালেঞ্জিং প্রতিযোগিতায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের জয়ী হওয়া কঠিন হবে। তাই আগামী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এখন থেকেই জাতীয়ে পার্টিকে নিয়ে হিসেব নিকেশ হচ্ছে।
দলীয় সুত্রমতে, জাতীয় পার্টি বিএনপির দিকে যাবে নাকি আওয়ামী লীগের সাথেই থাকবে। নাকি একাই নির্বাচন করবে এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নেতা কর্মীদের মাঝে। এবারও সেটা হচ্ছে। তবে দল নিজের মতো করেই সিদ্ধান্ত নেবে, বলে জানান জাতীয় পার্টির হাই কমান্ড।
রওশন এরশাদ চাইছেন আওয়ামী লীগের সাথে যোগসূত্র করেই নির্বাচনের মাঠে যেতে আর জি এম কাদের মনে করছেন দলকে টিকিয়ে রাখতে হলে ‘আওয়ামী লীগের বিরোধিতা’ করাই যৌক্তিক হবে। জিএম কাদের গত কয়েকমাস ধরে সরকার বিরোধী নানা বক্তব্য দিচ্ছেন। দলটির কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলেছেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টি তাদের 'সরকার বিরোধী' অবস্থান তুলে ধরতে চায়। নির্বাচনে দলটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এ বিষয়টিকে অনেক জরুরি মনে করেন।
তবে জাতীয় পার্টির ভেতরে আরেকটি অংশ মনে করছে আওয়ামী লীগের পাশে থাকা তাদের জন্য ভালো হবে। তবে নির্বাচনে তারা একক ভাবেই অংশ নিতে চান, যাতে করে জাতীয় পার্টির সিদ্ধান্তের কারণে 'বিএনপি কোনো সুযোগ' না পায়।
জাতীয় পার্টির নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনের বিষয়ে গত ডিসেম্বরেই প্রধানমন্ত্রী একটি বার্তা তাদের দিয়েছিলেন। তিনি তখন জাতীয় পার্টিকে এককভাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দল গুছানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টিকে ঘিরে সরকারের তরফ থেকে কিছু চিন্তা ভাবনা আগে থেকেই চলমান আছে।
এখন জি এম কাদেরের ভারত সফরের পর তাই আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্লেষকদের কাছে। জাতীয় পার্টির হিসেব নিকেশের সাথে নারায়ণগঞ্জের দুটি আসন নিয়ে জটিল সমীকরণ হচ্ছে। কেননা আগামী নির্বাচন চ্যালেঞ্জমুখি হলে এখানেও তারা আগের মত সহজে জয় পাবে না বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধমহল।
জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সানা উল্লাহ জানান, নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টি কেন্দ্র থেকে যে ভাবে নির্দেশনা দিবে তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। জেলার ৫টি আসনে তাদের প্রার্থী রয়েছে। আগামী নির্বাচনে দুটি আসন জাতীয় পার্টির অনুকুলে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস করি। এস.এ/জেসি


