# একাদশ নির্বাচনের আগে থেকেই নৌকার দাবিতে সোচ্চার ছিল আ.লীগ
# এর আগে সেলিম ওসমানকে আ.লীগে এসে নির্বাচন করার আহ্বান জানান আইভী
# না.গঞ্জকে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে ঘোষণা করেছিলো সেলিম ওসমান
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমে ওঠেছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের লড়াই। দৃশ্যত এই লড়াই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি মধ্যকার বলে মনে হলেও কার্যত এই লড়াই ওসমান পরিবারের সাথে ওসমান বিরোধীদের।
সেই ধারায়ই একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওসমান পরিবারের দুই সহোদর সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান এবং অন্যপক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। আর দলীয়ভাবে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এই লড়াই শামীম আইভীর লড়াই হিসেবে পরিচিত।
সিটি কর্পোরেশনের গত নির্বাচনেও প্রকাশ্যে এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চলে, যা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও প্রত্যক্ষ করেন। এমনকি এই দ্বন্দ্ব নিরসনে তারা ভূমিকা রাখারও চেষ্টা করেন। সম্প্রতি আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে এখানকার পাঁচটি আসন থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে আবারও জমে ওঠেছে দুই পক্ষের লড়াই।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দাবির বাইরেও বিষয়টি নিয়ে এখন ওসমান পক্ষ ও নৌকা পক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্বে পরিণত হতে দেখা গেছে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই নৌকার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন মেয়র আইভী। এবার সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজনে নিজেই তিনি এমপি নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে এধরণের হুশিয়ারী দিয়েছেন তিনি। মেয়র বলেন, নারায়ণগঞ্জের ডিসি ও এসপি দুই এমপির (শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান) কথায় চলে। আমাদের কথা, নগরবাসীর কথা চিন্তা করে কম। যদি সব সময়ে এমনই হতে থাকে তাহলে তো আমার এমপিগিরি করতে হবে।
প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন চাইবো। এর আগেও জাতীয় পার্টি মনোনীত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান এমপিকে আওয়ামী লীগে চলে এসে নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেছিলেন এ নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের জন্ম। এ আসনটিও জাতীয় পার্টিকে কেন দিতে হবে। উনি তো (সেলিম ওসমান) আওয়ামী লীগের ঘরের সন্তান। আওয়ামী লীগে চলে আসুক নির্বাচন করুক। আমরা এইখানে নৌকা চাই।
এর আগে গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে এই দুটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে মনোনয়নের দাবি জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে বন্দর আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে জেলা আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। এরপর সেই দাবির সাথে নাসিক মেয়র আইভীসহ জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সমর্থন জানানো হয়।
এই দাবির পক্ষে সমর্থন জানাতে গিয়ে মেয়র আইভী বলেন, ১৫ বছর ধরে এখানে নৌকার স্লোগান দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের করুণ অবস্থা। এই আসন কেন জাতীয় পার্টিকে দিতে হবে। গত নির্বাচনে হয়তো নানা কারণে দিতে হয়েছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী দেওয়ার।
সে সময় ওসমান পরিবার ঘেষা আওয়ামী লীগের নেতারাও সেই দাবিকে সমর্থন জানালেও পরে তারা বিভিন্ন চাপে সেই দাবি থেকে সরে দাঁড়ান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সে সময় একেএম সেলিম ওসমান বলেছিলেন, কে হবেন, কে মনোনয়ন পাবেন সেইটা নিয়ে এখন পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা কইরেন না।
সেই নির্বাচনেও এই আসন দুটি আবার জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এসব এলাকায় আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয়ের পর এই দুই আসনে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষার্থে নৌকা প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান জাতীয় পার্টি মনোনীত এমপি একেএম সেলিম ওসমান দীর্ঘ সময় অসুস্থতার জন্য বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় তিনি হয়তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বা অংশগ্রহণ করবেন না, এমন ধারণা নিয়ে খুবই জোড়ালোভাবে মাঠে নামেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ।
সেই দাবিতে সোচ্চার হয়ে এখানে কারা কারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের দাবি রাখতে পারে আর কারা কারা অনেক কিছু পেয়েছে তাই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন না এই বিষয় নিয়েও প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে শুরু করেন ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের নেতারা।
এরই মধ্যে বিদেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসারত থাকাবস্থায় গত ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৮তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে অংশগ্রহণ করতে ছুটে আসেন সাংসদ সেলিম ওসমান। সেদিনের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সেলিম ওসমান বলেন, আমি স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া আমার জাতীয় পার্টির একটি সদস্যও কোনো দলে বিশ্বাস করে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে আমাদের প্রতিটি সদস্য বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমি অনুরোধ করলাম স্থানীয় আওয়ামী লীগ যারা করেন আমাদের সাথে রেষারেষি কইরেন না। এর পর থেকেই চুপসে যান ওসমান পন্থী আওয়ামী লীগের নেতারা।
যদিও এর আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির সম্মেলনে সেলিম ওসমান বলেছিলেন আমরা দেখিয়ে দিতে চাই নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির দুর্গ। কিছুদিন আগে বন্দর উপজেলায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আবারও নির্বাচন করার ঘোষণা দেন সেলিম ওসমান।
বেশ কিছুদিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকটি পত্রিকায় সেলিম ওসমান অসুস্থ থাকার অজুহাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন বলে যে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে তার তীব্র সমালোচনা করে সেলিম ওসমান বলেন, যদি আমাকে বন্দরের জনগণ চায়, আগামী সংসদ নির্বাচনে আমি থাকবো।
যতক্ষণ বন্দরের একজন মানুষও আমাকে চাইবে, ততক্ষণ আমি নির্বাচন করবো। এতে যদি আমার মান সম্মান চলেও যায়, চলে যাক।
সব কিছু মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে এবার আওয়ামী লীগের নৌকা প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে কি না, জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হবে কি না এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে এখানে প্রার্থী হিসেবে কাকে ঘোষণা করা হতে পারে এই বিষয়গুলো এই বছরের শুরু থেকেই আলাপ আলোচনার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি ২০০৮ সাল থেকেই জাতীয় পার্টির দখলে। ২০১৪ সাল থেকেই আসনের সাংসদ হিসেবে আছেন জাতীয় পার্টির সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান। আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ধারণা এবার জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ নির্বাচন না করলে হয়তো আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চাইবেন সেলিম ওসমান।
যা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাও তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এবার সিটি মেয়রের প্রয়োজনে এমপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাটি অনেকটাই সেসব প্রশ্নের জবাব হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে এবার বিষয়টিকে প্রতিপক্ষ কিভাবে দেখবেন সেটাই দেখার বিষয়। এস. এ /জেসি


