ওয়ারেন্টের আড়াই মাস পর দুর্নীতির বরপুত্র কাউন্সিলর মতি পলাতক
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৯:১৬ পিএম
# মতিকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে পুলিশ জানিয়েছেন পুলিশ সুপার
# কিভাবে এতোদিন ধামাচাপা দেয়া হল খতিয়ে দেখার আহ্বান মানবাধিকার কমিশনের
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত প্রায় আড়াই মাস আগে। কিন্তু এই গ্রেফতারি পরোয়ানা সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ পায় নি এমন দাবি গত দুই মাস ধরে পুলিশ দাবি করছে।
অন্যদিকে ফুরফুরে মেজাজে দুর্নীতির বরপুত্র মতি দেদারচে নানা অনুষ্ঠান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে আসছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হলে গা ঢাকা দেয় কাউন্সিলর মতি। জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘কাউন্সিলর মতি পলাতক আছেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে। ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য বাধ্য।’
এদিকে স্থানীয়রা কাউন্সিলর মতিকে গ্রেফতার না করায় আতঙ্কিত। তার সন্ত্রাসী বাহিনী বিভিন্নভাবে এলাকাবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির দুইমাস পরেও সেটি পুলিশ জানেনা এমন ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কমিশন নারায়ণগঞ্জের সভাপতি এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম।
তিনি বলেন, তিন মাস আগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরেও পুলিশ জানেনা তাহলে আইনশৃৃঙ্খলার কাঠামোটা কোথায় এই ঘটনায় কিন্তু প্রমাণিত হয়ে যায়। দুর্নীতির মামলার মতো একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরেও সে কি করে ধামাচাপা দিতে সমর্থ্য হল ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সেটি খতিয়ে দেখা উচিৎ।
দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালকের দায়ের করা মামলায় (নং ৭(২)২২) নাসিক ৬নং ওয়ার্ডের সিদ্ধিরগঞ্জ আদমজী নগর সুমিলপাড়া এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে কাউন্সিলর মতির বিরুদ্ধে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এ ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আদালত সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ১৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মতিউর রহমান (মতি) ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বও দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. ইব্রাহীম আদালতে মতি ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক চার্জশিট দাখিল করেন।
মতির গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতারাও। নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন যুগের চিন্তাকে বলেন, যুবলীগ নেতা মতি কেন, কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ভুল ত্রুটি, অন্যায়ের দায় দল কখনো বহন করবেনা। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলেছেন, কোন দুর্নীতিবাজের পক্ষে তিনি এবং দল থাকবেনা। আমরা শেখ হাসিনার কর্মী, তাই তার কথাই আমাদের কথা। মতির কুকর্ম একান্ত তার ব্যক্তিগত। এখানে দল কোন দুর্নীতিবাজের দায় নেবে না।
বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এড. আনিসুর রহমান দিপু যুগের চিন্তাকে বলেন, কে কোথায় দুর্নীতি করলো তা দেখভাল করার জন্য দুদক এবং প্রচলিত আইন আছে। এখানে মতির মতো যুবলীগ নেতাই হোক আর যেই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারো ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় কখনো আওয়ামীলীগের মতো স্বচ্ছ রাজনৈতিক দলের উপর বর্তায়না।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান যুগের চিন্তাকে বলেন, মতি আমাদের দলের যুবলীগ নেতা। সে আমাদের সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতে এসেছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে এটা আমরা জানি। কিন্তু কোথায় গিয়ে কি কি দুর্নীতি করেছে কোন কুকর্ম করেছে সেটা তো দল এবং দলের নেতাকর্মীরা জানে না। কারো ব্যক্তিগত কুকর্মের দায় কখনোই দলের উপর বর্তায়না। মতির দুর্নীতির যে তদন্ত হচ্ছে তা আইনের নিজস্ব গতিতেই চলবে। দল কিংবা দলের নেতাকর্মীরা কোন ব্যক্তির কুকর্মের জন্য দায়ী না।
কে এই মতি : সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী সুমিলপাড়ার আইলপাড়া এলাকার মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে মতিউর রহমান মতি। আশির দশকে তিনি শিমুলপাড়া এলাকায় মুনলাইট সিনেমা হলের টিকিট ব্লাকে বিক্রি করতেন। তৎকালিন জাতীয় পার্টির নেতা সফর আলী ভুঁইয়ার হাত ধরে নাম লেখায় রাজনীতিতে। নব্বই দশকে এসও রোড এলাকায় বিএনপির মিছিলে বোমা হামলা করে আলোচনায় আসেন মতি। ওই বোমা হামলায় মনা নামে এক পথচারী নিহত হয়েছিলেন। তার দুই বছর পর নিজ বাড়িসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদের উপর শাহ আলম বাবু নামে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করার পর থেকেই তিনি বনে যান এলাকার ত্রাস।
জাতীয় পার্টি ছেড়ে যোগদেন যুবলীগে। এলাকায় শুরু করেন বেপরোয়া চাঁদাবাজি। গড়ে তুলেন অপরাধ জগতের সাম্রাজ্য। ২০০১ সালে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান বিদেশে। ২০০৯ সালে দেশে এসে নারায়ণগঞ্জ আদালতে আত্নসমর্পন করে প্রায় ১ বছর জেল হাজত বাস করে জামিনে বের হয়ে ফিরেন এলাকায় হন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহ্বায়ক। এর পর থেকেই বদলাতে থাকে তার ভাগ্য। গড়তে থাকেন অর্থের পাহাড়। ২০১৬ সালে নাসিকের দ্বিতীয় নির্বাচনে হন ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তৃতীয় নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।
একদিকে জনপ্রতিনিধি অপরদিকে থানা যুবলীগের আহ্বায়ক হওয়ায় ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন মতি। এলাকার অবৈধ আয়ের উৎস নিয়ন্ত্রনসহ বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধ পন্থায় হাজার কোটি টাকার মলিক হয় মতি। নব্বই দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ২৪টি মামলা হয়। যার মধ্যে ৩টি মামলা বিচারাধীন, ১টি হাইকোর্ট হতে স্থগিত আর বাকিগুলো খালাস ও আপোষ মিমাংশায় অব্যাহতি পায়। দুদকের মামলা চলমান থাকার পরও থেমে থাকেনি মতির অবৈধ সম্পদ অর্জনের গতি। এস.এ/জেসি


