দুর্নীতির বরপুত্রদের শেল্টার দেয় কারা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৩৩ পিএম
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ১৪তম হওয়ায় দেশবাসী অবাক হয়নি। দুর্নীতি হয় না এমন কোনো ক্ষেত্র নেই অভিযোগ সচেতন মহলের। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, এমপি, আমলা অভিযোগ সবার বিরুদ্ধে। বাংলা ভাষায় একটা জনপ্রিয় বাগধারা হচ্ছে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’।
আঙুলটা যদি হঠাৎ কলাগাছে পরিণত হয়, কলাগাছের মতো ফুলে-ফেঁপে ওঠে, সেই অবস্থাকেই বোঝায়। এর মানে হচ্ছে অপ্রত্যাশিত ধনসম্পদ লাভ, অবিশ্বাস্য উন্নতি, হঠাৎ বড়লোক হওয়া ইত্যাদি। সাধারণত অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করে হঠাৎ ধনী হয়ে যাওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ কথাটা বাংলা সাহিত্যে ব্যবহার করা হয়।
এদিকে মানুষ রূপপুর প্রকল্পের বালিশ কাণ্ডের দুর্নীতি নিয়ে জেনেছে। তাছাড়া দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার হাজার কোটি টাকা দূর্নীতি করেও তার শেষ রক্ষা হয় নাই। গতকাল আদালত দুর্নীতির দায়ে তাকে ২২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন।
এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের যুবলীগ নেতা সম্রাট, পাপিয়া সহ অনেকের দূনীর্তির খবর শুনেছে দেশের মানুষ। এবার নারায়নগঞ্জের ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের মামলা হওয়ায় তাদের দুর্নীতি জানতে পারছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ হলেও তা তদন্ত চলমান রয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, এবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার এক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মে দুর্নীতির অভিযোগ দেয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদকে)। ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত এর অত্যাচার ও দুর্নীতি থেকে বাচাঁর জন্য ২০২২ সনের ১৪ জুলাই ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানিয়ে দুদকে অভিযোগ করেছে বক্তাবলীর স্থানীয়রা।
যা নিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। তার আগে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগের আহ্বায়ক মতিউর রহমান মতির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত প্রায় আড়াই মাস আগে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ১৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মতিউর রহমান (মতি) ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বও দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. ইব্রাহীম আদালতে মতি ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক চার্জশিট দাখিল করেন। মতির দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা চলা অবস্থায় রুপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেত্রী সৈয়দা ফেরদৌসি আলম নীলাকে ২০২২ সনের ৩০ আগস্ট দুর্নীতি করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের দায়ে তাকে দুদকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত বছরের (২৪ আগস্ট) দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সাহিদুর রহমানের সই করে পাঠানো এক নোটিশে নীলাকে আগামী ৩০ আগস্ট সকাল ১০টায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়। তখন নীলার বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাস ও আফনান জান্নাত কেয়ার সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি দল গঠন করে তদন্ত করেছে।
সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে বন্দর উপজেলার ধামগড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদের সদস্য মাসুম আহম্মেদ এর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। যা নিয়ে রীতিমত নারায়ণগঞ্জে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। এছাড়া এইভাবে একের পর এক দূর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে তারা যদি পার পেয়ে যায় তাহলে দুর্নীতি দমনের চেয়ে বাড়তে থাকবে বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তাছাড়া তারা কাদের শেল্টারে দুর্নীতি করে যাচ্ছে তাদের খোঁজে বের করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী তুলেন নগরবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। দলের মাঝে বলা বলি হয় এই জনপ্রতিনিধি সাংসদ শামীম ওসমানের আশীর্বাদে তিনি বক্তাবলীর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায় এমপির লোক হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এজন্য তার প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয়রা শওকত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ প্রদান করেন। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগ নেতা নাসিক কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতিও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ এমপির লোক পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নানা ভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জন করে এখন দুদকের মামলায় ফেসে আছে।
এছাড়া জেলা পরিষদের সদস্য মাসুম আহম্মেদ নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। একই সাথে তিনি বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় সাংসদ শামীম ওসমানের সাথেও তার ভালো সখ্যতা রয়েছে। তবে রুপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেত্রী সৈয়দা ফেরদৌসি আলম নীলা নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর অনুসারি হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে রূপগঞ্জে বিভিন্ন ভাবে এই নারী নেত্রী মন্ত্রীর প্রভাব বিস্তার করে অবৈধ ভাবে বিশাল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। তাই তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ হওয়ায় তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনে তলব পর্যন্ত করা হয়। তাদের সকলের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছে তারা কাদের শেল্টারে একের পর এক দুর্নীতি করে যাচ্ছে।
তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তারা যদি এই ভাবে পার পেয়ে যায় তাহলে দুর্নীতি দমণ করার চেয়ে আরও বাড়তে থাকবে। তাই নাগরিক সচেতন মহল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবী তুলেছেন। এস.এ/জেসি


