আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে সারা দেশ তো বটেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ নড়াচাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জও তার ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচনে কোন দল অংশ গ্রহণ করবে, কোন দল বর্জন করবে, কারা প্রার্থী হতে পারেন, কাদের সম্ভাবনা কতটুকু সবকিছুই উঠে আসছে আলোচনায়।প্রার্থী এবং দলের উপযোগিতা, নির্বাচনে জয় পরাজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে চলছে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ধর্মী আলোচনা। রাজনীতি সচেতন বন্দরবাসী এবার এসবের কোন কিছুতেই তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
নির্বাচনে কে প্রার্থী হবে, কোন দল অংশগ্রহণ করবে, কোন দল করবে না, এসবের কোন কিছুতেই যেন বন্দরবাসীর উৎসাহ নেই। নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের অন্তর্ভুক্ত বন্দরবাসীর ভোট সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বন্দর বাসীর এই নিরুত্তাপ মনোভাব বা অনাগ্রহ কেন তা বিশ্লেষনের দাবি রাখে। সচেতন মহলের ধারণা এমন অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা এবং সাম্প্রতিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বন্দরবাসীকে এমন নির্বাচন বিমুখ করে তুলেছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়েও বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে বন্দরবাসী হতাশ। নেতা নেত্রী নির্বাচনের মাধ্যমে কাঙ্খিত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সুদীর্ঘকাল যাবৎ বন্দর বাসী অনেক চেষ্টা করেছে। কোন ফল লাভ হয়নি। সব দল এবং প্রার্থী নির্বাচনের আগে বহু প্রতিশ্রুতি প্রদান করে ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু তাদের কেউ বন্দরবাসীর মৌলিক চাহিদা সমূহের কোনটিই পূরণ করতে পারেনি। সংগত কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকগণও নিজ নিজ দলের প্রার্থীর বিষয়েও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
বিভিন্ন সময়ে দেশের শাসন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি নির্বাচনের প্রাক্কালে বন্দরবাসীর মৌলিক চাহিদা পূরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেও নির্বাচন শেষে তাদের কারোরই তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। সে কারণেই বন্দরবাসী যেন বুঝে গিয়েছে তাদের কপালে নতুন করে কিছু তো জুটবেই না বরং আরো অনেক বোঝা চাপানো হবে, যেমনটি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক সম্প্রতি করা হয়েছে।
একই সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়েও বন্দর এলাকাবাসী সিটি কর্পোরেশনের সামান্যতম সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। উল্টো পৌরসভা থাকাকালীন কিছু সুযোগ সুবিধা হাতছাড়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় দ্বিগুণ, কোন কোন ক্ষেত্রে তিন গুণ পর্যন্ত গৃহকর বৃদ্ধি করা হয়েছে। ওয়াাসার পানি না পেয়েও মাসে মাসে বিল গুনতে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ মূল শহরের বাড়ি বা ভবন সমূহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বন্দর এলাকায় বর্ধিত গৃহকর বা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল শহর এলাকায় বাড়ি বা ভবন থেকে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন সম্ভব তার সিকিভাগও বন্দরে সম্ভব নয় জেনেও ট্যাক্স বৃদ্ধি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অমানবিক বলেই বন্দর বাসীর ধারণা।যেসব বাড়িওয়ালা ভাড়ার অর্থে জীবন যাপন করেন তাঁদের জন্য এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। যুগ যুগ ধরে শহরের পূর্ব এবং পশ্চিম পাড়কে সংযুক্ত করে একটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুই পাড়ের সবাই একমত পোষণ করলেও সেতু নির্মাণ নিয়ে গোলকধাঁধা চলছেতো চলছেই।
সব দলই নির্বাচনের প্রাক্কালে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতাসীন হয়ে এ ব্যাপারে সামান্যই গুরুত্ব দেখিয়েছে। সেতু নির্মাণ শুধু নির্বাচনী মূলো হয়েই রয়ে গেছে।সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে। ৫৯০ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা ব্যায় নির্ধারণ করে কদম রসুল সেতু প্রকল্প একনেকে অনুমোদন লাভ করে। নির্মাণ কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের জুন। বন্দর বাসী সেতু প্রাপ্তি শুধু সময়ের ব্যাপার ভেবে দিন গুনতে থাকে। ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় নির্মাণ কাজ আর শুরু হয় না।
নির্মাণ কাজের শেষ সময় ২০২২ এর জুনে শেষ হয়ে আরো এক বছর পার হয়ে গেছে, নির্মাণ শেষ হওয়াতো দূরের কথা নির্মাণ কাজই শুরু করা যায়নি। বিলম্ব জনিত কারণে নির্মাণ ব্যয় আরও ১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে নতুন নির্মাণ ব্যয় অনুমোদিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে কদম রসূল সেতুটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে, না কি শুধু কাগজ কলমেই থাকবে? আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সব দলই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেছে এবং আছে। কদম রসুল সেতুর প্রতিশ্রুতি সব দলই দিয়েছে।
৭৫ পরবর্তী ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই দলের সাংসদই বন্দরের সন্তান, জাতীয় পার্টির মূলশক্তি বন্দর কেন্দ্রিক হওয়ায় জাপার প্রয়াত এবং বর্তমান দুজন সাংসদই বন্দরের অধিক আপনজন হিসেবে চিহ্নিত, তার পরও বন্দর বিভিন্ন ভাবে বঞ্চিত হওয়ায় বন্দরবাসী আর কোন আশার আলো দেখছে না। সিটি মেয়র বন্দরের প্রতি অধিক সহানুভূতিশীল বলেই মনে করা হতো। কদম রসুল সেতু নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়া, দুর্বল পানি সরবরাহ ব্যবস্থা,সাম্প্রতিক ট্যাক্স বৃদ্ধি সে ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
"শীতলক্ষ্যায় সেতুর গ্যারান্টি চায় বন্দর বাসী" শিরোনামে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক যুগের চিন্তা ৪ অক্টোবর সংখ্যায়। শীতলক্ষ্যায় সেতু বলতে প্রস্তাবিত কদম রসুল সেতুর কথাই বলা হয়েছে। সেতুটি নির্মিত হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বন্দর বাসী, আর সেজন্যেই শিরোনামে বন্দর বাসীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কাঁচপুর সেতুর উত্তর দিকে ২০০০ সালের পর থেকে আরও ৩ টি সেতু নির্মিত হলেও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সেতুটি আজও আলোর মুখ দেখলো না।
মদনগঞ্জ অঞ্চলে আরও একটি সেতু নির্মিত হলেও তা বন্দরবাসীর তেমন কোন কাজেই আসছে না। একই সিটি কর্পোরেশনে থাকা সত্ত্বেও বন্দরবাসী বিচ্ছিন্ন দ্বীপের নাগরিক জীবন যাপন করছে। মূল শহরে প্রবেশ করতে নির্ভর করতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ নৌকার ওপর। নবীগঞ্জ ফেরিঘাট দিয়ে গাড়ি পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলে ও পথের ওপর খুব কম সংখ্যক যাত্রীই নির্ভর করে।
দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা বন্দর বাসীকে এতটাই হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করেছে, কোন আশায় স্বপ্ন দেখতেও তারা ভয় পায়। আর কোন স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট বন্দর বাসী সহ্য করতে চায় না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থকরা দলের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও নিজ দলের স্থানীয় নেতা নেত্রীর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। আসন্ন নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন বন্দরের কোন উন্নয়ন তাঁরা করতে পারবে না এমনটাই বন্দর বাসীর বদ্ধমূল ধারণা।
বন্দর বাসী আর কোন প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাঁদের এই ধারণা ততদিন থাকবে যতদিন না বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। বন্দর বাসীর প্রধান চাওয়া কদম রসুল সেতুর নির্মাণ কাজ দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত কারও প্রতিশ্রুতি এলাকা বাসীকে আর আশ্বস্ত করতে পারবে না বলেই মনে হয় ।দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা এবং অপ্রাপ্তি জনিত কারণে সৃষ্ট বন্দরবাসীর বর্তমান মানসিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন না হলে আসন্ন নির্বাচনে তার প্রভাব প্রকট ভাবে প্রতিফলিত হবে বলেই সচেতন মহলের ধারণা। লেখক : বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা। এস.এ/জেসি


