গিয়াসউদ্দিনকে নিয়ে কৌশলী শামীম ওসমান
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৩, ০৯:০৭ পিএম
দ্বন্দ্বটা দলগত না, সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত। কারণ এর আগে যখন একই দলের রাজনীতি করতেন তখনও তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা গেছে। বলছিলাম নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা একেএম শামীম ওসমান ও জেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের কথা। দৃশ্যত দু’জন দুই দলের হলেও এক সময় একই দলের রাজনীতি করতেন। এমনকি গিয়াস উদ্দিন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়েই বিএনপিতে যোগদান করেছিলেন বলে জানা যায়।
তবে তারা যখন একই দলের রাজনীতি করতেন তখন থেকেই একজনকে আরেকজন তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতেন বলে তাদের মধ্যকার এই দূরত্ব ছিল বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। সেই দূরত্ব আরও বেড়ে যায় এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে দ্বন্দ্বটা আরও বেড়ে যায় ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে। সেই সময় দুই জন দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী ছিলেন এবং সেই প্রতিযোগিতায় শামীম ওসমানকে পরাজয়ের স্বাদ দিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন।
বিজয়ী হওয়ার পর গিয়াস তার প্রতিপক্ষ ও তাদের সমর্থকদের উপর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন শামীম ওসমান। সেই কারণেই গিয়াস উদ্দিনের উপর শামীম ওসমানের এত রাগ বলে জানা গেছে। তবে ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী গিয়াসের কাছে শামীম ওসমানের মতো এক জাদরেল নেতা হেরে যাওয়ায় সেই রাগ আক্রোশে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন বিএনপির নেতা কর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
সেই আক্রোশ থেকে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পরাজয়ের কারণে শামীম ওসমান এখন গিয়াসকে তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চাইছেন না বলে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক সূত্র। তাই গিয়াসকে যেন বিএনপি দলীয় মনোনয়ন না দেয় সেই জন্য বহুভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করেন তারা। এমনকি এই কাজে সহায়তার জন্য শামীম ওসমান বিএনপিরই কিছু নেতাকে ব্যবহার করতে চাইছেন বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান তার প্রায় প্রতিটি জনসভায়ই বিএনপির সাবেক সাংসদ ও বর্তমান জেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিনকে নিয়ে বেফাঁস কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। সূত্রমতে মূলত এই ধরণের বক্তব্যের সূত্রপাত শুরু হয় যখন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের জন্য বিএনপির পক্ষ হতে গিয়াস উদ্দিনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ বিএনপির একটি পক্ষ দাবী করা শুরু করে তারপর থেকে।
যখন গিয়াসকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা করে দল তখন থেকেই সেই বক্তব্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন শামীম। এমনকি বিভিন্ন বক্তব্যে গিয়াসের বিরুদ্ধে দলীয় একজন নেতাকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাকে ভদ্রলোক আখ্যায়িত করা শুরু করেন তিনি।
যেই বিএনপির নাম শুনলেই ক্ষেপে ওঠেন এই নেতা, সেই নেতার মুখে বিএনপিরই একজনকে ভদ্র লোক বলে সম্বোধন করা অনেকের কাছেই যেন ‘ভুতের মুখে রাম নাম’ জপার মতো মনে হয়। একই সাথে যাকে ভদ্র লোক বলে সম্বোধন করেন তার হাজারো প্রশংসা করে এবং গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ এনে তাদের একের বিরুদ্ধে আরেকজনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করেন।
সম্প্রতি বিভিন্ন বক্তব্যে সাংসদ শামীম ওসমান গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে ১৭টি খুনের অভিযোগসহ তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনেন। শামীম ওসমান গিয়াস উদ্দিনকে তার ছেলেদের রাস্তায় নামিয়ে এমন কিছু না করার আহ্বান জানান যাতে মামলা খেয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, শামীম ওসমানের অনুগত কর্মী হিসেবে পরিচিত কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি সম্প্রতি গিয়াস উদ্দিনের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।
যার ভিডিও ক্লিপিং রয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ার হাতে। মতি বলেছেন, গিয়াস উদ্দিন কখন তার মালিকানাধীন গিয়াস উদ্দিন মডেল কলেজে আসেন সেটা যেনো মতিকে জানানো হয়। তাহলে মতি এসে গিয়াস উদ্দিন মডেল কলেজ জ্বালিয়ে দেবেন বলে জানান। এরই মধ্যে আরও একটি রম্য বক্তব্য দিয়েছেন শামীম ওসমান। ঘটনা সত্যি কিংবা মিথ্যা তা পরের কথা। কিন্তু শ্রোতারা যে রসালো তথ্য পেয়েছেন এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এই সাংসদ একই আসনের সাবেক এমপি তার রাজনৈতিক প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গিয়াস উদ্দিনের তৃতীয় বিয়ের খবর প্রচার করে বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, ৭৮ বছরের বুড়ো ২৩ বছরের এক মেয়েকে বিয়ে করেছেন গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেছেন, বয়সে আমার অনেক বড় (গিয়াস উদ্দিন), আমার শাশুড়ির বন্ধু, বয়স নাকি তার ৭৮ নাকি ৭৯ বছর। এ বুড়া বয়সে ধরা খেয়ে ২৩ বছরের মেয়েকে বিয়ে করছেন। নতুন বিয়ে করা সেই নারীর নাম ও ঠিকানা তিনি পরে বলে দিবেন বলেও জানান।
তিনি আরও বলেন, বিয়ে করেন সেটা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। আপনার বউয়ের নামও আমি বলতে পারবো। কোন এলাকাতে থাকেন এখন সেটাও বলতে পারবো। এরই মধ্যে শামীম ওসমান রাজনীতির নামে, বক্তব্যের নামে বার বার হুমকি ধমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন গিয়াস উদ্দিন। এসব কারণে যতো দিন যাচ্ছে এই আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততই জটিল হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
শামীম ওসমান গিয়াসকে তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে চান না বলে এই অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে করেন তারা। কারন এরই মাঝে এই আসনের রাজনীতিতে শামীম ওসমানের জন্য বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে গিয়াস উদ্দিন। শামীম ওসমানের এই কায়দা ও প্রপাগাণ্ডা নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলে তার জন্য এখন সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। এস.এ/জেসি


