সময়টা ২০১১ এর ৫ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুল পৌরসভা বিলুপ্ত করে একত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে সিটি করপোরেশন হিসেবে। প্রথম ভোট অনুষ্ঠিত হয় ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর। তখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত শামীম ওসমানকে ১ লাখেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে ইতিহাসে প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন সেলিনা হায়াৎ আইভি।
তখন নারায়ণগঞ্জ ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান দুই জনপ্রতিনিধির মাঝে তুমুল লড়াই দেখেছে নগরবাসী। একযুগ পর গত কয়েক দিন আগে ২০১১ সনের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার কথা তুলে সামনে আনেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। নতুন পুরোনো কথা সামনে নিয়ে আসায় তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
এদিকে ২০১১ সনের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের হেরে যাওয়ার বিষয় সামনে এনে সাংসদ শামীম ওসমান নাসিক মেয়রকে বলেন, ৯ আগস্ট আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে শপথ করেছি। সেদিন শপথের পর আমি আমার ছোট বোন আইভীকে মেসেজ পাঠিয়েছি। ছোট বোন আইভী আমি এভাবে তোমাকে মেসেজ করবো ভাবতে পারি নাই। আইভী আমি শুধু তোমাকে কয়েকটা বিষয়ে কিছু কথা বলব। তোমার কিন্তু মনে আছে প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমি আপার নির্দেশমত নির্বাচনে সব কিছু করেছি।
নির্বাচনের দিন আমার চোখের সামনেই যা ঘটার ঘটেছিল এবং আমার পরামর্শেই সব কিছু হয়েছিল। তবে ২০১১ সনে নারায়ণগঞ্জ প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি থেকে তৈমুর আলম খন্দকার প্রার্থী থাকলেও তাকে নিয়ে তখন কোন আলোচনা হয় নাই। তখন মূলত শামীম ওসমান ও আইভীকে নিয়ে সারাদেশে আলোচনা হয়। তারা দুজন একই দলের হলেও তাদের মাঝে যেন বিশাল বাঁধ তৈরী হয়ে রয়েছে।
দলের মাঝে তারা উত্তর দক্ষিণ বলয় হিসেবে পরিচিত। এমপি শামীম ওসমানের অনুসারীদেরকে উত্তর মেরু হিসেবে জানেন নেতা কর্মীরা। বিপরীতে নাসিক মেয়র আইভী অনুসারীদেরকে দক্ষিন মেরু হিসেবে জানেন। সম্প্রতি সময়ে মেয়র আইভীকে নিয়ে একসাথে মাঠে নামতে চান সাংসদ শামীম ওসমান। তবে তার ঐক্যের ডাকে সারা দিচ্ছে না নাসিক মেয়র আইভী। তারা একে অপরকে বড় ভাই ছোট বোন বলেও ডাকেন।
অপরদিকে আলোচনা হচ্ছে আগামী নির্বাচনের আগ মুহুর্তে এসে সাংসদ শামীম ওসমান আইভীর সাথে ঐক্যের আহ্বান জানালেও ২০১৬ সনের নাসিক দ্বিতীয় নির্বাচনে আইভী যেন নৌকা না পায় তার সকল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ২০১৬ সালের প্রথম দলীয় প্রতীক পান আইভি। সেবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত সাখাওয়াত হোসেনকে ৭৯ হাজার ভোটে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বার মেয়র তিনি।
তবে ২০২২ সনের নির্বাচনের এক বছর আগে থেকে শহরের দেওভোগ জিউস পুকুর সম্পত্তি নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা আইভীর বিরুদ্ধে জায়গা দখলের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেন। এমনকি ২০২১ সনে হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় উৎসব দূর্গাপুজায় শহরের বিভিন্ন পূজামন্ডপে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটানো হয়। এমনকি হেফাজত নেতাদের দিয়েও মেয়রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করা হয়।
সর্বশেষ ২০২২ সনের নির্বাচনে মেয়র আইভী মনোনয়ন ঠেকাতে না পেরে তার বিরুদ্ধে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা তৈমূর আলমকে প্রার্থী করেন বলে অভিযোগ উঠে। তখন নানা সময় নির্বাচনী প্রচারনায় গিয়ে মেয়র আইভী অভিযোগ করে বলেছেন তৈমুর আলম ওসমান পরিবারের প্রার্থী। সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে আইভী ঠিকই তৈমুরকে পরাজিত করে টানা তৃতীয় বারের মত মেয়র হন।
রাজনৈতিক বোদ্ধমহলে আলোচনা হচ্ছে আগামী নির্বাচনের আগে ভোটের মাঠে মেয়র আইভীকে পাশে চান সাংসদ শামীম ওসমান। আর এজন্য এতো দিন নানা ভাবে ঐক্যের আহ্বান জানালেও এখন আইভীকে নিয়ে প্রকাশ্যে এক সাথে রাজপথে নামতে চান এমপি শামীম ওসমান। কিন্তু তার ডাকে সারা দিচ্ছে না মেয়র। তবে সচেতন মহল মনে করেন, ২০১১ সনের নির্বাচনে আইভীর সাথে হেরে যাওয়ায় যে কষ্ট পেয়েছে তা এখনো ভুলতে পারে নাই উত্তর মেরুর প্রভাবশালী এই নেতা। তাই হয়তো সেই পুরোনো কষ্ট তিনি সামনে এনেছেন। এস.এ/জেসি


