কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতিত নারায়ণগঞ্জে গতকাল বিএনপির ও জামায়াতের ডাকা হরতাল ঢিলেঢালাভাবেই শেষ হয়েছে। সকালে হরতাল সফল করতে বিএনপি কর্মীরা মাঠে চড়াও হলেও শহরে পুলিশের শক্ত অবস্থানের কাছে টিকতে না পেরে কিছু সময় পিকেটিংয়ের পর ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এরপর সময় যত গড়িয়েছে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কম থাকলেও আওয়ামী লীগের কর্মীরা বিভিন্ন স্পটে প্রহরা দিতে থাকলে বিএনপি কর্মীদের সেভাবে রাজপথে সরব হতে দেখা যায়নি।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পুলিশের সাথে বিএনপি কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ১৫ জন আহত এবং এর আগে শহরে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে তিন কর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাস চলাচল কম থাকলেও ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল বলে জানা গেছে। তবে দীর্ঘদিন পর হরতাল দেওয়ার খবরে আতঙ্কে সড়কে মানুষের চলাচল ছিল সীমিত। যানবাহন সংকটে কর্মমুখী মানুষ বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বেশ কয়েক মাস যাবৎ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচীর পর আবারও হরতালের কবলে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে গত ২৮ অক্টোবর শনিবার ঢাকা নয়াপল্টনে অনুষ্ঠিত বিএনপির মহাসমাবেশে সংঘর্ষ ও প্রতিহত করার প্রতিবাদে এর পরের দিন রোববারে এই হরতালের ডাক দেয় বিএনপি, জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ ও তাদের সমমনা দলগুলো। একই দিন সেই হরতাল প্রতিরোধে শান্তি সমাবেশের ডাক দেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
গতকাল রোববার সেই হরতালকে কেন্দ্র করে এর পক্ষ ও বিপক্ষ নিয়ে বেশ সরব ছিল নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি। জেলার বিভিন্ন অবস্থান থেকে হরতালের সমর্থনে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠন, জামায়াত ইসলামী নারায়ণগঞ্জ ও গণতন্ত্র মঞ্চসহ হরতালের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীগণ বিক্ষোভ ও আন্দোলন করার চেষ্টা করে। একই সময় হরতাল প্রতিরোধ শান্তি সমাবেশের অংশ হিসেবে জেলার বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগরের নেতা কর্মীসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অন্যদিকে হরতাল প্রতিরোধে শহরের বিভিন্ন স্পটে দেখা যায় পুলিশের একাধিক টিমের অবস্থান। একই সাথে বেশকিছু টহল পুলিশকেও তৎপর থাকতে দেখা যায়। এসব কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে গাড়িতে অগ্নি সংযোগ, গাড়ি ভাঙচুরসহ ব্যানার ছিনিয়ে নেয়া ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলেও জানা যায়। এদিকে এই হরতাল চলাকালীন সময় বেশ কয়েকজন নেতা কর্মী ও সমর্থককে আটকের ঘটনাসহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতোও ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ডাকা সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের সমর্থনে গতকাল রোববার নারায়ণগঞ্জ শহরসহ মাঠে ছিল জেলার বিভিন্ন এলাকার নেতা-কর্মী ও সমর্থকগণ। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাসপোর্ট অফিসের সামনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল করে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিছিলের সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় তারা।
এ সময় রাস্তার উপর টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। তবে ঘটনা স্থলে পুলিশ এসে পৌছার আগেই নেতাকর্মীরা চলে যান। সে সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপি, জেলা ছাত্রদল ও যুবদলের নেতৃবৃন্দ। সকাল ৯ টায় শহরের মেট্রো হল থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি। এ সময় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১০ টায় শহরের হাইস্কুলের সামনে আরেকটি বিক্ষোভ মিছিল হয়। এর আগে, নগরীর নিতাইগঞ্জ এলাকায় মিছিল করে মহানগর বিএনপি।
সকাল-সন্ধ্যা হরতালের সমর্থনে সকাল ৭টায় নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কে মিছিল করে নারায়ণগঞ্জ গণতন্ত্র মঞ্চ। পরে মিছিল নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাকর্মীরা চাষাঢ়ার দিকে অগ্রসরের চেষ্টা করলে মিছিলকারীদের বাধা দিয়ে ব্যানার ছিনিয়ে নেয় পুলিশ। এ সময় মিছিলকারীদের সাথে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং নারায়ণগঞ্জ মহানগর জেএসডি সভাপতি মোতালেব মাস্টারকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ হতে বলা হয় মিছিলকারীরা চাষাঢ়ায় বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।
এ সময় একজনকে আটক করা হলেও পরে তাকে সর্তক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। সকাল পৌনে আটটার দিকে শহরের চাষাঢ়ায় হরতাল সমর্থনে মিছিলের জন্য জড়ো হওয়ার সময় বিএনপির সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও শটগানের গুলি ছুড়লে বিএনপির লোকজনও পাল্টা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে ওয়াদুদ সাগর, সুজন ও সোহেল নামের বিএনপির তিন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ হতে বলা হয় হরতালকারীরা সকাল থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে আগুন জ্বালিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে। পুলিশ নিজের কাজ করতে এগিয়ে গেলে ওরাও পুলিশের ওপর হামলা করে। পরবর্তীতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পিকেটিং ও জ্বালাও পোড়াওয়ের সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনজনকে আটক করা হয় বলেও জানায় পুলিশ। এর মধ্যে কাউন্সিলর ইকবালও আছেন বলে পুলিশের পক্ষ হতে জানানো হয়। বাকিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি বলে জানায় পুলিশ।
সকাল এগারোটার দিকে শহরের নবাব সলিমুল্লাহ সড়কের মিশনপাড়া এলাকায় হরতাল চলাকালীন সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করা উৎসব ট্রান্সপোর্টের একটি যাত্রীবাহী বাস ভাঙচুরসহ অগ্নি সংযোগ করা হয় বলে জানা গেছে। এতে গাড়ির প্রায় ছয়টির মতো আসন পুড়ে যায়। স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় পানি দিয়ে আগুন নেভানো হয়।
বাসটির যাত্রীরা আগেই নেমে যাওয়ায় কেউ আহত হননি বলে জানান গাড়ির চালক। একই এলাকায় বন্ধু পরিবহনের একটি বাস ভাঙচুর করা হয়। তবে এসব ঘটনায় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে। পুলিশের পক্ষ হতে বিএনপির লোকেরা আগুন দিয়েছে বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি।
অন্যদিকে হরতালের সমর্থনে আড়াইহাজারে বিএনপির মিছিলে পুলিশের বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিএনপির বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। রোববার সকাল সাড়ে ১১ টায় আড়াইহাজারের বিভিন্ন স্থানে হরতালের সমর্থনে বিএনপি মিছিল বের করলে উপজেলার পাঁচরুখীতে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিএনপি থেকে দাবি করা হয় এই ঘটনায় বিএনপির প্রায় অর্ধশত নেতা কর্মী আহত হয়েছে।
পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এই ঘটনার পর বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের বাড়িতে র্যাব ও পুলিশ অভিযান চালিয়েছে বলেও জানায় তারা। তবে আড়াইহাজার পুলিশের পক্ষ হতে বলা হয় বিএনপি নেতারা সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলা শুরু করলে বাধা দেয় পুলিশ। পরে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড গুলি করে পুলিশ।
হরতাল সমর্থনে নগরীতে মিছিল করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ এর নেতা-কর্মী ও সমর্থকগণ। রোববার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শহরের কালিরবাজার এলাকার নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের সামনে থেকে একটি ঝটিকা মিছিল বের করেন তারা। এ সময় মিছিলে সরকার বিরোধী নানা স্লোগান দেন তারা। তবে হরতাল প্রতিরোধে শান্তি সমাবেশের কর্মসূচীতে মাঠে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকগণ।
গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে নগরীর ২ নং রেল গেইট এলাকায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে হরতালের প্রতিবাদে শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে অবস্থান করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ সময় মেয়র শনিবার ঢাকার সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা ও একজনকে পিটিয়ে মারার জন্য বিএনপিকে দায়ী করে তার নিন্দা জানান। একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগসহ সকল অঙ্গসংগঠনকে একসাথে কর্মসূচী দিয়ে একই সাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
কর্মসূচীতে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাবেক সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য হোসনে আরা বাবলী, জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল কাদির, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি খবিরউদ্দিন আহমেদ, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাত, নাসিক কাউন্সিলর ও ১৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আহাম্মদ আলী রেজা উজ্জ্বলসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীগণ।
হরতালবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতৃবৃন্দ। রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েল ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ মোহসীন মিয়ার নেতৃত্বে এই হরতালবিরোধী মিছিল করেন আওয়ামী লীগের আইনজীবীগণ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, পিপি অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান বুলবুল, সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট এসএম ওয়াজেদ আলী খোকন, জিপি অ্যাডভোকেট মেরিনা বেগম, অ্যাডভোকেট রবিউল আমিন রনি, অ্যাডভোকেট মাহাবুবুর রহমান, অ্যাডভোকেট মাহামুদা মালাসহ আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীগণ।
হরতালের প্রতিবাদে মিছিল করেছে সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো। রোববার দুপুরে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের পিরোজপুর এলাকায় মেঘনা টোলপ্লাজার সামনে এই মিছিল হয়। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান মাসুম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ আব্দুল্লাহ আল কায়সারসহ উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল জামান, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু ও সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দারসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।
ফতুল্লায় হরতাল বিরোধী মিছিল করেছে যুবলীগের নেতৃবৃন্দ। রোববার দুপুরে ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের ফতুল্লা বাজার এলাকা থেকে পঞ্চবটি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মিছিলটি বের করা হয়। পরে প্রায় অর্ধ শত হোন্ডার বহর নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহর ও ফতুল্লার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেল আলী, থানা যুবলীগ নেতা বাচ্চু, তরুন খন্দকার, গোলাম খন্দকার রিপনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীগণ। এস.এ/জেসি


