# তড়িৎ গতিতে স্বল্প সময়ের জন্য তৎপর ছিল বিএনপি
# তৎপর ছিল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি
# গত এক সপ্তাহে ১৫ মামলায় গ্রেফতার বিএনপির ২৮৮জন
বিএনপির ডাকা দ্বিতীয় দফার দুই দিনের অবরোধের প্রথম দিন অবরোধ সমর্থনকারীদের তুলনায় অবরোধ বিরোধীদের তৎপরতা ছিল অনেক বেশি। গতকাল রোববার অবরোধের প্রথম দিন অবরোধ সমর্থনকারীদের হাতে গোনা কয়েকটি প্রচেষ্টা ছাড়া তেমন কোন বড় ধরণের কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়নি। বিএনপি সূত্রে জানা যায় মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মীই এখন ঘর ছাড়া। তাছাড়া অবরোধ করতে রাস্তায় অবস্থানকালেও তাদের গ্রেফতার হওয়ার ভয় আছে।
বিএনপির দাবি নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য গ্রেফতারের নামে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তাদের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচী বাধাগ্রস্ত করার জন্য পুলিশের সাথে আওয়ামী লীগের লাঠিয়াল বাহিনীও মাঠে আছে। সব কিছু মিলিয়ে মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না বিএনপি। তবে পুলিশ বলছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, যানবাহন ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট অভিযোগেই তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
অবরোধ কর্মসূচীতে রাস্তাগুলোতে বিএনপির শক্ত অবস্থান না থাকলেও সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আড়াই হাজার, সোনারগাঁ, বন্দরসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় অবরোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা।
অবরোধের বাস্তবায়নের ক্ষুদ্র চেষ্টায় বিএনপি
জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা দ্বিতীয় দফার ৪৮ ঘন্টার অবরোধ কর্মসূচির প্রথম দিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন স্থানে সড়কে পেট্রোল ঢেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। এদিকে অবরোধ সফল করতে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি, জেলা ও মহানগর যুবদল। আড়াইহাজারেও অবরোধের সমর্থনে বিক্ষোভ করেছে বিএনপি সমর্থকরা।
রোববার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায়, এশিয়ার হাইওয়ের মদনপুরে এবং ঢাকা-সিলেটের মহাসড়কে ককটেল বিস্ফোরণসহ গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে কয়েকটি জায়গায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করা হয়। তবে পুলিশ আসার ভয়ে তারা আগুন জ্বালিয়েই সটকে পড়ে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সানারপাড়ে সড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে জেলা বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সমর্থকগণ।
এই সময় সরকার বিরোধী বিভিন্ন স্লোগানসহ ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। অবরোধের সমর্থনে হাজীগঞ্জ বাজার এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও অগ্নিসংযোগ করেছে মহানগর যুবদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় লাঠিসোটা নিয়ে মহড়া দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং একটি প্রাইভেটকারের কাঁচ ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই তারা পালিয়ে যায়।
সকালের দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বান্টিবাজার এলাকায় অবরোধের সমর্থনে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার চেষ্টা করে বলে জানা যায়। এর বাইরে সিমরাইলে ছাত্রদল এবং মদনপুরে যুবদলের নেতাকর্মীরা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। সেখানে পুলিশের আগমনে সটকে পড়ে তারা। সকাল সাড়ে দশটার দিকে অবরোধের সমর্থনে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
মিছিলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর বিএনপি’র সদস্য সচিব এডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, সদর থানা বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানা, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এইচএম আনোয়ার প্রধান, মহানগর বিএনপি’র সদস্য কামরুল হাসান চুন্নু সাউদ, মাকিত মোস্তাকিম শিপলুসহ মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এর আগে, শনিবার দিবাগত রাতে সাইনবোর্ড এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীশূন্য বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে বাসের বাহিরে তেমন একটা ক্ষতি না হলেও বেশির ভাগ আসনই পুড়ে যায়। এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। এর বাইরে বড় ধরণের কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি বিএনপি।
অবরোধ প্রতিরোধে শক্ত অবস্থানে আওয়ামী লীগ
তবে বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা দ্বিতীয় দফার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ সরব ছিল আওয়ামী লীগ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বান্টি, পাঁচরুখী, ছনপাড়া, পুরিন্দাসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান করে আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। রোববার সকাল থেকেই পাঁচরুখী ও তার আশপাশের এলাকায় অবরোধ প্রতিরোধে লাঠি হাতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সড়কে অবস্থান করতে দেখা যায়।
আড়াইহাজারের বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই অবস্থান করতে দেখা যায় এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর সমর্থকদের। অবরোধের প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে সোনারগাঁও আওয়ামী লীগ। রোববার সকালে তারা সড়কে অবস্থান করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বিরু, জেলা তাঁতী লীগের সহসভাপতি দেওয়ান কামালসহ আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতকমীগণ। তাছাড়া অবরোধের প্রতিবাদে মদনপুরে অবস্থান করে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে অবরোধের বিরুদ্ধে বন্দরে হোন্ডা র্যালি করেছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ। রবিবার বিকালে অনুষ্ঠিত এই র্যালিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক পরেশ চৌধুরী, মহানগরের সহসভাপতি আলমগীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রবিউল হোসেন মিন্টুসহ নেতাকর্মীগণ। র্যালিটি বন্দরের নাসিক ২৫ নং ওয়ার্ডের তালতলা এলাকা থেকে শুরু করে ২৬ ও ২৭ নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে তারা।
অবরোধের প্রতিবাদে মাঠে ছিল এমপি খোকা
বিএনপি-জামায়াতের ডাকা দ্বিতীয় দফার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধের প্রতিবাদে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়ার চৌরাস্তায় অবস্থান করেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মোগরাপাড়া চৌরাস্তাসহ আশপাশের এলাকায় জাতীয় পার্টি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে অবরোধ প্রতিরোধে সড়কে অবস্থান করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম ইকবাল, সহসভাপতি দেওয়ান উদ্দিন চুন্নু, উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আব্দুর রউফসহ জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীগণ।
তৎপর ছিল পুলিশ
বিএনপি ও জামায়াতের দ্বিতীয় দফা ডাকা অবরোধের প্রথম দিনে বেশ তৎপর ছিল নারায়ণগঞ্জ পুলিশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ শক্ত অবস্থান ছিল। একই সাথে মহাসড়কে র্যাব’র টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। পুলিশের তথ্য মতে, গত ২৮ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বিএনপির মহাসমাবেশের দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন থানায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫টির মতো মামলা দায়ের করা হয়েছে।
একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বিএনপির ২৮৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে পুলিশকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা, নাশকতা ও অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অপরাধে বিস্ফোরক আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়।
এই সব মামলার তালিকায় উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, জেলা বিএনপির সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, সহ অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মনিরুজ্জামান মনির, মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু, আজহারুল ইসলাম মান্নান, সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুরসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মীর নাম।
গতকাল অবরোধের প্রথম দিন নারায়ণগঞ্জের অভ্যন্তরীণ রুটের সব বাস চলাচল করছে স্বাভাবিক নিয়মে। যাত্রী কম থাকায় কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে রাজধানী মূখীসহ দূরপাল্লার বাস চলাচলে। নগরীর সড়কগুলোতে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে পুলিশ।
অবরোধ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) গোলাম মোস্তফা রাসেল জানান, আলহামদুলিল্লাহ সারাদিনে আমাদের পরিস্থিতি খুব ভালো ছিলো। প্রতিটি জায়গা আমাদের পিকেট আছে, মোবাইল আছে। দিনের বেলায় আমাদের ৪২টি মোবাইল টিম ও রাতের বেলা ৪২টি মোবাইল টিম কাজ করছে। এছাড়া পুলিশ সাদা পোষাকে কাজ করছে। মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। আল্লাহর রহমতে আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও ভালো আছে।
নারায়ণগঞ্জের রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার কামরুল ইসলাম খান জানান, ভোর থেকে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল করছে। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পরিচালক বাবু লাল বৈদ্য জানান, নৌপথে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সকাল থেকে সব রুটে নৌযান চলাচল করছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ শাখার সহকারী পরিচালক জিয়াউল ইসলাম লাইভ বলেন, আমরা দেশের জানমাল রক্ষার্থে সব সময় কাজ করি। সেক্ষেত্রে বিএনপি-জামাতের ডাকা ৪৮ ঘন্টার অবরোধ কর্মসূচিতে আমরা সারাদিন মাঠে ছিলাম। কোথাও কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমরা সব সময় সতর্ক অবস্থানে আছি। এস.এ/জেসি


