দরজায় কড়া নাড়ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকা গুছিয়ে নিচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ তো বটেই সারাদেশেই বহুল চর্চিত ওসমান পরিবার আর চুনকা পরিবারের রাজনৈতিক বিবাদ। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন গঠিত হওয়ার পর নির্বাচনগুলোতে আওয়ামীলীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ততটা বেগ পেতে হয়নি ভিন্ন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে যতটা না তিনি ঝক্কি ঝামেলা আর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন নিজ দলে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান ২০১১ সালে নাসিক নির্বাচনে আইভীর কাছে পরাজয়ের পর সারাদেশে নারায়ণগঞ্জ মানেই আইভী-শামীমের রাজনৈতিক দ্বৈরথ। নির্বাচনের পরে ভাই-বোন, নির্বাচনের আগে ভোট ব্যাংকে চোখ রাঙানি এই মাত্রা দুজনের মধ্যে একরকম দা-কুমড়ো সম্পর্ক তৈরি করেছে। ২০১৪ সালে নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর তার আসনে সংসদ নির্বাচিত হন সেলিম ওসমান।
প্রথম দিকে আইভী-শামীমের দ্বৈরথে নিজেকে না জড়িয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করলেও জাতীয় পার্টির এই এমপি পরবর্তীতে শামীম-আইভীর দ্বন্দ্বে আর স্থির থাকতে পারেননি। আইভী-শামীম যেমন বাকযুদ্ধ, উত্তর-প্রতিত্তুর মুখর, এর বিপরীতে আইভী-সেলিম ওসমানও কম যান না। কখনো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সেলিম ওসমান গাঞ্জার নৌকা আর তালগাছে উঠবেনা বলেছেন, আবার সিটি নির্বাচনের আগে আইভীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে নন।
কখনো শোনা গেছে সেলিম ওসমান নির্বাচন করবেন। অথবা ওসমানদের আজ্ঞাবহ আওয়ামীলীগ নেতারা নাসিকের মেয়র পদের চেয়ারে চোখ দিয়েছেন। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি আইভীর উপর হামলার পর আওয়ামীলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার পর এই বাকযুদ্ধের আক্রমন বেড়েছে। গত বছর সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে আইভী প্রার্থী হলে তার পরীক্ষা নিয়েছেন শামীম-সেলিম ওসমান দুজনই। কখনো সেলিম ওসমানের আজ্ঞাবহ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানরা স্বতন্ত্র তৈমূরের মিছিলে বিশাল শোডাউন করেছেন।
আবার কখনো শামীম ওসমানের অনুগত ছাত্রলীগ-স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও যুবলীগ, মহানগর আওয়ামীলীগ নেতারা আইভীর প্রচারণায় কেন্দ্রীয় নেতাদের ডাকে সারা দেননি। যার ফলে ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। ঘটনা প্রবারে শামীম ওসমান সর্বশেষ নাসিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও ফ্যাক্টর হিসেবে ধরা দেন। এক প্রকার কেন্দ্রীয় নেতাদের চাপেই শেষ পর্যন্ত তাকে বলতে হয়, তিনি আওয়ামীলীগ প্রার্থীর পক্ষেই আছেন। নির্বাচনের পরেও কিন্তু এই বরফ আর গলেনি।
নাসিক নির্বাচনের পর আইভীর সাথে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের কথার দ্বৈরথ কিন্তু অব্যাহত ছিল। কখনো সেলিম ওসমান বসার অনুরোধ করেছেন, আবার কখনো শামীম ওসমান একই সুরে কথা বলেছেন। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় আবার আক্রমনাত্মক বক্তব্য দিয়েই অতীতের সেই বাক যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছেন। ছেড়ে কথা বলেননি আইভীও। বেশ কয়েকবার জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও খুব বেশি সুযোগ দেননি দুই ভাইকে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের অর্ধেকের বেশি অংশ নারায়ণগঞ্জ সিটিতে পড়েছে। ফলে ভোটের জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই। শামীম ওসমান-সেলিম ওসমান সিটি নির্বাচনগুলোতে আইভীর যে পরীক্ষা নিয়েছেন সেই পরীক্ষায় আইভী উতরে গেলেও এবার প্রার্থী হলে তারা দুইজনই সেই একই রকম পরীক্ষার সম্মুখীন। ফলে আইভীর সমর্থন যে খুব জরুরী তা অনস্বীকার্য। এতোদিন আলোচনার ডাক দিয়েও তারা দুইজন আইভীর বরফ গলাতে পারেননি।
এবার সুযোগ এসেছে তাও আওয়ামীলীগের সর্বোচ্চ অভিভাবকের সামনে হাজির হয়ে। নাসিকের ১০ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এই অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জের সব জনপ্রতিনিধির সাথে শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আইভীর মনের বরফ গলানোর শেষ সুযোগ বলছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
যদিও আইভী চলতি বছর বলেছেন, প্রয়োজন হলে মেয়রগিরি ছেড়ে তিনি এমপি ইলেকশন করবেন। আদতে তার সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের জন্য নির্বাচনী বৈতরণী সফলভাবে পার হওয়ার জন্য আইভীর সমর্থন অনেক জরুরী মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। এস.এ/জেসি


