এতোদিন নিজের মৃত্যুঝুঁকির কথা জানিয়ে আসছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। কিন্তু গতকাল তিনি অভিযোগ করেছেন অপরিচিত একটি নম্বর থেকে তাকে ফোনকলে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। গতকাল বিকেলে পঞ্চবটি থেকে পাগলা পর্যন্ত ফতুল্লা অঞ্চলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত এক শান্তি মিছিলের পূর্বে তিনি এই অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, তাকে ফোন কল দিয়ে বলা হচ্ছে ‘ তোর মৃত্যুর সময় এসে গেছে।’ অনুষ্ঠানে শামীম ওসমান হুমকিদাতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাদের বলব, কাদের ভয় দেখান? আমরা পঁচাত্তরের পর যারা রাজনীতিতে এসেছি মৃত্যুর ভয় করি না। বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে বলতে চাই, যারা আমাদের হুমকি-ধমকি দেয় বাংলাদেশ ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে, কারও করুণার পাত্র নয়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা লড়াই করে এ দেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আমরা মৃত্যুকে ভয় করি না।’
এদিকে শামীম ওসমানের এমন বক্তব্যে আবারো রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কেননা, সারা বাংলাদেশে আলোচিত সমালোচিত একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান। এই নামটি এখন নারায়ণগঞ্জের গণ্ডি পেড়িয়ে দেশের সকল অঞ্চলকে ভেদ করে পার্শ্ববর্তী দেশেগুলোতেও পরিচিতি লাভ করছে।
কারণ রাজনৈতিক সভা সমাবেশে বক্তৃতায় জনসম্মুখে ব্যাপক তর্জন গর্জন ও নানা রকম তীর্যক ও আকর্ষিত মন্তব্য করে নেট দুনিয়ার সুবাধে দেশের গন্ডি পেড়িয়ে অন্যান্য দেশেও আলোচিত হয়েছেন। নেট দুনিয়ার সুবাধে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বমহলে পরিচিতি পেলেও আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি জামায়তের দ্বারা ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিভিন্ন সভা সমাবেশে বক্তৃতায় বলছেন আমাকে মেরে ফেলা হতে পারে।
তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলেই বিএনপি জামায়াত তাকে মেরে ফেলতে পারেন এমনটা আশঙ্কা করছেন। একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির মুখ থেকে এর আগেও দুবার এমন মন্তব্য জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়ে আছে তিনি কি আসলেই মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছেন?
সূত্রমতে, গত ১৯ আগস্ট ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে ফতুল্লা আওয়ামীলীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ এ কে এম শামীম ওসমান নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আঘাত আসবে ধৈর্য্য ধরে তা মোকাবেলা করা হবে। আমাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হচ্ছে। এরকম চক্রান্ত আগেও হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি।
পরবর্তীতে, গত ১৬ অক্টোবর ‘বীর বাঙালী ঐক্য গড়ো, বাংলাদেশ রক্ষা করো’ এই স্লোগানে বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ শামীম ওসমান সমাবেশের আয়োজন করেন। যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর এই সমাবেশেও বক্তৃতায় শামীম ওসমান বলেন আমাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করা হচ্ছে।
সর্বশেষ এই বক্তৃতার মাস না পেরুতেই গত ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারেও বিএনপি জামায়াতকে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, তফসিল ঘোষণার পর তাদের এই তর্জন গর্জন বিদেশী প্রভুদের যেই আশ্বাস, ঝুলিয়ে রাখা মুলা, যখন দেখবে কাজ হচ্ছে না তখনই তারা মেলিটারী ব্যাকডাউন। হ্যাঁ মে বি। ওই সময় শামীম ওসমান থাকবে না। হয়তো আমাকে মেরে ফেলা হবে। যেমন ২০০০ সালের ১৬ জুন মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের একজন প্রভাবশালী এমপি হওয়া সত্ত্বেও এ কে এম শামীম ওসমান খোদ নিজেই গত ৩ মাস যাবৎ বিভিন্ন সভা সমাবেশ থেকে মিডিয়ার সাক্ষাৎকারে উল্লেখিত করছেন তাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হচ্ছে। তার এমন মন্তব্য পর থেকে রীতিমত জনমনেও আলোচনা সমালোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কারণ গত তিনমাস ধরে তার মন্তব্যেই উল্লেখিত হয়েছে তিনি মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তবে সাধারণ মানুষের ভাষ্যমতে, একজন নাগরিক যখনই মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকেন তখন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আইনের আশ্রয় নেন। কিন্তু একজন সাংসদ বরাবর বলছেন মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছেন তার জন্য আইনের আশ্রয় নেয়াটাই শ্রেয়।
গতকাল ফতুল্লার শান্তি সমাবেশে শামীম ওসমান বলেন, কোন মাইকিং করি নাই, শুধু কর্মীদের কানে পৌঁছানো হয়েছে আমরা ফতুল্লায় মিছিল করবো। আর ভিড় লেগে গেছে। এটা নৌকার কোন মিছিল না, এটা শান্তির মিছিল। এই মিছিল শান্তির পক্ষে, এই মিছিল সকল ধ্বংসের বিরুদ্ধে। যারা বাসে আগুন দিচ্ছে, ট্রেনে আগুন দিচ্ছে, এই মিছিল তাদের বিরুদ্ধে। ওরা আমাদের মানচিত্রে থাবা দিয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত এই নারায়ণগঞ্জে আমাদের ১৭ জনকে হত্যা করেছিল, আমরা কিন্তু কাউকে হত্যা করি নাই। আমরা কাউকে আঘাত করতে চাই নাই। ওরা আমার বাড়ি হিরামহল যেয়ে, আমার বাবা যে চেয়ারে বসতেন সেখানে পেশাব করেছিল। আমরা কিছুই করি নাই। তারা যে অপরাধ করেছে তা শয়তানের কার্যকালাপ।
তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, জনগণকে উছিলা করেছি। এই কারণে জাতির পিতার কন্যা আমাদের সাথে আছেন। জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা হিমালয়ের পর্বতের চেয়েও শক্ত। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে উনি মাথা নত করেননি, ইনশাআল্লাহ করবেনও না।
তিনি আরও বলেন, পঞ্চবটি থেকে মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত ফ্লাইওভার হচ্ছে, ডাবল রেললাইন হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জ হতে আমার মার নামে ভাষা সৈনিক নাগিনা জোহা সড়ক হচ্ছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড এখনও পরিপূর্ণতা লাভ করে নি। এই সড়কের পাশে মেডিকেল হবে, হাসপাতাল হবে। শুধু ফতুল্লা এলাকায় প্রায় ৬শত কোটি টাকার কাজ করেছি। এসব জনগণের জন্যই করা হচ্ছে। এছাড়াও ২২ নভেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জে মিছিল করার কথা বলেন শামীম ওসমান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাবু চন্দনশীল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজাম, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম সাইফউল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন ভুঁইয়া সাজনু প্রমুখ। এস.এ/জেসি


