# আ’লীগ এই আসনের প্রার্থী ঘোষণা না করায় নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি
# আ’লীগের আলাদা প্রার্থী থাকলে উভয় সংকটে থাকবেন সেলিম ভক্তরা
# সেলিম-রশিদ-মুকুল ঐক্য নিয়ে জটিলতায় পড়বেন প্রার্থীরা
প্রতি মুহুর্তেই রং বদলাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের নির্বাচনী পরিবেশের। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে কে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হচ্ছেন, তা নিয়ে একদিকে রয়েছে ধোঁয়াশা। অন্যদিকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের প্রার্থীতা নিয়েও রয়েছে রহস্য আচরণ।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার তৃণমূল বিএনপির হয়ে নারায়ণগঞ্জ-১ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করার বিষয়টি মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এর বাইরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকেও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বর্তমানে সাংসদ হিসেবে আছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী গাজী গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বর্তমানে সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বর্তমানে সাংসদ হিসেবে আছেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা একেএম সেলিম ওসমান। তবে তৈমূরের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মনোনয়ন সংগ্রহের বিষয়টি গোপন রাখা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। আর এই গোপন রাখার বিষয় নিয়েই চলছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে ক্ষমতাসীন দলের সু-দৃষ্টিতে থাকা দলের মহাসচিব অবশ্যই আওয়ামী লীগের পরামর্শেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
তাছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার পর গত ২০ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেন তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী ও মহাসচিব এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। তাই দুটি আসনের কোনটি আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা হতে পারে সেই বিষয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন, তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের লড়াইটা হবে কার সাথে, রূপগঞ্জ আসনে গোলাম দস্তগীর গাজীর সাথে নাকি নারায়ণগঞ্জ সদর-বন্দরের জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের সাথে।
তৃণমূল বিএনপি নিবন্ধন পাওয়ার পর এবং বিএনপির সাবেক নেতা এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার সেই দলের মহাসচিব হওয়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ রাজনীতিতে এবারের নির্বাচন নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা শুরু হয়। একই সাথে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বেই তৈমূর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জের কোন আসন থেকে নির্বাচন করবে তা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় বিশ্লেষণমূলক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। চুড়ান্ত মুহুর্তে এসে যা বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আভির্ভূত হন এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির তৎকালীন নির্বাচিত সাংসদ এডভোকেট আবুল কালামের অন্যতম বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। এরপর তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি পদের দায়িত্বও পালন করেন।
২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী একেএম শামীম ওসমান এবং শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী (নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন)’র সাথে বিএনপির সমর্থন নিয়ে প্রার্থী হন তৈমূর আলম খন্দকার। নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে দলীয় নির্দেশে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন তৈমূর আলম। এরপর ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচনেও তিনি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন না থাকায় দল থেকে তৈমূরকে বহিষ্কার করা হয়।
এরপর গত বছর নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর বিএনপির বড় একটি অংশ তৈমূর আলমকে ঘিরে আলাদা সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। যেখানে ছিল এডভোকেট আবুল কালামের ছেলে আবুল কাউসার আশা, ভাই আতাউর রহমান মুকুলসহ মহানগর বিএনপির হাই প্রোফাইল নেতারা। কিন্তু এসব ধোয়াশা দূর করেই তৃণমূল বিএনপিতে যোগদান করেন তিনি। তাই ঘরের ছেলে হিসেবে এবার তিনি রূপগঞ্জ থেকে নির্বাচন করবেন নাকি রাজনীতির ক্ষেত্র হিসেবে প্রসার বিস্তার করা নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দরের আসনে নির্বাচন করবেন তা নিয়েই চলছে জল্পনা-কল্পনা।
অন্যদিকে আতাউর রহমান মুকুল একদিকে যেমন তৈমূর আলম খন্দকারের সহযোগী ছিলেন। তেমনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান সাংসদ জাতীয় পার্টি নেতা একেএম সেলিম ওসমানেরও খুব বিশ্বস্ততা অর্জনে সর্বদা সচেষ্ট থাকেন তিনি। সেলিম ওসমানের আনুগত্য প্রকাশ করতেই মুকুল গত বন্দর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যানের পদটি ছেড়ে দেন এমএ রশিদকে। বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও দলীয় সমর্থিত প্রার্থী এসএম আকরামের বিরুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করা সহ ভোট কেন্দ্র থেকে তাদের পুলিং এজেন্টদেরও জোর করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ আছে।
তাছাড়া সেলিম ওসমানের বিশ্বস্ততার তালিকায় বন্দর আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে আছে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিদ, সাধারণ সম্পাদক কাজিম উদ্দিন প্রধান, বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আব্দুস সালাম, সাবেক চেয়ারম্যান মাসুম আহমেদসহ বন্দর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। যারা নিজ দলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েও নিজেদের স্বার্থে সেলিম ওসমান বা তার নির্ধারিত প্রতিনিধিকে চোখ বুজে সমর্থন করতে পারে। যার প্রমাণ এর পূর্বেও তাদের অনেকেই দিয়েছেন বলে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারও পেয়েছে এবং অনেক সমালোচিত হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনেও অনেক ধাঁধার চক্করে আবদ্ধ আছেন জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী এমপি সেলিম ওসমান। এই নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগের প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন, তাহলে সেলিম ওসমানে সেই চেল্যা হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের সেই নেতাদের ভূমিকা কোন দিকে যাবে, অর্থাৎ তারা প্রকাশ্যে না পারবে সেলিম ওসমানের প্রচারণা চালাতে না পারবে মন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রচারণা চালাতে।
তাছাড়া গত নাসিক নির্বাচনে সেলিম ওসমানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বন্দরের বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানগণ সরাসরি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে সেলিম ওসমানদের প্রার্থী হিসেবে প্রচারিত তৈমূর আলম খন্দকারের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচনী প্রচারণা করেন। এছাড়া বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সমর্থকদের জাতীয় পার্টির উপর এক প্রকার ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র।
তাছাড়া তৈমূর আলম খন্দকারের বলয়ের লোক হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমান মুকুল প্রকাশ্যে তৈমূরকে সমর্থন করেন নাকি সেলিম ওসমানকে সমর্থন করেন তার উপরও নির্ভর করছে সেলিম ওসমানের নির্বাচন। তবে তৈমূর আলম খন্দকার কার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তার উপর নির্ভর করবে এই দুই আসনের ভাগ্য।
তিনি নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের বর্তমান প্রার্থী বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী নাকি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি একেএম সেলিম ওসমানকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তার উপর নির্ভর করবে এই দুই আসনের নির্বাচনী চিত্র। যদিও এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ আসন থেকে বর্তমান এমপি ও গাজী গোলাম দস্তগীর গাজীকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে কাউকে সমর্থন না করায় বিষয়টি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আওয়ামী লীগ ও তৃণমূল বিএনপির শেষ সময়ের সিদ্ধান্তের উপর। এস.এ/জেসি


