নারায়ণগঞ্জের যে পরিবারটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগের জন্মের ইতিহাস তা হলো ওসমান পরিবারের রাজনীতি। স্থানীয় রাজনীতিতে একমাত্র ওসমান পরিবার থেকেই তিন সহোদর এমপি হয়েছেন। যা নারায়ণগঞ্জে বিরল ঘটনা। তবে বর্তমান সাংসদ দুই সহোদরকে নিয়ে সমালোচনাও কম নেই।
আলোচনা সমালোচনার মাঝেও এখনো ওসমান পরিবার থেকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সেলিম ওসমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন। আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনেও দুই সহোদর দুই আসনে প্রার্থী হয়েছেন। যদিও ওসমান পরিবারের দুই সদস্য সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের বিপক্ষে আসন্ন নির্বাচনে শক্তিশালী কোন প্রার্থী নেই। আওয়ামী লীগ থেকে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হওয়ার নির্দেশনা থাকলেও এখানে আওয়ামী লীগ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই।
এদিকে আগামী ৭ জানুয়ারি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫(সদর-বন্দর) আসনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে লড়াই করবেন এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। ৪ ডিসেম্বর এ আসন থেকে ৪ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাচন কমিশন।
জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে টানা ১৫ বছর এই আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। ২০১৪ সাল প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমান মারা যাওয়ার পর এখান থেকে উপ নির্বাচনে সেলিম ওসমান সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। বিগত সমেয়র নির্বাচনের মত ২০১৮ সনেও আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির মহাজোট থাকায় তখন সেলিম ওসমান সহজে জয় পেয়ে যান।
কিন্তু আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির মহাজোট না থাকলেও এখানে নৌকার প্রার্থী দেয়া হয় নাই। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীতায় কোন বাধা ছিল না। বরং প্রতিটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের ডামি প্রার্থী থাকার নির্দেশ দিয়েছে দলীয় সভানেত্রী। তার পরেও এখান থেকে আওয়ামী লীগের কোন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন নাই।
দলীয় সুত্রমতে, শামীম ওসমানের ভাই জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিম ওসমান সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ২০১৬ সালে। পরিবারের মর্যাদা বিসর্জনে তিনিও কম যাননি। ২০১৬ সালের ১৩ মে সেলিম ওসমানের সামনে একজন প্রবীণ শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। জনসমক্ষে স্কুল শিক্ষকের অপমান সেসময় দেশব্যাপী প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। ক্ষুব্ধ করেছে মানুষকে।
তখন সারাদেশে সেলিম ওসমানকে সমালোচনা তৈরী হয়। সেলিম ওসমানের সাজার দাবিতে মানুষ যখন সোচ্চার ঠিক তখনই মৌলবাদী সংগঠন খতমে নবুওয়্যাতকে নিয়ে সেলিম ওসমানের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় হেফাজত। ইসলাম অবমাননার ধোঁয়া তুলে তারা শ্যামল কান্তি ভক্তের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করতে থাকেন। সেলিম ওসমান তখন জাতীয় পার্টির নেতা থেকে হয়ে ওঠেন মৌলবাদীদের নেতা।
এর আগে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন(বিকেএমইএ) নির্বাচনেও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বর্তমানেও তিনি এই ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি হিসেবে রয়েছেন। তাছাড়া ২০০২ সালে সেনাবাহিনী সেলিম ওসমানকে অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেলিমের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র মামলাটিকে রাজনৈতিক অভিহিত করে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশন সুত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সেলিম ওসমানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তৃণমূল বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানী ভুঁইয়া, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এএমএম একরামুল হক, এছাড়া জাকের পার্টির প্রার্থী মোর্শেদ হাসান ও বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টির প্রার্থী ছামছুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। সব কিছু ঠিক থাকলেও তারা আসন্ন নির্বাচনে সেলিম ওসমানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
দলীয় সুত্রমতে জানা গেছে, অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ ভাসানী ভুঁইয়া নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ শহর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সহ বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির প্যানেল থেকে নির্বাচিত জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্যানেল থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট এএমএম একরামুল হক। আদালতপাড়ায় তিনি আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে তাদের তেমন ভাবে না চিনলেও আদালত পাড়ায় তাদের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।
ভোটের মাঠে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের সাথে কতটুকু লড়াই করতে পারবেন তা নিয়ে কোন আলোচনা নেই রাজনৈতিক মহলে। কেননা রাজনীতিতে তাদের তেমন ভাবে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে ধরা হয় না। তাছাড়া সেলিম ওসমানের মত দুইবারের এমপির সাথে অপিরিচিত মুখ হয়েই তারা কতুটুক টিকে থাকতে পারবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছে সেলিম ওসমানকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা থাকলেও তার বিপক্ষে শক্তিশালী প্রার্থী না থাকায় তিনি তেমন কোন চ্যালেঞ্জে নাই। সব কিছু ঠিক থাকলেও আর নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণাকৃত ৭ জানুয়ারি ভোট গ্রহন হলে সহজে তিনবারের মত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। এস.এ/জেসি


