নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টি মনোনীত বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান মানেই সংবাদ কিংবা আলোচনার শিরোনাম বলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি কথার প্রচলন আছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষককে নিজে উপস্থিত থেকে কান ধরে উঠ-বস করানো, নিজের ভাবি সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করা, একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে রাজাকারদের প্রশ্রয় দেওয়া এমনকি শত অন্যায়েও তাদের পক্ষ নিয়ে কাজ করা এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকাকে গাঞ্জার নৌকা বলে আখ্যায়িত করা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সময়ই আলোচনায় থাকেন তিনি।
রাজনৈতিকভাবে জাতীয় পার্টির নেতা ও সাংসদ সেই সেলিম ওসমানই এবার নিজেকে সবচেয়ে বড় আওয়ামী লীগার হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এবার নৌকা নিয়ে কে নির্বাচন করবেন সেই বিষয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থীরা কেন সেলিম ওসমানের সাথে বসলেন না তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি কি বাইরের লোক, আমি কি রাজাকার?’ তার এই প্রশ্নের উত্তরে কোন যুক্তিতে জাতীয় পার্টির একজন নেতার সাথে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের নেতারা বসতে যাবেন সেই প্রশ্ন ছুড়েছেন আওয়ামী ভক্তরা। একই সাথে সেলিম ওসমান লাঙ্গল প্রতীক আওয়ামী লীগের হাত থেকে এনেছেন নাকি জাতীয় পার্টির হাত থেকে এনেছেন সেই বিষয়টিও মনে করিয়ে দিতে চান তারা।
গত ৮ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির মনোনীত সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান বলেছেন, যারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেন, তারা আমার সাথে একটু বসতে পারলেন না যে, এবার নৌকা নিয়ে কে নির্বাচন করবে? কেনো বসলেন না? আমি কি বাইরের লোক, আমি কি রাজাকার? তিনি আরও বলেন, এখানে আপনারা সবাই বলেছেন যে, আপনারা আওয়ামী লীগ করেন। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলবো, এখানে আমার থেকে বড় আওয়ামী লীগার এই ঘরে কেউ নাই।
এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ বলি নাই। এমন মন্তব্যের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর-বন্দর আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ ও ত্যাগী নেতাগণ খুবই বিস্মিত হয়েছেন। তাদের মতে উনি জাতীয় পার্টির লাঙ্গর প্রতীকের নেতা, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের না। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উনি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীককে গাঞ্জার নৌকা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
একই মঞ্চে তিনি জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গলের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন প্রধানকে নিজের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণাসহ সেখানে উপস্থিত সকলের সাথে পরিচয় করে দেন। সেই আয়োজনে এমএ রশিদ উপস্থিত না থাকায় তার প্রতীক নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেন তিনি। তাই তিনি কিভাবে নিজেকে আওয়ামী লীগার বলে দাবি করেন। গত সিটি নির্বাচনেও তার ঘোষিত এই নিজেদের লোকেরা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ইউপি নির্বাচনের আগে একেএম সেলিম ওসমান বন্দরের নবীগঞ্জ গার্লস হাই স্কুলের একটি নতুন ভবন উদ্বোধনের সময় বলেছেন, একজন বিশিষ্ট নেতা, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান (বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ রশিদ) উনি আজকে এখানে নাই। তো ওনার গাড়িটি আমি রাস্তায় দেখেছি। তিনজনের একজন এখানে উপস্থিত আছেন। আরেকজন পরপারে চলে গেছেন, আরেকজনে কলাগাইচ্ছায় গাঞ্জার নৌকা তাল গাছে উঠাইতে গেছেন।
ওনার বুঝা উচিৎ যে, আজকে চেয়ারম্যান বানালে কয়েকদিন পরেই থাকবে না। কোন লুটেরাকে চেয়ারম্যান বানাইলে আপনার লাভ হবে না। গাঞ্জার নৌকা কখনও তালগাছ দিয়ে ওঠবে না। আমি বহু আগেই আমার মানুষ (দেলোয়ার প্রধানকে) আমি চেয়েছি। কলাগাইচ্ছায় আমার মানুষ লাঙ্গল নিয়ে দেলোয়ার হোসেন। তবে আওয়ামী লীগের কর্মীদের মতে এখানে কেউ নিজের ইচ্ছায় নৌকার প্রার্থী হননি।
দলীয় প্রধানের নির্দেশেই নৌকার প্রার্থী হয়েছেন। তাই নৌকাকে অপমান করা মানে সরাসরি দলীয় প্রধানকেই অপমান করা। এর আগেও জাতীয় পার্টির প্রতি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অভিযোগ এবং ক্ষোভ থাকলেও সেলিম ওসমানের এরকম বক্তব্যের পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকগণ। বিশেষ করে এই বক্তব্যে বন্দর আওয়ামী লীগের তৃণমূলের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
গত সিটি নির্বাচনেও যাদের তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নিজের লোক বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেই দেলোয়ার প্রধান, মুসাপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদ এবং বন্দর ইউপি চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিন আহমেদসহ সেলিম ওসমানের সাগরেদরা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে বিএনপির বহিষ্কৃত প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করেছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে যারা এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন তারা দলীয় স্বার্থেই বিভিন্ন সময় সেলিম ওসমানের সমালোচনা করেছেন। এখন তারা সেলিম ওসমানের পক্ষে কাজ করবে কিভাবে। তাহলে কর্মী সমর্থকদের কাছে তারা ধিক্কার পাবে।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই বলেন, উনি (সেলিম ওসমান) এ ধরণের কথা বলেছেন কি না আমি জানি না। যদি বলে থাকে তাহলে, এ ধরণের কথা বলার কোন মানে হয় না। আমরা কি এরশাদের জাতীয় পার্টির রাজনীতি করি নাকি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। আমরা আমাদের দলীয় মনোয়নের বিষয়ে তার সাথে বসতে যাবো কেন? যে, কোন কিছু করলে তার সাথে কথা বলে করতে হবে।
সেলিম ওসমানের এধরণের প্রশ্নের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু বলেন, ওনি যদি আওয়ামী লীগারই হতেন তাহলে ওনিতো আওয়ামী লীগ থেকেই নির্বাচন করতেন এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই মনোনয়ন নিতেন। আওয়ামী লীগার হইলে ওনিতো আর জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাইতেন না। আমরা আওয়ামী লীগের দল করি, তাই আমাদের চাওয়া-পাওয়া সব সময়ই আওয়ামী লীগের কাছ থেকেই হবে।
আমরা কেন জাতীয় পার্টির নেতার সাথে বসতে যাবো! উনি কি আওয়ামী লীগের নেতা? কথায় আছে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড়। আমাদের নেত্রী হয়তো কোন বৃহত্তর স্বার্থেই এই আসন থেকে কোন প্রার্থী দেন নাই। দল ও দেশের কথা ভেবে আমাদের সেটাই মেনে নিতে হবে। আমাদের কোন কিছু দাবি থাকলে আমরা আমাদের নেত্রীর কাছে চাইবো। নেত্রী কোন সিদ্ধান্ত দিলে আমরা সেই সিদ্ধান্ত মেনেই কাজ করবো। এর বাইরে আমরা অন্য দলের নেতার সাথে বসতে যাবো কেন? এস.এ/জেসি


