আসন ছাড়, আওয়ামী লীগের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
ফরিদ আহমেদ রবি
প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৩৭ পিএম
জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সম্প্রতি বলেছেন জোট মহাজোট নয় জাপা লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে এককভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, তিনি এও বলেছেন আসন বন্টনের কোন প্রয়োজন নেই ১৯৯১ সনের মতো ভোটের মাঠে নীরব বিপ্লব ঘটতে পারে যা জাতীয় পার্টির পক্ষে আসবে (দৈনিক ইত্তেফাক ৬ ডিসেম্বর)।
এখন বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে জাপা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে আসন সমঝোতার জন্য দরকষাকষি করছে অর্থাৎ মুখে এক কাজে আরেক। বিএনপি জামাত সহ সমমনা দল গুলোর নির্বাচন বর্জনের কারণে এমনিতেই প্রায় একপেশে হয়ে যাচ্ছে আসন্ন নির্বাচন।
জাপা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দিতার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে আসন সমঝোতা হলে তাও বিলীন হয়ে যাবে। নির্বাচন শুধু একপেশে নয় বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হীন হয়ে পড়বে। জাপা, তৃণমূল বিএনপি এবং ১৪ দলীয় জোটের সাথে আসন সমঝোতা করে নির্বাচন করলে তা কোন অবস্থাতেই নির্বাচনী আমেজ ধরে রাখতে পারবে না।
২৯৮ টি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাঁদের অনেককেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। আসন সমঝোতায় শরিকদের আরো একটি প্রধান শর্ত, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও সমঝোতার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
এই যদি হয় আসন্ন নির্বাচনের সমীকরণ তাহলে যতটুকু সম্ভাবনা আছে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন এবং ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির, তাও ভেস্তে যাবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আওয়ামী লীগ। দেশের অন্যান্য নির্বাচনী অঞ্চলে আওয়ামী লীগ অথবা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওপর আসন সমঝোতা কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা বুঝা না গেলেও নারায়ণগঞ্জে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে সচেতন মহলের ধারণা। নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে জাপা প্রার্থী সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনটি পেয়ে গেছে বলা চলে। নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনে আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রার্থী শামীম ওসমানের বিজয় সুনিশ্চিত বলে ধরে নেয়া যায়।
বাকি তিনটি আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে। জাপা এবং তৃণমূল বিএনপির চাহিদায়ও উক্ত তিনটি আসন রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ১ এবং ২ আসনে আওয়ামী লীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুজন এমপি রয়েছেন , এবারও তাঁরা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।নারায়ণগঞ্জ ৩ আসনের বর্তমান এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা বিগত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতার কারণে জাতীয় পার্টির এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, এবারও তিনি প্রার্থী।
আসনটিতে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে স্হানীয় আওয়ামী লীগ আসন ছাড় দিতে নারাজ। আওয়ামী লীগ, সাবেক সাংসদ কায়সার হাসনাত কে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আওয়ামী লীগের বেশ কজন প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন।
এমন অবস্থায় আসনটি আগের মত জাপাকে ছেড়ে দেয়া হলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবেনা বলে নিশ্চিত করেই বলা যায়।একই অবস্থা নারায়ণগঞ্জ ১ এবং ২ এর ক্ষেত্রে।১ আসনের প্রার্থী গাজী গোলাম দস্তগীর বর্তমান এমপি এবং মন্ত্রী। ২ আসনের এমপি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু।
জাপা এবং তৃণমূল বিএনপি'র সাথে সমঝোতার কারণে আসন তিনটিতে ছাড় দেয়া হলে তার প্রভাব পড়বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক অর্থাৎ পুরো আওয়ামী লীগের উপর। যার পরিণাম আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর হবে না বলে সচেতন মহলের ধারণা।
জাপা এবং তৃণমূল বিএনপি'র মহাসচিবের কথা অনুযায়ী তারা যেহেতু যথেষ্ট জনপ্রিয় সঙ্গত কারণেই এখানে তাদের আসন ছাড় দেয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।একপেশে নির্বাচনকে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা দিতে হলেও সারাদেশেই নির্বাচন মুখী সব দলের প্রতিদ্বন্দিতার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসার সৎ সাহস থাকা দরকার।
আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করলে তার গ্রহণযোগ্যতা আরও ক্ষীণ হয়ে আসবে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ হতাশ হয়ে পড়বে যার প্রভাবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সংকট জনক অবস্থায় পতিত হবে বলে রাজনীতি সচেতন মহলের ধারণা। তাই যতটুকু ছাড় দেয়ার দেয়া হয়েছে, আর নয়।
নারায়ণগঞ্জে আরও বেশি ছাড় আওয়ামী লীগের জন্যই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে বলেই সমর্থকদের ধারণা। এমন অবস্থায় নারায়ণগঞ্জে যতটুকু ছাড় দেয়া হয়েছে তার চেয়ে বেশি ছাড় দেয়া কোন অবস্থাতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। আসন ছাড় দেয়া যদি একান্তই প্রয়োজন হয় তা যেন নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিক না হয়।
একটি পক্ষের নির্বাচন বর্জনের কারণে এমনিতেই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, নির্বাচনের পর তা আরো প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেক্ষেত্রে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে আওয়ামী লীগকে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি কমে আসলে সংকট উত্তরণে কর্মী সমর্থকদের সক্রিয় ভূমিকায় পাওয়া কতটুকু সম্ভব হবে, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। আওয়ামী লীগের যেকোন কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী নারায়ণগঞ্জ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল থাকলে সংকটকালীন সময়ে আওয়ামী লীগকেই এর মূল্য চুকাতে হবে।
তাই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং অটুট রাখার স্বার্থে হলেও নারায়ণগঞ্জের বাকি তিনটি আসনে কোন অবস্থাতেই অন্য কোন দলকে আসন ছাড় দেয়া ঠিক হবে না বলেই সচেতন মহলের ধারণা। লেখক : বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।


