নারায়ণগঞ্জ সদর-বন্দর আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনে দাবি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দিতে হবে। তবে তৃণমূল আওয়ামী লীগের এই দাবি এড়িয়ে এই আসনে এইবার ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পার্টিকে সমর্থন না দিলেও এই আসনে নৌকা প্রতীকের কোন প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।
এর ফলে একদিকে যেমন এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীসহ আওয়ামী লীগের তৃণমূলসহ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ অসন্তুষ্ট হন, অন্যদিকে এখানকার জাতীয়পার্টি ভক্ত আওয়ামী লীগ নেতারা আবারও তাদের স্বার্থ সিদ্ধির সুযোগ পেয়ে খুশিতে আহলাদে আটখানা হয়ে পড়েছেন বলে জানা যায়। তবে এদের মধ্যেও অনেকে অর্থাৎ যারা জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করতে বাধ্য হলেও দীর্ঘদিন যাবৎ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী দল থেকে কিছুটা প্রতিদান পেতে চান তারা অনেকটাই নাখোশ আছেন বলে জানা যায়।
এরই মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টি নেতা একেএম সেলিম ওসমান এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তাদের মধ্যে নৌকার মনোনয়ন কে পাবে সে বিষয় নিয়ে তার সাথে কেন বসলেন না তা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। যেটাকে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী নেতার কাছেই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা বলে মনে করা হয়।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এই আসন থেকে নৌকার প্রার্থী দেওয়ার জন্য। তাদের মতে, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ মাত্র একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এসএম আকরামের হাত ধরেই এই আসনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়। এরপর প্রায় তিন দশক হতে চললো এই আসনে আওয়ামী লীগ আর কোন প্রতিনিধি পায়নি।

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল দাবি করেছেন দলীয় প্রধান ছাড়া অন্যান্য সংসদ সদস্যদের সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি যেন মনোনয়ন না দেওয়া হয়। এর ফলে একদিকে যেমন নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ হবে অন্যদিকে দীর্ঘদিন দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করা নেতা কর্মীগণও তাদের কাজের মূল্যায়ন পাওয়ার সুযোগ পাবে। এই আসন থেকে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তিনি নিজেও তাই দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।
তিনিও এখন সেলিম ওসমানকে সমর্থন দেয়া যায় বলে জানিয়েছেন। সেলিম ওসমানকে মহাজোটের প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের বায়তুল আমানে আওয়ামী লীগের জন্ম। সেই বাড়ির সন্তান সেলিম ওসমান। তাই আমাদের নৌকা মার্কা সেলিম ভাই। উনি আমাদের মহাজোটের প্রার্থী। এই বন্দরের মাটি সেলিম ভাইয়ের ঘাঁটি।
তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের মতো ভালো মানুষকে এমপি হিসেবে চায়, মন্ত্রী হিসেবে চায়। সেলিম ভাই শামীম ভাই জিতবে এবং মন্ত্রী হবে। অনেকের আক্ষেপ বাদল ভাই ৫০ বছর পার হয়ে গেলো। আপনি একটা নির্বাচন করলেন না। আমি বললাম আমার কোন আপত্তি নাই। আমি সমর্থন জানাইলাম। আপনারা দুই হাত তুলে বলেন সমর্থন জানাইলাম।
তবে র্দীঘদিন যাবৎ নতুনদের সুযোগ করে দেয়ার দাবি জানিয়ে যিনি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রচারণা চালানোর অভিযোগে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সভা সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সেই নেতা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট খোকন সাহা কিন্তু তার গুরু সেলিম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। অনেকটা যত্নের সাথেই সেলিম ওসমানের পক্ষে কাজ করার জন্য নিজে উদ্যোগী হয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।
এরই মধ্যে খোকন সাহা বন্দরে অবস্থিত নাসিকের ৯টি ওয়ার্ডের নেতা কর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভা করেছেন বলে জানা গেছে। গত সোমবার সন্ধ্যায় শহরের পুরাতন কোর্ট সংলগ্ন এলাকায় তার ‘ল’ চেম্বারে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি প্রার্থী সেলিম ওসমানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার জন্য দিক নির্দেশনা দেন খোকন সাহা। এমনকি নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের এই নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দিয়ে তিনি ভোট কেন্দ্রগুলোর জন্য কমিটিও গঠন করে দেন।
তাছাড়া সেলিম ওসমানের জাতীয় পার্টি মার্কা আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত এমএ রশিদতো আরও এক কাঠি সরেস। বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (ওসমান পরিবারের বদৌলতে পদ পাওয়া) এই নেতা তো এর আগে দলীয় সিদ্ধান্ত কিংবা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আগেই সেলিম ওসমানকে বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে নৌকার দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। তাছাড়া লাঙ্গলের মনোনয়ন জমা দেয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজিম উদ্দিন প্রধান।
সূত্র জানায়, এই আসনে আওয়ামী লীগ কোন প্রার্থী না দেয়ায় অনেকটাই খোশ মেজাজে আছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমান। দলীয় কিংবা দলের বাইরে কোন বড় ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশঙ্কা না থাকায় অনেকটা খালি মাঠেই এবার গোল দিতে পারবেন বলে আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদীরা এখন তার পক্ষে অনেকটা বেপরোয়া ভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন। এই আসনের জাতীয় পার্টির নেতারাও তাই অনেকটা নির্ভার ভাবে আছেন।
এমনকি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অভিযোগ এখানে নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদীরা যেভাবে তৎপরতা দেখাচ্ছেন তার সিকিভাগও দেখাচ্ছেন না জাতীয় পার্টির নেতারা। কারণ তারা জানেন, তাদের কাজটি তাদের পোষা আওয়ামী লীগ নেতারাই করে দিবেন। তাই তো আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশ্যে সেলিম ওসমান বলেন, ‘যারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেন, তারা আমার সাথে একটু বসতে পারলেন না? যে এবার নৌকা নিয়ে কে নির্বাচন করবে। কেন বসলেন না? আমি কি বাইরের লোক, আমি কি রাজাকার?’
তবে তার এই বক্তব্যকে ভালো চোখে দেখেননি নৌকা প্রতীকের দাবিদার নৌকা মার্কার আওয়ামী লীগের নেতারা। বিষয়টিকে তাদের জন্য অনেকটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো বলে ভাবা হচ্ছে। দলের তৃণমূলের কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে অনেকটাই নিজেদের ঘরকুনো করে রেখেছেন নিজেদের। তাছাড়া যাদের হাতে নিষ্পেষিত হচ্ছে এখানকার আওয়ামী লীগ, তাদের কাছে নিজেদের পরাজয়ে অনেকটাই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন তারা।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের মতে দলীয় প্রধান হয়তো দলের কথা চিন্তা করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু এই একটি আসন; যেখানে দীর্ঘদিন যাবৎ অবহেলিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে আওয়ামী লীগের ত্যাগী সদস্যগণ। যেখানে অস্তিত্ব সংকটেই পড়তে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি।
তাছাড়া যে প্রতীক এখানে বিভিন্ন সময় ক্ষমতা ও পেশি শক্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ধরাশায়ী করছে। যার কারণে বার বার নেতৃত্ব শূন্যতায় পড়তে হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে। সে অবস্থায় এখানকার লাখ লাখ আওয়ামী ভক্তদের রক্তক্ষরণের বিনিময়ে সেই রক্তাক্ত হাতকেই কেন বারবার শক্তিশালী করা হচ্ছে তা নিয়ে চলছে হতাশা। এজন্য নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাকেও দূষছেন তারা। এস.এ/জেসি


