# একদিকে বিএনপি অন্যদিকে বৈদেশিক রাষ্ট্রের চাপে আ’লীগ
# এর আগে এরশাদ নির্বাচন বর্জন করলেও অংশ নেন রওশন সমর্থকরা
# তৃণমূল বিএনপি’র ব্যর্থতায় আবারও সুযোগে জাপা
# ’১৮ সালের নির্বাচনেও তাদের ৪০টি আসন দেয় আ’লীগ
# রওশন কাদেরের দ্বন্দ্বে হিসেব করে এগুচ্ছে জাতীয় পার্টি
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ, দাবি পাল্টা দাবিসহ জাতীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা চলছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের পদত্যাগের পর একটি নির্দলীয় সরকার ছাড়া অন্য কিছুই তারা গ্রহণ করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।
সেই লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের নানা কর্মসূচি পালন করছে দলগুলো। অন্যদিকে আসন্ন নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক চাপ। তবে আওয়ামী লীগও বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। এর বাইরে আর কিছুই তারা গ্রহণ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন বাস্তবায়ন করতে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
তাই নির্বাচনকে প্রাণবন্ত ও ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালচ্ছে তারা। তবে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম দল বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় এই নির্বাচন দেশ ও দেশের বাইরে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে পরিচিত হবে মনে করা হয়।
তাই ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’র মতো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদরে মতে গ্রহণযোগ্য দল হিসেবে এখন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের (প্রয়াত) জাতীয় পার্টি (জাপা) অনেকটা তুরুপের তাস হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করা হয়। আর সেই সুযোগে জাতীয় পার্টিও চাচ্ছে যতটা সম্ভব নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আসন দাবি করতে চাইছে তারা। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে এবারের নির্বাচনের বল এখন অনেকটাই জাতীয় পার্টির কোটে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন ছাড়া জাতীয় পার্টি ভরাডুবির আশঙ্কায় আছে। তাই প্রথম থেকেই তারা ৩০০টি আসন থেকে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা দিলেও আওয়ামী লীগ তাদের কয়টি আসনে নির্বাচিত করতে চায় সেই বিষয়টি আগে থেকেই নিশ্চিত হতে চাচ্ছে। বিষয়টি আরও আগে প্রকাশ্যে না আনার কারণ হিসেবে দলটির নেতৃত্ব নিয়ে টানাটানিকে উল্লেখ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
বিশ্লেষকদের মতে দলটির নেতৃত্ব নিয়ে সাবেক ফার্স্ট লেডি ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং এরশাদের ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এখানে নির্বাচন কমিশন কার নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন তা নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে সংশয় ছিল। এর আগে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও দলের নেতৃত্বের হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখা গিয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। এমনকি এরশাদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ।
তাই এরশাদের জীবিত থাকা অবস্থাতেও বিরোধী দলের নেতা হন স্ত্রী রওশন এরশাদ। তাই এইবার সেই ফাঁদে পড়তে চাননি দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তাছাড়া এবারের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক চাপ থাকায় নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে জাতীয় পার্টির নির্বাচনে থাকার গুরুত্বটাও আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় ফ্যাক্টর।
এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির বিকল্প হিসেবে বিএনপির দলছুট নেতাদের নিয়ে গঠিত তৃণমূল বিএনপিকে একটি সুযোগ দেয়ার চেষ্টা চালায় বলে প্রচার আছে। আর তৃণমূল বিএনপি তাতে দারুনভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মনে করা হয়। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে জাতীয় পার্টি ৪০টির মতো আসন দাবি করতে পারে বলে বিভিন্নভাবে জানা যায়।
তবে কোন দল সংসদে বিরোধী দল হিসেবে থাকবে এবং কতটি আসন পাবে নির্বাচনের আগেই তা ভাগ করে দেওয়া আওয়ামী লীগের জন্য নতুন কিছু নয়। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও মহাজোটের শরিক হিসেবে আসন বন্টন করে দেয় জোটের বড় দল আওয়ামী লীগ। আর সেই অনুযায়ী নির্বাচন করেই জোটে থেকেও সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকে জাতীয় পার্টি।
জানা যায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিজেদের জন্য ২৪০টি আসন রেখে বাকি আসন শরিকদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। যার মধ্যে মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় পার্টির জন্য ৪০ থেকে ৪২টি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। এর বাইরে ওয়ার্কার্স পার্টিকে ৫টি, জাসদ (ইনু) ৩টি, জাসদ (আম্বিয়া) ১টি, তরিকত ফেডারেশন ২টি, জাতীয় পার্টির (জেপি) জন্য ২টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
এবারের নির্বাচন নিয়ে যেহেতু নির্বাচনের পূর্ব থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে তাই জাতীয় পার্টির ভূমিকা ছাড়া নির্বাচনকে প্রাণবন্ত করে তোলা আওয়ামী লীগের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে বলে মনে করেন দলের নেতারা। তবে দলের অনেক নেতাই আছেন, যারা যেকোন মূল্যে আওয়ামী লীগের সখ্যতা বজায় রেখে ক্ষমতায় ভাগ বসাতে চান। তাই জাতীয় পার্টির নীতিনির্ধারকগণ কোন শক্ত শর্তে বা শক্ত অবস্থানেও যেতে পারছে না বলে দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়।
তবে তৃণমূল বিএনপির ব্যর্থতায় এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে কতগুলো আসন ভাগিয়ে আনতে পারেন তাতেই জাতীয় পার্টির সফলতা হিসেবে ভাবা হচ্ছে জানা যায়। বিভিন্ন সময় জাতীয় পার্টি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেও শেষ মুহুর্তে আওয়ামী লীগের সাথে তাদের আসন বন্টন নিয়ে সমঝোতায় এখন জাতীয় পার্টি নিজেদের এই নির্বাচনে তুরুপের তাস হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এস.এ/জেসি


