কিছুদিন আগে টিভিতে একটা নাটক দেখছিলাম। নাম ছিল বাবা আমি মন্ত্রী হবো। আমাদের রাষ্ট্রে হরেক কিসিমের মন্ত্রীর ছড়াছড়ি দেখে অবোধ এক বালকের ও মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ জন্মেছিল। দেশে এখন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা পেশার নানা রঙের মানুষের এমপি হওয়ার খায়েশ দেখে নাটকের নামটি একটু ঘুরিয়ে যদি কোন অবুঝ বালক বলে- বাবা আমি এমপি হবো। তবে এটাকে বাল সূলভ তামাশা বলা যাবে না।
রাজনীতি করার অধিকার, স্বাধীনতা সবার আছে মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার অধিকার আছে। সে অর্থে নির্বাচনে অংশ নেওয়াটাও তার অধিকার রয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্য এ জাতির দেশে রাজনীতি থাকলেও তার মধ্যে নীতি বা আদর্শের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায় না। বাস্তবিক পক্ষে রাজনীতির চর্চা না থাকার কারণে এবং তথা-কথিত রাজনৈতিকদের কারণে যদু মধু ও কদুরাও দেশে আঠারো কোটি মানুষের জন্য নাকি এমপি হতে চায়। প্রশ্ন জাগে সংসদে এমপিদের প্রধান কাজটি কি?
বাস্তবতার নিরীক্ষে জনগণের কল্যাণে আইন প্রণয়ন করা নয় কি? সংসদে যখন সংবিধান বিরোধী কোন কালাকানুন পাস করার চেষ্টা করা হয় তার বিরুদ্ধে যথাযথ ভাবে সোচ্চার হওয়া নয় কি? এ ব্যাপারে তারা কতটা ভূমিকা রাখার যোগ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ সংসদের অবস্থা পর্যালোচনা করে এক অনুষ্ঠানে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলছিলেন রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে।
আমরা জানি আগে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা ছিল মূলত রাজনীতিতে তহবিল সরবরাহ করা। দেশের রাজনীতি এখন প্রকৃত রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হয়ে ক্ষমতার রাজনীতির ময়দানে পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীদের খেলোয়ার হিসাবে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে অতীতের সংসদ গুলোতে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিটা কত ছিল দেখা যাক ১৯৫৪ সালের সংসদে ব্যবসায়ীদের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।
গত ২০ বছরে এই শ্রেণীর অংশীদারিত্ব ছিল ১৩ শতাংশ। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের হার হয়ে দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সংসদে ব্যবসায়ী শ্রেণীর এমপি ছিল ৪৮ শতাংশ ২০০১-২০০৯ সাল পর্যন্ত সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন ৬২ থেকে ৬৩ শতাংশ ব্যবসায়ীরা এখন ক্রমবর্ধমান হারে এমপি হচ্ছেন মন্ত্রীও হচ্ছেন। আবার অনেকে এম পি নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসে রাতারাতি ব্যবসায়ী ও বনে যাচ্ছেন।
অথচ আমাদের প্রতিবেশী বিশাল ভারতের লোক সভা নির্বাচনে নির্বাচিতদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের হার বিশ ২০ শতাংশ মাত্র। পাকিস্তান আমলের সংসদ গুলোতে নির্বাচিত এমপিদের ৭০ শতাংশই ছিল আইনজীবী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, শাহ আজিজুর রহমান সহ, অনেকেই ছিলেন, তুখোর আইনজীবী। এছাড়া যাঁরা সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন- তাদের সবাই ছিলেন সংবিধান ও দেশের আইন কানুন সম্পর্কে বিশেষ ভাবে ওয়াকিবহাল।
তারা ছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। লক্ষ্য করলে দেখা যায়- তাদের প্রত্যেকের জীবনের ৪০/৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবন জেল জুলুমের শিকার হয়। বছরের পর বছর কারাঅন্তর্রালে জীবন কাটিয়ে- রাজনীতিবিদ হয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সাথে দীর্ঘদিন মেলা মেশা তাদের সুখ দুঃখের সাথী হয়েই জনগণের সাচ্চা সেবক হিসেবে নিজেদের জীবন উৎর্গ করেছেন। তাদের জীবন বর্নাঢ্য রাজনীতি ছাড়া কোন বিত্তবৈভব ছিলনা।
শেরে বাংলা একে ফজলুল হক শেষ জীবনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আর্থিক অনটনের মধ্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, গনতন্ত্রের মানস পুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতির কারণেই সূদূর বৈরুতে নিঃস্বঙ্গ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব রাজনীতির কারনেই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কিছুদিন আগে বলেছেন আতি পাতি সিকি সব নেতারা এমপি হতে চায় প্রশ্ন হচ্ছে দলের যেসকল নেতাকর্মী দলের জন্য ফুল টাইম রাজনীতি করে যাচ্ছেন দলে তাদের মূল্যায়ন কিভাবে হবে?
রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদেরকে আর্থিকভাবে সচ্ছলতার অজুহাতে তাদের অবধানকে অস্বীকার করে নবাগত সচ্ছলদের সুযোগ দিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য করে যাবে? আর এই সুযোগে এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী খেলোয়াড় অবসরপ্রাপ্ত আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক, অভিনেতা অভিনেত্রীরা লক্ষণীয়ভাবে এমপি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। এদের একজন তো বলেই বসলেন, রাজনীতির মাঠে আমি একজন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র।রাজনীতির মাঠে যাদের কোন অভিজ্ঞতাই নাই তাদের কেন মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে?
এর অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে অর্থাৎ ফ্লোর ক্রশিং সংক্রান্ত বিধানাবলী। রাজনৈতিক দল গুলো জানে যদু মদু ও কদু বা রাজনীতিবিদ প্রয়োজন নেই। দলের পক্ষ থেকে সংসদে যে বিল বা প্রস্তাব উত্থাপিত হবে তাতে চোঁখ বুঁজে হাত তুলে সমর্থন দিলেই হবে। অন্যথায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী ফ্লোর ক্রসিং এর কারণে তাদের সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে যাবে। এ কারণেই সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলে মৌসুমী পাখিদের কলরব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এরই মধ্যে ডামি বা নকল প্রার্থীর আবির্ভাব ঘটছে। অনেক অভিজাত বিপনি বিতানের সামনে পুরুষ ও নারীর শাট, স্কার্ট, কোট- প্যান্ট পড়া মূর্তি দেখা যায়। এসব ডামি বা নকল মানুষগুলো শুধুমাত্র প্রচারণার অংশ, এদের কোন জবান নেই, নেই কোন নড়ন চড়ন শুধু যেমনি নাচাও তেমনি নাচের দল। একটি দেশ যখন কৃতৃত্ববাদী শাসনের অধীন হয়ে পড়ে, তখন দেশ থেকে গণতন্ত্র বাক স্বাধীনতা মানবাধিকার আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার বিলুপ্তি ঘটে।
কৃতিত্ববাদীদের দোসর হয়ে যায় দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও কতিপয়, গৃহপালিত দল, বুদ্ধিজীবীও সাংবাদিক তারা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার কে পাশ কাটিয়ে কর্তৃত্ববাদীদের ঐতিহাসিক মিথ্যাচারকে গোয়েবলসী কায়দায় মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালায়। এমতাবস্থায় ক্ষমতা লোভী কিছু মানুষের নিলজ্জ তৎপরতা দেখে মরহুম কবি আহমদ রফিক এর একটি ব্যাঙ্গাত্বক কবিতার কয়েকটি চরন মনে পড়ছে- সব শালা কবি হবে/পিঁপড়ে গোঁ ধরছে উড়বেই/দাঁতাল শুয়োর এসে রাজসনে বসবেই। লেখক আইনজীবী/ সাংবাদিক....এস.এ/জেসি


