Logo
Logo
×

রাজনীতি

নতুন বোতলে পুরনো আশ্বাস

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:০১ পিএম

নতুন বোতলে পুরনো আশ্বাস
Swapno

 

# শান্তির চর, লাঙ্গলবন্দ ও নবীগঞ্জ সেতুর কাজ না হওয়া পর্যন্ত আমি অপরাধী থাকবো : সেলিম ওসমান

 

 

প্রার্থী হলেই শীতলক্ষ্যা সেতু তৈরির প্রতিজ্ঞা করেন আর প্রতিনিধি হলেই তা হজম করে ফেলেন, কথাগুলো বলছিলেন। নবীগঞ্জ ফেরিঘাটে ফেরি ছাড়ার অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন যাত্রী নিজেদের মধ্যে সেতুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনাকালে বন্দরের এক বাসিন্দা ক্ষোভের সাথেই এই কথাগুলো বলেন। এ সময় পাশে থাকা আরেকজন বলেন, ‘এইখানে দিয়ে সেতু দেখার সৌভাগ্য আমাদের হবে না’। অন্য আরেকজন বলে ওঠে, ‘আমরা কিরে ভাই, আমাদের ছেলেপুলে দেখে যেতে পারবে কি না সেইটা বল’।

 

এভাবে বন্দরের সাথে নারায়ণগঞ্জ শহরবাসীর মধ্যকার সেতুবন্ধনের জন্য এই হাজীগঞ্জ কিংবা চারারগোপ এলাকা দিয়ে শীতলক্ষ্যা সেতুর উপর সেতু নির্মাণের দীর্ঘদিনের হাহাকারে মনের মাঝে জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন তারা। আর এই আলোচনা মূলত আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য পদ প্রার্থী একেএম সেলিম ওসমানের নির্বাচনী সভায় এবারও সেই শীতলক্ষ্যা সেতুর আশ্বাস নিয়ে ছিল।

 

আর এই নবীগঞ্জ কিংবা একরামপুর এলাকা দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর সেতুর আশ্বাস এখন বন্দরবাসীর মধ্যে শুধু হতাশার সৃষ্টি করে বলে মন্তব্য করেন এই আলাপে অংশ নেওয়া ফেরি যাত্রীরা।

 

এর আগে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের চারবারের এমপি (সাবেক) একেএম নাসিম ওসমানও (প্রয়াত) বন্দরবাসীকে এই স্বপ্ন দেখিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়। কিন্তু তার জীবদ্দশায় তা নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তবে নাসিম ওসমানের উদ্যোগে পদ্মা সেতুর সাথে সংযোগের মাধ্যমে দেশের আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বন্দর ও শহরের শেষ প্রান্তের মুন্সীগঞ্জ সীমানায় তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

 

এরপর বিএনপির নির্বাচিত তিনবারের সাংসদ (সাবেক) এডভোকেট আবুল কালামও বন্দরবাসীকের শীতলক্ষ্যা সেতুর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু সর্বশেষ ক্ষমতাকালীন এই উদ্দেশ্যে হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ এলাকায় সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ভিত্তি প্রস্তরও স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আর ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেননি।

 

বিএনপির দাবি তারা ক্ষমতায় থাকলে এতদিনে এই সেতু নির্মাণ হয়ে যেত বলে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নাসিকের বেশ কয়েকটি নির্বাচনের পূর্বেই এই সেতু তৈরি করার অঙ্গীকার করেন বলে জানান বন্দরবাসী। কিন্তু আজও পর্যন্ত সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। যদিও এই সেতু নির্মাণে বিভিন্ন প্রতিকুলতার কথা তুলে ধরেন মেয়র আইভী।

 

সর্বশেষ এই আসনের বর্তমান সাংসদ এবং আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙ্গলের প্রার্থী একেএম সেলিম ওসমান এবারও বন্দর ও শহরবাসীর মধ্যকার দূরত্ব দূর করার জন্য নবীগঞ্জ এলাকা দিয়ে বন্দরবাসীর সেই কাঙ্ক্ষিত শীতলক্ষ্যা সেতু তৈরির অঙ্গীকার করছেন। অবশ্য সেলিম ওসমান এর আগেকার নির্বাচনগুলোর পূর্বেও এমন অঙ্গীকার করেছিলেন বলে বন্দরবাসী জানান।

 

এই বছরের মাঝামাঝি সময় যখন নির্বাচন নিয়ে সবার (বিশেষ করে যারা প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তাদের) মধ্যেই এক ধরণের উত্তেজনাসহ এই আসনে নির্বাচনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্ধিগ্ন ছিলেন তখনও সেলিম ওসমান এবারের নির্বাচনের তাকে মনোনীত করলে এবং নির্বাচিত হতে পারলে তিনি নবীগঞ্জ দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর বন্দরবাসীর সেই কাঙ্ক্ষিত সেতু নির্মাণ করবেন বলে জানান।

 

করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তার নির্বাচনী এলাকা বন্দরে উন্নয়নের অনেক কাজ পিছিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর আরেকটি সেতু নির্মাণ হবে। তিনি পুনরায় নির্বাচিত হলে নবীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর নতুন সেতু নির্মাণসহ তার অসম্পূর্ণ কাজগুলো দ্রুত শেষ করবেন বলেও জানান তিনি।

 

সম্প্রতি বন্দর সমরক্ষেত্রে অনুুষ্ঠিত তার নির্বাচনী জনসমাবেশে সেলিম ওসমান বলেন, ‘আমার কাজিম উদ্দিন ভাই বলে আমি নাকি ৮০ পার্সেন্ট কাজ করে ফেলেছি। আরে ভাই মিছে কথা। আবার সেদিন রশিদ ভাই বলেন, ৮০ পার্সেন্ট না, কাজিম উদ্দিন ভুল বলেছে, ৯৫ পার্সেন্ট কাজ করে ফেলেছেন। এগুলো মিছে কথা, আমি আসলে ২০ পার্সেন্ট কাজও করতে পারিনি। ৮০ ভাগ কাজ এখনও বাকি আছে।

 

যতক্ষণ পর্যন্ত এই শান্তির চর ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা না হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত লাঙ্গলবন্দ সম্পূর্ণ না হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত নবীগঞ্জ ব্রিজ না হবে ততক্ষণ আমি আপনাদের কাছে অপরাধী থাকবো। আপনারা আমাকে দোয়া করে হায়াত দান করেছেন। এই কাজগুলো করতে পারিনি, সেই কথাটা আমি আপাকে (প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনাকে) বলেছিলাম। আপা আমাকে বলেছিল কেন পারনি। আমি বলেছি ‘করোনার জন্য আপনি টাকা পয়সা বন্ধ করে দিলেন, তাই পারিনি’।

 

আমার এখানে হাজার হাজার কোটি টাকার সেনশন করেও এগুলো বন্ধ হয়ে রইল। সবকিছু পাস করা আছে। আপনাদের দোয়া ও আল্লাহর ইচ্ছা। আমি যদি জীবিত থাকি, তাহলে আপার পায়ে ধরে হলেও আমি যে তিনটি কাজের কথা বলেছি এই তিনটি কাজ আমাকে করতেই হবে।

 

তবে এই সেতু নিয়ে কারও ওয়াদা কিংবা অঙ্গীকার আর পছন্দ হচ্ছে না বন্দরবাসীর। তাদের মতে যেদিন এই সেতুর নির্মাণ কাজ ধরা হবে সেদিনই বিশ্বাস হবে যে এখানে সেতু হবে। এর আগে না। নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়া ঘাট দিয়ে পারাপার করার সময় সত্তরোর্ধ্ব যাত্রী হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সেই ছোটকাল থেকেই এখান দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার হচ্ছি।

 

আমাদের তো আর দেখার কেউ নাই। আমাদের যত সমস্যাই হোক না কেন, এই নদীর কাছে আমরা বাধা। এর কাছ থেকে উদ্ধার করার জন্য একমাত্র আল্লাহই আমাদের ভরসা। আর কাউকে ভরসা করতে পারি না। এখান থেকে অনেক কম মানুষ যেসব এলাকা দিয়ে পারাপার হয় সেখানেও সেতু তৈরি হয়, অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেখানে দৈনিক কয়েক লক্ষ মানুষ পারাপার হয়, সেখানে কেন সেতু হয় না, তা বোধগম্য হয় না।

 

তার মতে শুধুমাত্র নবীগঞ্জ থেকে এই বন্দর ঘাট এলাকার কয়েকটি ঘাট দিয়েই দৈনিক প্রায় তিন থেকে চার লাখের মতো লোকজন পারাপার হয়। এর মধ্যে ঝড়-ঝঞ্জাসহ বিভিন্ন দুঃসময়ে কত বন্দরবাসীকে যে খেসারত দিতে হয় তা এসব নেতারা বুঝবে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, মুখে মুখে সবাই বন্দরবাসীকে ভালোবাসে, তারপরও তারা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন যে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না তা-ই বুঝতে অসুবিধা হয়। এস.এ/জেসি 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন