Logo
Logo
×

রাজনীতি

নিশ্চিত বিজয়েও জাল ভোট কলঙ্ক

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:১৯ পিএম

নিশ্চিত বিজয়েও জাল ভোট কলঙ্ক
Swapno

 

# জাল ভোটের দায়ে শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকায় নৌকার দুই কর্মীর কারাদণ্ড
# তারা সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে পাশ করে : এড. সাখাওয়াত হোসেন

 

 

সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভোট গ্রহণ নিয়ে চলছে নানা রূপে বিশ্লেষণ। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ভোট গ্রহন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরী হয়েছে। তাছাড়া সারাদেশে যাকে এক নামে চিনেন  সেই শামীম ওসমান এই আসন থেকে নির্বাচন করে এমপি হয়েছেন। যার ডাকে লক্ষাধিক মানুষ জড়ো হতে এক ঘন্টা সময় লাগে না। এই কথা তিনি নিজেই বিভিন্ন সভা সমাবেশে বলে বেড়ান। নানা বিষয়ে তিনি আলোচনায় থাকেন।

 

কিন্তু এবারের নির্বাচনে এক ভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন সদ্য নির্বাচিত টানা তৃতীয়বারের এমপি শামীম ওসমান। এবার নির্বাচনের আগেই বিএনপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকায় অনেকটা বিজয়ের পথে নিশ্চিত ছিলেন শামীম ওসমান। কিন্তু এরপরেও জাল ভোটের মতো কলঙ্কিত অধ্যায়ের কারণে শামীম ওসমানের সহজ জয়টিও কলঙ্কিত হয়েছে।

 

নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী শামীম ওসমান ২৩১টি কেন্দ্রে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাকের পার্টির মুরাদ হোসেন জামাল গোলাপ ফুল প্রতীকে পেয়েছেন ৭ হাজার ২৬৯  ভোট। কিন্তু সহজ জয়ের দিনেও শামীম ওসমান সমালোচিত হন তার নির্বাচনী এলকায় তার দুই কর্মীর জাল ভোট দেয়ার সময় হাতেনাতে ধরা খাওয়া ও শাস্তির আওতায় পড়া।

 

জানা যায়, সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত নির্বাচিত এমপি শামীম ওসমানের দুইকর্মীকে জাল ভোট দেয়ার অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারিক আদালত। একই সাথে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

 

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহনের দিন রোববার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ফতুল্লা দেলপাড়া উচ্চবিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে জাল ভোট প্রদানের সময় দুজনকে নির্বাচনী মামলায় নারায়ণগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান বিথীর আদালত এই কারাদণ্ড দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পাগলা দেলপাড়া এলাকার মো. ইস্রাফিল এবং পূর্ব দেলপাড়া এলাকার জামাল হোসেন। স্থানীয়রা জানান, তারা নৌকার প্রার্থী সাংসদ শামীম ওসমানের কর্মী।

 

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ৭৪ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি একই ভোটকেন্দ্রে একাধিকবার ভোট প্রদান করেন বা ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট চান, তাহলে ওই ব্যক্তি বেআইনী কার্যের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন। এই অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক সাত বছর এবং অনুন্য দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে।

 

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সদ্য নির্বাচিত নৌকার মার্কার জয়ী এমপি শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকায় জাল ভোটের ঘটনা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ছাড়িয়ে সারাদেশে সমালোচনা তৈরী হয়েছে। কেননা এই আসনে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তায় রয়েছে। সেই সাথে টানা ১০ বছর যাবৎ এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তবে সদ্য অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে যারা প্রার্থী ছিলেন তারা কেউই এমপি শামীম ওসমানের সমকক্ষ নন। এমনকি নির্বাচনের মাঠে নৌকার বিপক্ষে থাকা কোন প্রার্থীকে প্রচারণা করতে দেখা যায় নাই।

 

তাছাড়া বেশির ভাগ ভোট কেন্দ্রে শামীম ওসমানের নৌকা ছাড়া অন্য প্রার্থীদের এজেন্ট দেখা যায় নাই। শামীম ওসমানের প্রতিদ্বন্দিদের প্রচার প্রচারনা করতে দেখা যায় নাই। দুয়েক একজন প্রচারণা করতে গেলেও তাদের উপর হামলা হয়েছে। অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পান নাই। তাছাড়া যারা আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী সদ্য নির্বাচিত শামীম ওসমানের বিপক্ষে প্রার্থী ছিলেন তারা কেউই ব্যক্তি কিংবা দলীয় হিসেবে পরিচিত নন। তাদের কোন এলাকায় প্রভাবও নেই।

 

এমপি শামীম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন, জাকের পার্টি থেকে মুরাদ হোসেন জামাল গোলাপ ফুল, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে মো. হাবিবুর রহমান চেয়ার, তৃণমূল বিএনপি থেকে আলী হোসেন সোনালি আঁশ, সুপ্রিম পার্টি থেকে মো. সেলিম আহমেদ একতারা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শহীদ উন নবী আম, বাংলাদেশ কংগ্রেস থেকে গোলাম মুর্শেদ রনি ডাব, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে মো. ছৈয়দ হোসেন মশাল প্রতীক প্রচারনায় থেকেও কাগজে কলমে তারা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন। তারা শামীম ওসমানের সাথে লড়াই করার মত প্রার্থী নন।

 

অপরদিকে টানা তিনবারের এমপি হওয়ার জন্য শামীম ওসমানের জাল ভোটের প্রয়োজন হলে কেন তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাহলে বিগত এত বছরের জনপ্রিয়তা কি ছিল। এছাড়া যেখানে নৌকার বিপক্ষে শক্তিশালী প্রার্থী ছিল না সেখানে শামীম ওসমানের কর্মীরা কেন জাল ভোট দিতে গিয়ে দুই বছরের কারাদন্ডিত হলেন।

 

জানা যায়, নির্বাচনে ভোট গ্রহনের পরে ৭ জানুয়ারি রাইফেল ক্লাবে সাংবাদিক সাথে ব্রিফিং কালে এই ঘটনার প্রসঙ্গে এমপি শামীম ওসমান বলেন, পোশাকধারি কিছু লোক আমাদের কাছে অনৈতিক ডিমান্ড করেছে। জুডিশিয়াল ডিপার্টমেন্টের দুয়েকজন এসাইনমেন্ট নিয়ে আমার এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি করে দেয়া। আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করেছি। তারা স্বাধীনতা বিরোধী পরিবার থেকে আসা শক্তি। তারা প্রশাসনে যেহেতু আছে যে কোন জায়গায় চাকরী করতে পারবে।

 

আমার সিনিয়র নেতাদের সাথে এক মহিলা এবং আরেকজন এমন আচরণ করেছে যদি সামরিক শাসন অবস্থায় থাকতো তাহলেও ওই এলাকায় বিষ্ফোরণ ঘটে যেত। তারা তো একদিন নির্বাচনের কমিশনের আন্ডারে এরপর থেকে তারা সরকারের আন্ডারের থাকবে। সেখানে কি হয়েছিল কেন হয়েছিল তা বের করে, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা আমাদের উচিত হবে। কেননা তারা যে কোন সরকারের সময় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য হুমকি স্বরূপ।

 

তারা একটি দলের কিংবা একটি গুষ্টির হয়ে কাজ করেছে। যদিও আমি আগেই টের পেয়েছিলাম উস্কানি দেয়া হবে। নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ছিলেন বিধায় তারা সবাই চুপ ছিলেন। আমরা ধৈর্য্যের সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়েছি। তবে শামীম ওসমান কোন ঘটনায় এই কথা বলেছেন তা তিনি পরিষ্কার না করলেও তা এখন বুঝতে কারো বাকি নাই। সেই সাথে তিনি যেই জুডিশিয়াল বিভাগ বলেছেন তা বিচার বিভাগকে বুঝানো হয়েছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে, টানা তিনবারের এমপি নির্বাচিত শামীম ওসমানের এলাকায় জাল ভোট দেয়ার অপরাধে তার দুই কর্মী কারাদন্ডিত হয়েছে যা খুবই নেতিবাচক হিসেবে প্রভাব ফেলেছে রাজনীতিতে। এই পর্যন্ত কোন নির্বাচনে এই ধরনের ঘটনায় পরেন নাই এই জনপ্রতিনিধি। তিনি এই নেগেটিভ প্রভাবকে কাটিয়ে রাজনীতিতে কতটুকু এগিয়ে যেতে পারবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকায় জাল ভোট দেয়ার সময় দুই কর্মীর কারাদণ্ড দেয়া প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই এই প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করেছি। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের লোকজন ছিলেন। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমানের সাথে কোন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। তারপরেও তার নির্বাচনী এলাকায় তাদের দলের দুই কর্মীকে জাল ভোট দেয়ার অপরাধে দুই বছরের কারাদন্ড দিয়েছে।

 

তারা বিভিন্ন অসৎ উপায়ে জাল ভোট, মৃত ব্যক্তির ভোট দিয়ে তারা নির্বাচিত হয়ে আসছে। তিনি যে বিভিন্ন সময় অন্য দলের মানুষকে নসীহত করে তার আগে তার দলের নেতা কর্মীদের নসীহত করা উচিৎ ছিল। তার দলের নেতাকর্মীদের জাল ভোট থেকে বের হয়ে আসার দরকার ছিল। আমরা এই নিবার্চনকে ধিক্কার জানাই। এটা ছিল এই সরকারের এক তরফা নির্বাচন। তারা সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরেছে। যার প্রমাণ সাংসদ শামীম ওসমানের এলাকায় তার দুই কর্মী জাল ভোটে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদন্ডিত হয়েছেন। আমরা ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করে তত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচনের দাবী জানাই। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন