সোনারগাঁয়ের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে হঠাৎ আচমকা একেবারেই অপরিচিত মুখে হিসেবে উত্থান ঘটে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সদ্য পরাজিত জাতীয় পার্টির সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকার। টানা দুবার একপ্রকার ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সংসদ নির্বাচিত হন। তবে টানা দুবার সংসদ থেকেও স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি এবং ভোটের রাজনীতিতেও ছিলেন নিষ্ক্রিয়।
যার কারণে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে একজন টানা দুবাবের সাংসদের প্রাপ্য ভোটেরও দ্বার প্রান্তেও যেতে পারেননি তিনি এতে করে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে নীরবে নিভৃতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের রাজনৈতিক মাঠ ছাড়তে হচ্ছে তাকে। মূলত, দুবারের সাংসদ থেকে জনপ্রতিনিধিদের কাঁধে চড়ে রাজনীতি করেই তার আগামী রাজনীতিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সংসদ নির্বাচিত হন লিয়াকত হোসেন খোকা। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ভোটের লড়াইয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন খোকা। কারণ টানা দু’বারের সংসদ নির্বাচনেই আওয়ামীলীগ ছাড় দেন লিয়াকত হোসেন খোকাকে। তবে টানা দুবার আওয়ামী লীগের ছাড়ে সংসদ হয়েও আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষুই হয়েছেন।
কারণ দশম সংসদ নির্বাচনে সাংসদ হওয়ার পরই সোনারগাঁয়ের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে জনপ্রতিনিধি ঐক্য ফোরাম গঠন করে সোনারগাঁয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন খোকা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও গুটি কয়েক আওয়ামী লীগ নেতাকে নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্তি সৃষ্টি করেন। তাছাড়া বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে সোনারগাঁ আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিক ভাবে দূর্বল করার মিশনে নেমেছিলেন।
যার কারণে দ্বিধা বিভক্তে ভরপুর থাকতো সোনারগাঁ আওয়ামীলীগ সে সুযোগে তিনি বরাবরই তার রাস্তা ফাঁকা রাখতেন। যার ফলশ্রুতিতে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও মহাজোটের প্রার্থী হন আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী দেয়া হয়নি উক্ত আসনে। যার কারণে খালি মাঠে বিশাল ভোট নিয়ে সহজ জয় অর্জন করেন।
কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি সাংসদ হওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও বঞ্চিত করার অভিযোগ করতে থাকেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।সোনারগাঁয়ের হেফাজত নেতা মামুনুল হকের রয়েল রিসোর্ট কান্ডের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয় এবং আওয়ামী লীগের কার্যালয়ও।
অভিযোগ উঠে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এই হামলায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে মামলায় আসামি করা হয় জাতীয় পার্টির ইউপি চেয়ারম্যান ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। মামলার কারণে বেশকয়েকদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন খোকা। পরবর্তীতে মামলার রেশ কাটিয়ে ফের সোনারগাঁয়ে রাজনীতি প্রবেশ করেই জাতীয় পার্টির সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন ইউনিয়ন ওয়ার্ড কমিটি করেন স্থানীয় বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান মেম্বার ও আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের জাতীয় পার্টিকে যোগদান করিয়ে।
পরবর্তীতে আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে মহাজোট নিয়ে নানা রকম জল্পনা কল্পনা শুরু হলে লিয়াকত হোসেন খোকা বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান মেম্বার কাউন্সিলরদের দ্বারা গঠিত জাতীয় পার্টির সংগঠন নিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তফসিল ঘোষণার পর জোটগত ভাবে নির্বাচন না হওয়ার পরিস্থিতি হওয়ায় আওয়ামীলীগ থেকে সাবেক সাংসদ কায়সার হাসনাতে নৌকা প্রতীকে মনোনীত করেন এবং জাতীয় পার্টি থেকে লিয়াকত হোসেন খোকা লাঙ্গল প্রতীকে মনোনীত হন।
যার কারণে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে নৌকা প্রতীকে মনোনীত প্রার্থী কায়সার হাসনাতের সাথে লাঙ্গল প্রতীকে মনোনীত প্রার্থী লিয়াকত হোসেন খোকার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার শঙ্কা তৈরী হয়। যার ফলে প্রচার প্রচারণা থেকেই একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নানা ভাবে প্রতিয়মান হতে থাকে।
তবে ভোটের মাঠ থেকে লাঙ্গল প্রতীকে মনোনীত প্রার্থী লিয়াকত হোসেন খোকা বরাবরই বার্তা দিচ্ছিলেন জনগণের ব্যাপক সারা রয়েছে তার পক্ষে পাশাপাশি তার কর্মীরাও বার্তা দিচ্ছিলেন আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনে ভোটের মাঠে ঘটেছে বিপত্তি।
সোনারগাঁয়ের ১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে লিয়াকত হোসেন খোকা লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৮১১ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নৌকা মার্কা নিয়ে আব্দুল্লাহ আল কায়সার ১ লাখ ১২ হাজার ৮০৮ ভোট পান প্রায় ৭৭ হাজার ভোটে পরাজয় বরণ খোকা। তবে এই পরাজয়ের পিছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ রয়েছে লিয়াকত হোসেন খোকার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান মেম্বার কাউন্সিলরদের দ্বারা নির্বাচনী বৈতরনী পার করতে চেয়েছিলেন।
তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা সংঘবদ্ধ হয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করার কারণে এ সকল জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে খোকার ভোট প্রার্থনায় সাড়া মিলেনি। তাছাড়া এ সকল জনপ্রতিনিধিরাও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের ক্ষোভের বহিঃবিকাশ ঘটানোর পূর্বেই একের পর এক খোকার সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন। যার কারণে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে খোকার শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয়। এস.এ/জেসি


