ডিসি-এসপিকে বশে আনতে চান শামীম ওসমান
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪৪ পিএম
# হুমকি-ধামকি দিয়ে কী বড় কিছু ঢাকতে চাচ্ছেন তিনি
অতীতের পুরনো অস্ত্রগুলো এখন আর কাজে আসছে না ওসমান পরিবারের। চাপে ফেলে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে এনে নানাবিধ কাজ করিয়ে নেয়া আর আজ্ঞাবহ করে সুবিধা আদায়ের সেই পুরনো কৌশল এখন ফ্লপ করেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক এবং পুলিশ সুপার ডা. মো. গোলাম মোস্তফা রাসেলের দৃঢ়তার দরুণ বিষয়টি মোটা দাগে ধরা পড়েছে। সর্বশেষ শনিবার (২৭ জানুয়ারি) শামীম ওসমানের ডাকে সাড়া না দেওয়া এবং জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপর শামীম ওসমানের সকল রাগ ক্ষোভ উগড়ে দেয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
তবে সূত্র বলছে, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সার্ভেয়ার ৪২ লাখ টাকা নিয়ে দুদকের হাতে ধরা পড়ার ঘটনাটি একটি অংশ বিশেষ। পঞ্চবটি-মুন্সিগঞ্জ ফ্লাইওভার কাজের ভূমি অধিগ্রহণ সেক্টরে ভূমিদস্যু ও সুবিধাভোগীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যে সাগর চুরির মতো দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে তা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় এবং শেষাংশে জেলা প্রশাসক তাদের কথায় সায় না দেওয়াতেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ওই চক্রটি। যদিও এই অধিগ্রহণ প্রকল্পের অধিকাংশ টাকাই ইতিমধ্যে উত্তোলণ করে নেয়া হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়ার সময় থেকে এই অধিগ্রহণ কাজ শুরু হলেও নতুন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হকের সময় এসে নয়-ছয়ের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলেন, নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নতুনভাবে পদায়ন হলেই ‘বাসর রাতে বেড়াল মারা’ পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন ওসমানরা। এই পদ্ধতিতে নতুন ডিসি কিংবা এসপি পদায়ন হলেই নানা উপলক্ষ্য টেনে লাখখানেক মানুষের একটি সমাবেশ আয়োজন করা হয়। আর আয়োজনে প্রশাসনকে টার্গেট করে বক্তব্য দেয়া হয়। নতুন কর্তাব্যক্তিদের দেখানোর চেষ্টা হয়, এই জেলায় তারাই সব, তারা ছাড়া কিছুই হয় না।
এই নীতিতে অনেক প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাই ঘাবড়ে যান, অথবা বশ্যতা স্বীকার করে নেন। আর তাদের ম্যানেজ করতে শুরুতেই জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খালেদ হায়দার কাজল ও কয়েকজন ওসমান অনুসারী ব্যবসায়ীক নেতা ভিড় করেন। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নানা বিষয়ে খবর নিয়ে তাদের বশ্যতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এতেও কাজ না হলে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নানাজনকে দিয়ে প্রলোভনসহ চাপে ফেলার চেষ্টা করেন।
তাতে যদি একবার কাজ হয়, তাহলে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নানাভাবে ব্যক্তিগত বিষয় আতস্থ করে পরবর্তীতে চাপে ফেলে নানাবিধ উদ্দেশ্য হাসিল করেন। তবে সবসময় যে তা কাজে আসে এমনটি নয়, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে রাব্বী মিয়ার আগমনের আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে প্রশাসনের ধার ও ভার দুই ই ছিল। ডিসি রাব্বী মিয়ার সময় প্রশাসনকে একিভূত করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চর্চা পুরোপুরি শুরু করেন। ওই সময় থেকেই পঞ্চবটি-মুক্তারপুর ফ্লাইওভারের জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়। আর সুবোধ বালকের মতোই মিলেমিশে লুটেপুটে খাওয়ার ট্রেন্ড শুরু হয়।
তবে ‘বাসর রাতের বিড়াল মারা’ পদ্ধতি ভেঙে দেন পুলিশ সুপার হিসেবে নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব নেয়া বর্তমান ডিবি প্রধান হারুন রশীদের সময়। তিনি তাদের বশ্যতা স্বীকার তো করেননি। উল্টো ওসমানদের অন্যায় কাজের সহযোগী চাঁদাবাজ, মাদকব্যবসায়ী, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে তখন দল বেধে ওসমানদের কুকর্মের সেনানীরা গা ঢা দেন, পালিয়ে যান দেশের অন্যত্র, কেউ কেউ দেশের বাইরে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ তখন স্বস্তির নিঃশাস ফেলেন।
নারায়ণগঞ্জবাসীও এসপি হারুনের সাহসী ও মেরুদন্ড সোজা রাখার পুরস্কার স্বরূপ তাকে হিন্দি মুভির পুলিশ অফিসার নায়ক ‘সিংহাম’ উপাধি দেন। তৎকালীন সময়ে জেলা প্রশাসক হিসেবে থাকা মো. জসিম উদ্দিন প্রথম দিকে শক্ত ভূমিকা নিলেও এসপি হারুনের নারায়ণগঞ্জ ছাড়ার পর তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এরপর জেলা প্রশাসক হিসেবে মোস্তাইন বিল্লাহ, মঞ্জুরুল হাফিজ জেলা প্রশাসক হিসেবে থাকলেও তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি।
এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বারবার প্রকাশ্যে নানা বক্তব্যে বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জে এসেই ওসমানদের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। তারা নারায়ণগঞ্জবাসীর সেবার জন্য কাজ করতে পারেন না। তারা একটি পক্ষের হয়ে কাজ করেন। এসপি হারুনের পর অনেকদিন বিরতি দিয়ে আবারো জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ ও পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল প্রমাণ করেছেন সবাই বশ্যতা স্বীকার করে না এখনো জনগণের কল্যাণে কাজ করেন এবং সরকারের বিশ্বস্ত প্রশাসক হিসেবে মানুষকে সেবা দিতেই কাজ করেন এমন কর্মকর্তাও বিদ্যমান। জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক ও পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা সেই আশা জাগানিয়া ভরসাই মানুষকে দিয়েছেন।
সূত্র জানিয়েছে, ওসমানদের বশ্যতা স্বীকার না করায় ইতিমধ্যে এই দুই কর্মকর্তাকে বদলির চেষ্টা করেছে ভূমি অধিগ্রহণের সাগর চুরির মতো সরকারি অর্থ লোপাটের হোতারা। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন এক প্রভাবশালী নেতার প্রভাবশালী শ্যালক, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের এক প্রভাবশালী নেতা, তার ভাইসহ একটি বড় ও শক্তিশালী লুটেরা সিন্ডিকেট। তারা জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হককে ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, পরবর্তীতে তাকে ও পুলিশ সুপারকে চাপে ফেলতে ‘বাসর রাতে বিড়াল মারা’ পদ্ধতিও প্রয়োগ করেছেন, সাথে বদলিরও আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, করছেন তবে তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে সৎ ও দায়িত্ববান কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক ও পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল গুডবুকে থাকায় ওসমানদের পুরনো কৌশল ভোতা হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি এই দুই কর্মকর্তা যে নারায়ণগঞ্জের জনগণকে উত্তম সেবা প্রদান করতেই এসেছেন তা নারায়ণগঞ্জবাসী বুঝতে পেরেছে। মানুষ সরকারের নীতিনির্ধারদের কাছে এই দুই কর্মকর্তা যাতে নির্বিঘ্নে ও কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হয়ে কাজ করতে পারেন নতুন সরকারের কাছে মানুষের এই প্রত্যাশা।
তাছাড়া এই কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই যাতে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর ফ্লাইওভার প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যে বিশাল অর্থ লোপাট হয়েছে তা পুরোপুরি তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে সিন্ডিকেটের মুখোশ খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহল। শনিবার সমাবেশের নামে যেভাবে প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান ধমকিয়েছেন তা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বিঘ্নে কাজে বাধা দেয়ার শামিল।
শামীম ওসমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘রাত বারোটার সময়ও সাড়ে চার, পাঁচ লাখ লোক নামানোর ক্ষমতা শামীম ওসমান রাখে। তা আমরা দেখিয়েছি কয়েকদিন আগে। (লোকজন রাস্তায়) নামার পর যদি আমরা বলি, জনগণ যদি বলে, আমরা কাউকে এখানে চাই না, তাহলে কিন্তু এইখানে থাকার কারও উপায় নাই। এই কথাও মাথায় রাখবেন কিন্তু। আগের মেজাজ থাকলে এখনই বলে দিতাম। এখন বয়স হয়েছে ৬২, তাই ৬২ হিসেবে বক্তব্য দিলাম, ২৬ বানাইয়া দিয়েন না কিন্তু। সাবধান থাকবেন সবাই।’
এই সময় তিনি বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবন প্রায় ৪৫ বছর হতে চললো। আমি কখনও এমন বিব্রতবোধ কখনও করি নাই। বিশেষ করে সাংবাদিক সমাজ, আইনজীবী, আওয়ামী লীগের সবাই মিলে আমার কাছে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। আমি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই বিষয়টা (সমাবেশের ব্যাপারে) জানিয়েছি বহু আগেই। আমি আমার ছোটবোন মেয়রের মতো করে বলতে পারবো না যে, এখানে প্রশাসন টাকা কামাতে আসে। আমি এইভাবে কথাটা বলতে চাই না।
‘কিন্তু আপনারা প্রশ্ন করেছেন, আমি জেলা প্রশাসককে বলেছি কিনা, আমি একবার বলি নাই, বারবার বলেছি। আপনারা জেনে অবাক হবেন, কেবিনেট সেক্রেটারি, প্রধানমন্ত্রীর সচিব, খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীগণ আমাকে এই উদ্যোগের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছেন। সেই কারণে, ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সিতে একটা সংসদ সদস্য কোন জায়গায় থাকে এইটা হয়তো নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনের অনেকেই বুঝতে পারেন নাই’, যোগ করেন তিনি।
শামীম ওসমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে যারা আছেন, তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমার নাম শামীম ওসমান। আমি কারও দয়ায় চলি না কিন্তু। আমি কারও দয়া-দাক্ষিণ্যে চলার মতো লোক না। আমি রাজপথ থেকে সৃষ্টি হওয়া মানুষ আমি রাজপথেই শেষ হবো।’ সমাবেশে উপস্থিত না থাকার ব্যাপারটি সংসদে উপস্থাপন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইবেন বলে জানান এই সংসদ সদস্য। একই প্রশ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জনপ্রশাসন মন্ত্রীর কাছে রাখবেন বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনে যারা একজনকেও এইখানে আসতে দেন নাই বা আসেন নাই কেন, এই প্রশ্ন যদি এইখানে করি তাহলে ভাববেন নারায়ণগঞ্জে করেছি। আমি শামীম ওসমান সম্বন্ধে ধারণা আপনাদের অনেক কম। পার্লামেন্টের অধিবেশনে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করবো, যারা জনগণের সেবক হিসেবে, জনগণের চাকরি করে এই নারায়ণগঞ্জে এসেছেন, তারা আজকে অনুপস্থিত কেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মাথা নোয়াবার মানুষ আমি না। এমন কোন কাজ করি না যে, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবো। অনেকেই অনেক কিছু করেন, আমরা সব দেখি। টাকা ধরা পড়ে যাত্রাবাড়িতে আর কেস দেখান ফতুল্লাতে। আমাদের কাছে অনেক খবরই আছে, সাংবাদিকরা আমাদের জানান কিন্তু।’ তবে এসব উত্তপ্ত বক্তব্যে প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা বশ্যতা যে স্বীকার করবেন না তা ইতিমধ্যেই তারা প্রমাণ করেছেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন সার্ভেয়ার ৪২লাখ টাকা নিয়ে দুদকের হাতে ধরা পড়েছেন তাতে এতো বেশি প্রতিক্রিয়া কেন দেখাচ্ছেন শামীম ওসমান। অনেকে বলছেন, পঞ্চবটি-মুক্তারপুর ফ্লাইওভার প্রজেক্টের জমি অধিগ্রহণের যে অনিয়ম ও দুর্নীতি তাতে প্রভাবশালী এমপির প্রভাবশালী শ্যালক, জনৈক রানা, জনৈক চেম্বার অব কমার্সের নেতাসহ যারা জড়িত তারা সকলেই শামীম ওসমানের অনুগত বলে জানা গেছে। এস.এ/জেসি


