# আনোয়ারের ছবিতে কালি দিয়ে ক্রস চিহ্ন
নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটিগুলো নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজন প্রীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন পদবঞ্চিত নেতা কর্মীরা। একই সাথে মহানগর আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতা অর্থের ফায়দা নিয়ে যোগ্যদের স্থানে অযোগ্যদের নাম ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ তুলেন স্থানীয় একাধিক নেতৃবৃন্দ।
দলীয় সুত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক এড. খোকন সাহার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। মহানগর কমিটি নিয়ে নেতা কর্মীদের বিতর্কের মাঝে এবার মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে বলে জানান একাধিক নেতৃবৃন্দ।
এদিকে দলীয় সুত্রমতে জানা যায়, গতকাল ১৬ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় অবস্থিত জেলা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় অবস্থিত। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের ১৭ টি ওয়ার্ডের কমিটি ঘোষনার পরে গতকাল ক্ষুব্ধ হয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন দলটির ওয়ার্ডের পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা। একইসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন বলে তারা জানান।
এ সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম আরাফাতের ভাই ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ সাগরের নেতৃত্বে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা সন্ধ্যা ৭টার দিকে মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় দ্বিতীয় তলায় তালা লাগিয়ে দেন। একই সাথে বাহিরে টানানো থাকা আনোয়ারের ছবিতে কালো কালি দিয়ে ক্রস চিহ্ন দেন।
এ সময় তার সাথে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগের নেতা কর্মীরা ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটি ভুয়া ও সেখানে যোগ্যদের বঞ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তারা জানান নাসিক মেয়র আইভী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান।
অপরদিকে জানা যায়, নারাণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন একে অপরে চাচা ভাতিজি বলে ডাকেন। বিভিন্ন সভায় মেয়র আইভী আনোয়ার হোসেনকে চাচা বলে সম্বোধন করেন। তাছাড়া ২০২২ সনের ১৬ জানুয়ারি নাসিক নির্বাচনে মেয়র আইভীর পক্ষে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করেন। তবে এই নির্বাচনের মেয়রের বিপক্ষে ভুমিকা রাখে সাংসদ শামীম ওসমান।
বিভিন্ন প্রচারনায় গিয়ে মেয়র আইভী অভিযোগ তুলেন তার প্রতিপক্ষ প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা তৈমুর আলম শামীম ওসমানের প্রার্থী। কিন্তু মেয়রকে বিজয়ী করার পক্ষে আনোয়ার হোসেন ভালো ভুমিকা রাখেন। তবে ২০১৬ সনের নাসিক নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আগে মেয়র আইভীর বিপক্ষে ভুমিকা রাখেন আনোয়ার হোসেন।
তখন আনোয়ার হোসেনের পক্ষে সাংসদ শামীম ওসমান ব্যাপক ভুমিকা রাখেন। কিন্তু তখন চাচা ভাতিজির সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরে। পরে তা ঠিক হলেও হঠাৎ করে এসে তা নতুন ভাবে মোড় নিতে যাচ্ছে। এই চাচা ভাতিজির সম্পর্ক আবার ফাটল ধরতে যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
১৬ নম্বর ওয়ার্ডেও জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য নেতাদের অসম্মানের অভিযোগ তুললেন সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। গতকাল বিকেলে দেওভোগে নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের নিয়ে এক বৈঠকে আইভী এই ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী ১৬ নং ওয়ার্ডে ছোট ভাই এপন আর চঞ্চলকে বানায় দিলো। আমি এপন আর চঞ্চলের কথা বলবো না, কারণ ওরা ছোট ভাই। ওরাও নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
কিন্তু আনোয়ার কাকা প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব নিয়ে কমিটি দিয়েছেন৷ দেওভোগ আওয়ামী লীগরে বুঝানোর জন্য যে, আমি যা চাই তা হইতে পারে৷ এই কারণে তিনি এই দুইটা নাম ঘোষণা করে সকলকে অসম্মানিত করেছেন। আমাদের যেই পূর্বপুরুষরা দেওভোগকে নেতৃত্ব দিয়েছে সেই পূর্বপুরুষদের তিনি অসম্মানিত করেছেন। উনাকে আমি আজকে এখানে দাড়িয়ে দেওভোগের মানুষ হিসেবে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম।’ সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনকে মর্গ্যান বালিকা বিদ্যালয়ে সভাপতি নির্বাচিত করিয়েছিলেন বলেও জানান সিটি মেয়র।
তিনি আরও বলেন, ‘খোকন সাহেব ও আনেয়ার সাহেব তারা আমার হাতে গড়া। যদি অস্বীকার করতে চায়, যদি তিনি মুসলমানের সন্তান হয়ে থাকে তাহলে এখানে এসে বলুক। আর খোকন সাহা যদি ধর্মে বিশ্বাস করে থাকে তাহলে সেও বলুক। সে তখন আমারে মা ডাকতো। সবাাই পূর্বের কথা ভুলে গেছে। ‘যাই হোক, এই কমিটি মানবো না। আনোয়ার কাকা ও খোকন সাহেব যদি ২০০৩ থেকে কন্টিনিউ করতে পারে তাহলে বর্তমানে যেই কমিটি আছে সেটাও কন্টিনিউ হবে’, বলেন আইভী।
তিনি বলেন, ‘যারা নতুন কমিটির ওই ২ ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এই আওয়ামী লীগ অফিসে আইসা কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা করবেন না। অফিসে আসবে, বসবে, কথা বলবে সমস্যা নেই। কিন্তু বেয়াদবি চলবে না। যদি কেউ কমিটি নিয়া বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে তাহলে আমি ওইটা নিয়ে জবাব দিবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জের ৯টি ওয়ার্ডে কমিটি নিয়ো কিছু হয় নাই। কারণ আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য শামীম ভাই বলে দিছেন, এটা আমার নির্বাচনী এলাকা, তোমরা ওখানে যাবা না। আমি আমার এলাকায় যেভাবে কমিটি করি সেভাবেই করবো।’ নগরীর ১৭ ওয়ার্ডে পাল্টা কমিটি দেবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি।
আইভী বলেন, ‘এখন আমার তাহলে আনোয়ার কাকা ও খোকন সাহেবের কাছে প্রশ্ন, ওই ৯টি ওয়ার্ড যদি তার নির্বাচনী এলাকা হয়ে থাকে তাহলে ২৭টি ওয়ার্ডই আমার নির্বাচনী এলাকা। কোন অধিকারে, কোন সাহসে আমাকে জিজ্ঞেস না করে আপনারা ১৭টি ওয়ার্ডে কমিটি দেন। আমি ১৭টি ওয়ার্ডে পাল্টা কমিটি দিবো। ১৫নং ওয়ার্ডে কাজী সাহেব দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন, সেই লোকের জায়গায় ১২নং ওয়ার্ড থেকে এক লোকরে এনে ১৫নং ওয়ার্ডের কমিটি দিয়েছে। এগুলা কি ছেলে খেলা নাকি, এগুলা কি আনোয়ার সাহেব ও খোকন সাহার বাপের সম্পত্তি।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর দল। আমি শেখ হাসিনার একজন কর্মী। ২০০৩ থেকে আমি কখনও দলের কোনো ব্যাপারে কখনও মাথা ঘামায় নাই। আজকে বাধ্য হইছি। আমি তো আর শামীম ভাইয়ের মত বলতে পারবো না, আমার এলাকায় এটা করতে পারবেন না। কিন্তু আমার মতামত নিয়ে যদি না করে তাহলে আমি পাল্টা কমিটি দিবো। এটা আমার সোজা হিসাব।
এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন মনা বলেন, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা-কর্মীরা কমিটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন।
আইভীর বক্তব্য নিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, কতজনে কতকিছু করলো। কে কি করলো আমি এগুলো জানি না। আপাতত আমি ঢাকার বাহিরে আছি।
উল্লেখ্য গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে মহানগর আওয়ামী লীগের ১৭টি ওয়ার্ডের কমিটি ঘোষণা করা হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা মহানগর আওয়ামী লীগের ১১ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কমিটি ঘোষণা করেছেন। এস.এ/জেসি


