Logo
Logo
×

রাজনীতি

কথাতেই সীমাবদ্ধ শামীম ওসমানের ‘প্রত্যাশা’

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৪, ০৪:৪১ পিএম

কথাতেই সীমাবদ্ধ শামীম ওসমানের ‘প্রত্যাশা’
Swapno

 

জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান তার নির্বাচনী এলাকা মাদক মুক্ত করার শপথ কাবা ঘর ছুয়ে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে গত ২৭ জানুয়ারি এক সভা করে প্রত্যাশা নামক সামাজিক সংগঠনের ঘোষনা দেন। এই সংগঠনের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়ন করা হবে এমনটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে অনেকটাই আলোচনা আসেন সাংসদ শামীম ওসমান। বাস্তবে মাদক নির্মুল কিংবা তা নিয়ন্ত্রনে আনতে কতটুকু সফলতার মুখ দেখেছেন তিনি তা বলাবাহুল্য।

 

জনপ্রিয় এই সাংসদ বলেছেন এক মাসের মাঝে তিনি মাদকমুক্ত করবেন। কিন্তু বাস্তবে তা নামেই সিমাবদ্ধ রয়েছে কাজের ক্ষেত্রে এর কোন কিছুই হয় নাই। বরং এই সংগঠন ঘোষনা হওয়ার পর থেকে উধাও হয়ে রয়েছে প্রভাবশালী এই নেতা এমপি শামীম ওসমান। তিনি যে ভাবে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রত্যাশা নামক সংগঠনের যাত্রা শুরু করেছে বাস্তবে তা কাজের বেলায় কিছুই হচ্ছে না। আর এতে করে মানুষ এখন আরও হতাশ হয়ে রয়েছে।

 

নারায়ণগঞ্জকে মাদক, সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যু মুক্ত করতে গত ২৭ জানুয়ারি বিশাল সমাবেশ করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। “প্রত্যাশা” নামে অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে ওসমানী স্টেডিয়ামে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সমাবেশ সাংবাদিক, জেলা আইনজীবী সমিতি, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, শিক্ষক, ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, খ্রিস্টান ধর্মীয় যাজক, জনপ্রতিনিধি, স্কুল শিক্ষার্থী, বিকেএমইএসহ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

 

সেই সমাবেশে নারায়ণগঞ্জকে ২৮ ফেব্রুয়ারির (শামীম ওসমানের জন্মদিন) মধ্যে মাদক, সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যু মুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছিলেন শামীম ওসমান। তবে শামীম ওসমানের সেই ঘোষনা সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি দুবাই শহরে অবস্থান করছেন। অথচ এই দিনে নারায়ণগঞ্জকে অপরাধ মুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আদৌ বাস্তবায়ন হয় নাই।

 

নগরবাসীর মতে, বিভিন্ন ইস্যুতে হুংকার দিয়ে বরাবরই আলোচনায় থাকেন শামীম ওসমান। তারই অংশ হিসেবে ব্যাপক আয়োজনের মধ্যদিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি বিশাল আয়োজন করে নারায়ণগঞ্জকে অপরাধ মুক্ত করার ঘোষনা দেন। তবে ২৭ জানুয়ারীর পর এ ব্যাপারে তার তেমন কোন দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।

 

২০১৫ নারায়ণগঞ্জে মাদকের সাথে জড়িত রাজনৈতিক নেতা ও ২২ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে একটি তালিকা জমা দিয়েছিল বিশেষ এক গোয়েন্দা সংস্থা। যা সেই সময় জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক প্রত্রিকাগুলোতে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই তালিকায় রাজনৈতিক যে সকল ব্যক্তিদের নাম রয়েছে তারা প্রায় সকলেই শামীম ওসমানের অনুসারী ছিলেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাগলার মেরিন এন্ডারসন ও নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ভিতর থেকে বিভিন্ন ভাবে শহর ও শহরতলীতে মদ ও বিয়ার ছড়িয়ে পড়ছে।

 

এদিকে, গত ২৭ জানুয়ারিতে দেয়া শামমি ওসমানের ঘোষনার বাস্তব রূপ চায় নারায়ণগঞ্জবাসী। যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারি অতিবাহিত হওয়ার পরও দৃশ্যমান ফলাফল না হওয়ায় ‘প্রত্যাশার’ প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহল।

 

এদিকে শামীম ওসমানের সেই প্রত্যাশা নামক সংগঠন এখন মাদক নির্মুলে মাঠে তৎপর না দেখা গেলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই সেটির ব্যানার দিয়েই প্রত্যাশার প্রচার-প্রচারনা চালাচ্ছেন সাংসদের অনুগতরা। অথচ মাদক নির্মুলের ঘোষনাটি কি ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ নির্বাচনের পুর্বে প্রতিটি প্রার্থীই ভোটারকে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন বার্তা শুনিয়ে থাকেন। এবার হয়তবা মাদকমুক্ত করার ঘোষনা ছিলো তেমনী একটি বৈতরনী পার হওয়ার অন্যতম বার্তা।

 

ফতুল্লার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা যখন মাদকের ঘাঁটি হিসেবে রুপান্তরিত হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকের প্রাণ হারাতে হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশসহ সাংসদ এমনকি স্থানীয় নেতাদেরকেও চুপসে থাকার বিষয়টি অনেকাংশে ভাবিয়ে তুলেছে অভিভাবকদের।

 

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লাই এখন মাদকের ঘাটি হিসেবে ব্যাপক সুপরিচিতি অর্জন করছে তার মধ্যে অন্যতম ফতুল্লা রেলস্টেশন ও আলীগঞ্জ, কাশিপুর, মাসদাইর, বিসিক শিল্প এলাকা। যার ভয়াল থাবা থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছে না যুব সমাজও। এ অবস্থায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। মাদকের নিষ্ঠুর যাত্রায় অনেকেই টাকাসহ সম্পদ ধ্বংস করে সর্বশান্ত হয়ে জড়িয়েছেন ভয়ংকর অপরাধ চক্রে।

 

অনেক পরিবার তছনছও হয়ে গেছে। আবার এ মরননেশা বিক্রি করে অনেকেই টাকা-সম্পদসহ বিত্তভৈববের মালিক বনে গেছেন। এসব কারবারে সবচেয়ে বেশি আসক্তি দেখা গিয়েছে উঠতি বয়সের তরুন-তরুনীদের মাঝে। বিভিন্ন মাদক দ্রব্যের ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাজায় আসক্ত হয়ে পড়ছে তারা। এদিকে মাদক পাচারকারীরা মাদক মওজুদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে ফতুল্লা রেলস্টেশন ও আলীগঞ্জ, পিলকুনী এলাকাগুলোকে।

 

ফতুল্লা থেকে আলীগঞ্জ রেললাইনের পাশে বলেই মাদক ব্যবসায়ীরা নিরাপদে এ অঞ্চলগুলোতে মাদক মজুদ ও ক্রয় বিক্রয় করে আসছে। বিশেষ করে ফতুল্লা রেলস্টেশন প্লাটফর্মে, ফতুল্লা কাঁচাবাজার নাছির শেঠ এর বাড়ি, পিলকুনী ব্যাংক কলোনী, আলীগঞ্জ কামার পট্টি, আলীগঞ্জ রেল সিগন্যাল, আলীগঞ্জ তিন রাস্তার মোড় এলাকাসহ চলছে জমজমাট মাদক ব্যবসা। নির্বিকার রয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী।

 

প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত মহল্লায় অভিনব কৌশলে সেবনকারীদের কাছে মরন নেশা হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য পৌঁছে দিচ্ছে। তবে শহরের চানমারীর অন্যতম মাদক স্পটটি প্রশাসন কর্তৃক বন্ধ হওয়ার পর ফতুল্লা রেলস্টেশন এলাকাটি বর্তমানে মাদকের অন্যতম ডেঞ্জার জোন হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছে।

 

একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতা অন্যদিকে বিশেষ পেশার কর্তাদের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের সখ্যতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এলাকার সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়ায় মাদকের বড় বড় চালান এনে নিরাপদে সরবারহ হচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রায় ২/৩ বছর পুর্বে ফতুল্লা থানা পুলিশ ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ওপেন হাউজ ডে অনুষ্ঠান করতো। সেখানে তারা বলে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স ঘোষনা করেছে তাই আমরাও মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার, আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আসলে তাদের এ কথা গুলো কাগজে কলমে বাস্তবে তা নয়। তবে বর্তমানে একেবারেই হচ্ছে না ওপেন হাউজ ডে অনুষ্ঠানটি। যার ফলে বিভিন্ন এলাকায় মাদকের প্রবনতা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি সহ নানাবিধ অপকর্ম।

 

তবে এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবসায়ের নেপথ্যের লোকেরা ধরা ছোয়ার বাহিরে থেকে যায়। মাদকের চালানগুলো গ্রহন করে ভাগ বন্টন করে নেয় মাদক ব্যবসায়ীরা রাত সাড়ে সাতটা থেকে ৯টার মধ্যে প্রতিটা মহল্লায় মাদক পৌঁছে দেয়, কারণ এ সময় পুলিশ ডিউটি পরিবর্তন করে। এ সময় রাস্তায় পুলিশের কোনো গাড়ি থাকে না। তার কারণে নির্ভয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক পৌঁছে দিতে কোনো বাধা অতিক্রম করে না বলে জানায় এলাকাবাসী।

 

এদিকে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হওয়ায় যুব সমাজের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে করে সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে ব্যাপকভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক দেখানো অভিযানে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকলেও পরবর্তীতে পুরোদমে আবার শুরু হচ্ছে মাদক পাচার ও বিক্রি। ইদানীং হেরোইন ও ইয়াবা ব্যবসায় কিশোর বয়সের ছেলে ও নারীরা জড়িয়ে পড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে সমাজে ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

 

তাছাড়া কিশোর অপরাধ “কিশোরগ্যাং” এর উৎপত্তির মুল কারণ হচ্ছে এ মাদক। অনেকেই বলছেন, যে কিশোর গ্যাংয়ের উদ্ভব হয়েছে প্রতিটি এলাকায়- তার নেপথ্যের প্রধান কারণই হল মাদকের সহজলভ্যতা। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক শেল্টারে কিশোরদের দিয়ে মাদক ব্যবসা করাচ্ছে বলেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে কিশোর গ্যাংয়ের লড়াই হচ্ছে, খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। এদিকে মাদক ও কিশোরগ্যাং এর বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিয়মিত অভিযান চালালেও রহস্যজনক কারণে অধরা থেকে যাচ্ছে মূল হোতারা।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছে শামীম ওসমান হাঁক ডাক দিয়ে যা শুরু করেন বাস্তবে তা করেন না। কেননা তিনি বলেন এক এক আর করেন আরেক। আবার কেউ কেউ বলেন নিজেকে ক্লিন ইমেজ দেখাতে এই সংগঠন শুরু করেন। কিন্তু পরে তা আর হয়ে উঠে নাই। এজন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝ থেকে শুরু করে সচেতন মহল বলছে শামীম ওসমান মাদক মুক্ত করার ঘোষনা দিয়ে উধাও। আর এজন্য তার প্রত্যাশা নামক সংগঠন এখন মানুষের কাছে তা হতাশ হয়ে উঠছে। এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন