বহুল প্রতীক্ষিত সদর উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আশায় বুক বেধেছিলেন এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। মামলা জটিলতার দোহাই দিয়ে বিএনপির আজাদ বিশ্বাস আর অগ্রহণযোগ্য নাজিমউদ্দিন আর ফাতেমা মনিরে নাভিশ্বাস এখানকার স্থানীয়দের। তবে সেসবে স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমানের থাবায় সবকিছু গুড়েবালি হতে চলেছে। গতকালই যেখানে খোদ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাচনে কোন সংসদ সদস্য মন্ত্রী হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।
এর ২৪ ঘন্টা না পেরুতেই হস্তক্ষেপ তো পরের কথা খবরদারি শুরু করেছেন শামীম ওসমান। এতে নেতাকর্মীরা একদিকে যেমন বিরক্ত, অপরদিকে শামীম ওসমানের এই হস্তক্ষেপকে রাজনৈতিক যন্ত্রণা বলে অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। তারা মন্তব্য করেন, শামীম ওসমানের উপর যে সকল নেতাকর্মীরা আশায় চেয়ে থাকেন, নির্বাচন আসলেই তিনি একজনের পক্ষ নিয়ে নেন, বাকিদের দমাতে হুঙ্কার, ক্ষোভ ঝাড়েন। এটি মূলত তার নেতাকর্মীদের উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া।
সদর উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তিনি তার কথা না শুনলে কর্মীদের না চেনার হুঁশিয়ারি তো দিয়েছেন বটেই পাশাপাশি কেউ অমান্য করতে পারে এমন সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করে আগামী ৮ মে নির্বাচন হচ্ছে না এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন। ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি মূলত সদর উপজেলা নির্বাচনে তার পছন্দের প্রার্থীর সুপারিশ নিয়ে বাকি নেতাকর্মীদের কচুকাটা করার কৌশল নেন।
বর্ধিত সভায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেছেন, সদর উপজেলা নির্বাচনে আমি যে সিদ্ধান্ত দিবো তাতে সকলে একমত থাকবেন। এটা আমিও জানি। কিন্তু এটা আমার কাছে হিমালয়ের পর্বতের মত কঠিন কাজ। শুধু উপজেলা নির্বাচন নয় ইউনিয়ন কিংবা তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কোন সময় চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের মাঝে আমি যাই নাই। আমার মনে আছে তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যখন একাধিক প্রার্থী হয় তখন লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি এমন কোন নেতা কর্মী তৈরী করি নাই যারা দল বা পদবী নাম অথবা নামের স্থান দেখে রেগে যাবেন এবং উত্তেজিত হবেন। থানা কমিটিতে সবাই জায়গা পায় না। জেলা মহানগর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী দশজন আছে কিন্তু সেখানে হবেন মাত্র একজন। আমরা সকলকে দিতে পারবো না। গতকাল ৩০ মার্চ ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি এই কথা বলেন।

এমপি শামীম ওসমান বলেন, আমাদের আওয়ামী লীগ নেতা ইসহাক তার বক্তব্যে বলেছেন দুই বন্ধুকে বলা হলো তোমরা যাই চাইবে তা পাইবে। কিন্তু কথা হলো প্রথম জন যাই চাইবে দ্বিতীয় জন তার ডাবল পাইবে। প্রথম বন্ধু বললো আমার এক চোখ অন্ধ এবং এক পা অচল করে দেন। যাতে করে দ্বিতীয় বন্ধুর দুই চোখ অন্ধ এবং দুই পায় অচল হয়ে যায়। কেননা প্রথম জন যা চাইবে দ্বিতীয়জন তার ডাবল। তাই নিজের ক্ষতি চেয়ে অন্যের ক্ষতি চাইলেন। ২০০৯ সনে সদর উপজেলা নির্বাচনে আমি দেশে ছিলাম না তখন চন্দনশীল, খোকন সাহার ভুল সিদ্ধান্তে আমাদের দলের তিনজন প্রার্থী থাকায় বিএনপির একক প্রার্থীর কাছে বেশি ভোট পেয়েও আমাদের প্রার্থী পরাজিত হন। অথচ ওই প্রার্থী মাঠে কোন প্রচার প্রচারনা না করে জয়ী হন। যদিও তিনি ছেলে খারাপ না। তিনি পাশ করার পরে গত ১৬ বছর যাবৎ তিনিই আছেন। কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। যারা আমাকে দায়িত্ব দিচ্ছেন আমি কোন ভাগ করতে চাই না।
তিনি বলেন, আমার দুটা সন্তান আমি কাউকে ভাগ করতে পারবো না। একই জিনিস যখন আমার দুই সন্তান চায় তাদের আমি ভাগ করবো কিভাবে। আমি ভাগ করার রাজনীতি করি নাই বিধায় এখনো পর্যন্ত টিকে আছি। দলের ভিতরে আমরা গ্রুপ করি এটা সত্য, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের গ্রুপ ছিল, আছে ভবিষ্যতেও থাকবে। দলে গ্রুপ থাকলেও এখন কিন্তু আর নোংরা নেই। তা বন্ধ হয়েছে। আমার কাছে কেউ এসে কারো নামে কোন কথা বলে ক্লিক লাগাইতে পারে না।
শামীম ওসমান বলেন, যদি আমার কাছে খোকন সাহা চন্দনের নামে কোন কথা বলে খোকন সাহা খুব ভালো করে জানে আমি তা চন্দনের সামনে জিজ্ঞেস করবো। এবং বলবো চন্দন এই কথা তুমি বলছো। এ কারণে আমার কাছে কেউ ক্লিক করতে পারে না। কেননা আমি গ্রুপের মাঝে সাব গ্রুপ করা আমি পছন্দ করি না।
সদর উপজেলা প্রার্থী প্রসঙ্গে বলেন, আপনারা আমাকে বলছেন প্রার্থী দিতে কিন্তু আমি কোন প্রার্থী দিবো না। হয়তো আমাকে অনেকে দুর্বল ভাবতে পারেন আসলে তা নয়। কেন দুর্বল ভাবতে পারেন তা হলো আমি কোন পদ পদবী পাই না, তাদের একটু জানা দরকার আমার সাথে জাতির পিতা পরিবারের যে সম্পর্কটা রয়েছে এটার যে নাম আছে, তা হাতে গোনা দুই একজনের আছে। অনেকে ভাবছে আমি এখানে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবো। না আমি কোন নাম ঘোষনা করবো না। ফতুল্লা ইউপি নির্বাচনে আমি নিজে সিদ্ধান্ত দেয় নাই। আমি হাত জোর করে অনুরোধ করছি আমাকে বিব্রত করবেন না। আপনাদের সকলকে ভালোবাসি এটা যদি আমার দুর্বলতা হয় তাদের জন্য বলা। কেউ যদি এটাকে সত্যি সত্যি দুর্বলতা ভাবেন তাহলে ভুল করবেন, আমি যেটা বলবো সেটাই এখানে হবে, এর বাইরে কিছু হবে না।
শামীম ওসমান বলেন, এই যে উপজেলায় হঠাৎ করে নৌকা উঠিয়ে দেয়া হলো তাতে আমি একমত না। এমপি নির্বাচন করে আমরা ৬৮টা সিটে পরাজিত হয়েছি। ৭৫ টা আসনে ৫০% ভোট পরেছে। তাহলে আমাদের ভোট গেল কই। সেটাই আমি জানতে চাই। এখন যেই কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে তা আগামী ৩ থেকে ৫ বছরে শেষ হবে না। উপজেলা নির্বাচনে একই অবস্থা এমপি দিবে একটা, থানা কমিটি দিবে একটা, জেলা কমিটি দিবে একটা, দোকানদার দিবে একটা প্রার্থী। আর এই ভাবে আমাদের সংসার ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে। আমি একটা কথা পরিষ্কার ভাবে বলতে চাই আজকে, আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় আমার পরিবারের মাঝে কোন ফাটল আমি হতে দিব না। এটা আমার একটা পরিবার। আর যদি কোন ফাটল হয় আমার চেয়ে শক্ত কেউ হবে না। আমি শক্ত পদক্ষেপ নিব। আমি এই উপজেলা নির্বাচন সিরিয়াসলি নিব। আমি মাঠে থাকবো। যদি আমার মাঠে থাকার নিয়ম নাই। কিভাবে থাকতে হয় আমার জানা আছে। যারাই উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন আমার আপত্তি নাই। তবে আমার কথা একটাই যাকে দিব সে জয় লাভ করে আসুক। তবে এখানে কেউ পার্সোনাল ইগো প্রবলেম তৈরী করবেন না। আর একটা জিনিস কেউ মনে করবেন না আমার অনেক সেক্রিফাইস, আমি কেন সেক্রিফাইস করবো। তাহলে খান সাহেব ওসমান আলী পরিবারের থেকে যে সেক্রিফাইস তাতে আমাদের পরিবারে ছয়টা মন্ত্রী থাকার কথা। কই আমিতো কোন দিন চিন্তা করি নাই আমার সেক্রিফাইস অনেক। আমার তিন পুরুষ সেক্রিফাইস করতে পারি এটা আমার অহংকার। নো গিভ এন্ড টেক। আমি যা চাইবো তা পাবো। ২০ কোটি টাকার জন্য আমার বাড়ি ঘর বন্ধক রাখতে হয় না।
এমপি শামীম ওসমান বলেন, আমার ছেলে মেয়েদের যেভাবে আদর করি তার চেয়ে কোন অংশে আমার কর্মীদের কম আদর করি না। আমি যখন দেখি এটা নিয়ে রেশারেশি হয় আমার মনে হয় আমি কোন যোগ্য মানুষ না। আমার বাচ্চাদের আমি শিখাতে পারি নাই। আমি তখন খুব কষ্ট পাই। আপনার সকলে বার বার একটা কথা বলেছেন আমি যাকে দিব আপনারা তার জন্য কাজ করবেন। আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে বলেন যেটা বলছেন এটাই ফাইনাল। সকলের হাত তুললেও দুই একজন হাত তুলেন নাই। যাদের আশা করছি তাদের দুই একজন হাত তুলেন নাই। কেউ কেউ মনে করেছে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। যারা প্রার্থী হতে চান তারা সকলে শওকত ভাইয়ের কাছে সিভি জমা দেন। আর যদি থানা আওয়ামী লীগকে কিংবা আমাকে বাইপাস করে কিছু করতে চান তাহলে করতে পারেন আমার আপত্তি নেই, কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাকে ভুলে গিয়ে তাকে নির্বাচন করতে হবে।আমার সাথে তার সম্পর্ক ছিল এটা তাকে ভুলে যেতে হবে। কে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান হবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার পরিবারে আমি উইপোকা প্রবেশ করতে দিবো না। যে কয়দিন আছি আমরা এক সাথে আছি এক সাথে থাকবো এক সাথে মরবো। ইজ্জত সহকারে থাকবে।
বর্ধিত সভার প্রথমেই ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি সদর উপজেলা নির্বাচন যেনো না হয় তা নিয়ে কুটচাল চালানো হচ্ছে। এ বক্তব্যের জবাবে শামীম ওসমান তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেই দেন, এ উপজেলায় নির্বাচন ৮ মে হচ্ছে না এটা কনফার্ম। এ ঘোষণার পরপরই যেন দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ উপজেলা নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা থমকে যায়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কপালে পড়ে চিন্তার ভাজ। তবে শামীম ওসমান এদিন তার অনুগামীদের দেন আরো কিছু কঠোর বার্তা। বক্তব্যের এক পর্যায়ে শামীম ওসমান বলেন আমি আমার সংসদ নির্বাচন নিয়ে যতটা সিরিয়াস ছিলাম এ উপজেলা নির্বাচন নিয়ে এর চেয়ে দশগুন বেশি সিরিয়াস।
তিনি আরোও বলেন, যারা বাইপাস করে নির্বাচন করতে চান তারা করতে পারেন তবে আমাকে ভুলে গিয়ে কাজ করতে হবে । মনে রাখতে হবে তাদের আমার সাথে কোনো সম্পর্ক ছিলো না। আমার ঐক্যে ফাটল ধরলে আমার চেয়ে কঠিন আর কেউ হবে না। এস.এ/জেসি


