আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে বর্তমান চেয়ারম্যান ও বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ রশিদকে সমর্থন করে তাকে নির্বাচিত করার ঘোষণা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান।
এ সময় তিনি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রচারণায় থাকা বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল ও মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনকে নির্বাচন হতে সরে যাওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি দেন। এমনকি যদি ভালোয় ভালোয় কথা না শুনলে মুগুর বানানোরও হুমকি দেন তিনি। তাছাড়া গতবারের মতো এবারও এই উপজেলায় কোন নির্বাচন ছাড়াই আলোচনার মাধ্যমে তিনটি পদে নির্বাচিত করা হবে বলে জানান তিনি।
সেলিম ওসমান বলেন, আমি আপনাকে কিছু বলবো না তবে মনে রাখবেন, আমরা কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা। যদি ভালোয় ভালোয় কথা শুনেন তো শুনবেন। নাহলে মুগুর কিভাবে কিভাবে বানাতে হয় সেটা আমরা দেখবো। মুগুরের মাধ্যমেই কিন্তু আপনাকে...। আমি বললাম, কথা দিলাম আপনি আগামী কাল থেকেই উইড্র করেন। আপনার সঙ্গে চারজন চেয়ারম্যান, যেভাবে আমার কথা শুনেছে, আমাদের সামনে বসেছে, আপনিও আসেন।

তিনি আরও বলেন, এখানে গত উপজেলা নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, এই পবিত্র রমজান মাসে আমার হাত যদি আল্লাহর কাছে উঠে, আবার ঠিক তেমনি নির্বাচন হবে। পয়সার অপচয় হবে না, আবারও দেখবেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রশিদ ভাই, সানু আর একজন মহিলা ক্যান্ডিডেট সবার সাথে আলোচনা করে, আমাদের বন্দরে সুখ ও শান্তি আনার জন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব। গতকাল বন্দরের এক মতবিনিময় ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
যদিও আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রভাব বিস্তার বা হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল এক মতবিনিময় সভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য, আমি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবো, আমার একজন থাকবে তাকে জেতানোর জন্য গোটা প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করবো, এটা হতে পারবে না। যে উদ্দেশ্যে এই নির্বাচন উন্মুক্ত করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্যটা কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত করা যাবে না।’
মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা দেখতে চাই এর মধ্য দিয়ে নির্বাচন কতটা প্রতিযোগীতামূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হতে চায় হবে। আমরা একটা প্রভাবমুক্ত ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন করতে চাই।’ যদিও সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির এমপি, তবে বাংলাদেশের নির্বাচনীয় আচরণ বিধি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো সাংসদ বা মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ভোট চাইতে পারবেন না। এটা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে জানা যায়। এ ধরণের অভিযোগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক করতে বা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়।
এ সময় সেলিম ওসমান বলেন, নির্বাচনে আমি পুরানো দুইজনকেই সমর্থন দিব। সেটা হলো রশিদ (চেয়ারম্যান পদে) ও সানু (ভাইস চেয়ারম্যান পদে)। এখন দুইজন আমার অমতে নির্বাচন করার চিন্তা-ভাবনা করছেন। একজন তো প্রমাণ করে দিয়েছেন (মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ) উনি রাজাকার। আমি কখনও ধরি নাই, মানুষের জন্য কাজ করো, আগের পাপ, বাপ-দাদার পাপের কথা ভুলে যাও। পাপে বাপেরেও ছাড়ে না। আমি এতগুলো মানুষের সামনে বললাম, আল্লাহর কাছে মাফ চান এবং আপনার দায়িত্বে আপনি ফিরে আসেন। আমি আপনাকে কিছু বলবো না তবে মনে রাখবেন, আমরা কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা। যদি ভালয় ভালয় কথা শুনেন তো শুনবেন। নাহলে মুগুর কিভাবে কিভাবে বানাতে হয় সেটা আমরা দেখবো। মুগুরের মাধ্যমেই কিন্তু আপনাকে...।
তিনি বলেন, আপনার এত টাকা কোথা থেকে হলো মাকসুদ সাহেব। আপনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা দেওয়া শুরু করেছেন। আমার হিসেব বলে, আপনি তিন কোটি টাকা ইতিমধ্যে খরচ করেছেন। আপনি মহিলাদেরকে বলেছেন, আপনাকে ভোট দিলে তিনশত করে টাকা দিবেন। এই টাকাতো তাদের একান্ত প্রয়োজন। আপনি কেন তাদেরকে খারাপ করার চেষ্টা করছেন। আপনি ভুলে যাবেন না, বাংলার মানুষ আপনাদের ক্ষমা করবে না যদি আপনি আপনার রাজাকার পরিচয়টা দেন। আমি নিষেধ করলাম, আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কিন্তু আপনাকে আমার মৃত্যু হলেও ছাড়বে না। আপনি কেন বসলেন না, কেন আলোচনা করলেন না, কেন অনুমতি নিলেন না। আপনি মনে করলেন, আমাকে একটা গরম চাঁদর, দুই প্যাকেট মিষ্টি আর আমার বউকে একটা শাড়ি দিয়ে আপনি উপজেলার চেয়ারম্যান হয়ে যাবেন। পেট টিপলে ‘ব’ বের হবে না, আর আপনি নাকি উপজেলার চেয়ারম্যান হবেন। মাকসুদ সাহেব, আপনি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যান।
অন্যদিকে নির্বাচনের প্রচারণায় থাকা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা আতাউর রহমান মুকুলের উদ্দেশ্যে সেলিম ওসমান বলেন, আরেকজন লোক আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। যিনি রশিদ ভাইয়ের আগেও এই উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলেন। সব কিছুরই একটা সময় আছে। ওনাকে একটা দল বহিষ্কার করেছে। ওনি আমার কাছে গেছিলেন, শুনতে চাইছিলেন, আমি ওনার কাছে বলেছি। আপনি এখন কোন দলের সদস্য না। আপনাকে মানুষ ভালবাসে তার মধ্যে কোন ভুল নাই। আপনি একজন মুরুব্বি হিসেবে থাকেন। আপনাকে বিভিন্ন স্কুলের সভাপতি বানিয়ে দিয়েছি, আপনি আপনার মান সম্মান নিয়ে আগামী জীবনটা বেঁচে থাকেন। আর আপনি রাজনীতির পথে হেঁটেন না।
সেলিম ওসমান বলেন, আমি সকলের কাছে অনুরোধ রাখলাম। আমি সরাসরি নাম বলছি, মুকুল আমার ছোট ভাই, আপনি এই পদ থেকে সড়ে দাঁড়ান। এটাতে কোন হুমকি না। মাকসুদ সাহেব, আমি আপনার উপর তখন রাগ করেছি, যখন নাকি আপনার অতীত রাজাকার, আপনি কোন সাহসে বঙ্গবন্ধুর ছবি লাগালেন। আপনি কোন সাহসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি লাগালেন। ভাল না, একবার কিন্তু সংসদে রাজাকার বসেছে, এখন রাজাকারের গোষ্ঠীও কিন্তু সংসদে নাই।
তিনি বলেন, আমি মঞ্চে উঠার সময় আমি রশিদ ভাইয়ের পায়ে ধরে সালাম করে তারপর উঠেছি। বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম শামসুজ্জোহার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। রশিদ ভাই নির্বাচন কতের চান নাই। আমাকে একপর্যায়ে বলতে হয়েছে, আপনি যদি নির্বাচন না করেন, তাহলে আমি জাতীয় সংসদের পদ থেকে রিজাইন দিব। কারণ আমি কোন রাজাকারের সাথে বসে কাজ করতে পারবো না। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভুলে যাবে না, গত নির্বাচনে একজন উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও একজন মহিলা ভাইসচেয়ারম্যান, ভোট দিয়েছিলেন কেউ? আপনারা কেউ ভোট দিয়েছেন? একটাই ভোট হয়েছিল, আর সেই ভোট দিয়েছিল সেলিম ওসমান। সেলিম ওসমান ছাড়া আর কেউ কিন্তু ভোট দেয় নাই।
আপনাদের মাধ্যমে আমার শেষ কথা, রাজাকার আমি আজকে বলবো না, আমি আমার সম্মানিত চেয়ারম্যানই বলব। চেয়ারম্যান মাকসুদ সাহেব, আপনি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসেন। পরবর্তী সভা আমি মুসাপুরে ওনি থাকেন আর না থাকেন, আপনারা আয়োজন করবেন। মুসাপুরেই সবচেয়ে বড় মিটিং হবে। আমি কনফার্ম, আমি যদি না চাই, মাকসুদের বউও মাকসুদকে ভোট দিবে না। ইনশাআল্লাহ, গত উপজেলা নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, এই পবিত্র রমজান মাসে আমার হাত যদি আল্লাহর কাছে উঠে, আবার ঠিক তেমনি নির্বাচন হবে। পয়সার অপচয় হবে না, আবারও দেখবেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রশিদ ভাই, সানু আর একজন মহিলা কেন্ডিডেট সবার সাথে আলোচনা করে, আমাদের বন্দরে সুখ ও শান্তি আনার জন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
তিনি বলেন, আজকে আমি বিরোধী দলে রয়েছি, এরমধ্যে কোন ভুল নাই। আজকে কে আমাকে বিরোধী দলে রেখেছেন। কে আমার এই সিটে আরেক জনকে নমিনেশন দেয় নাই। কেন আজকে আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা মার্কা দেওয়া হলো না। কেননা আওয়ামী লীগের মানুষ সেলিম ওসমানকে ভালবাসে। আর হুট করে আওয়ামী লীগের একজনকে নিয়ে নেওয়া যায় না। এস.এ/জেসি


