হঠাৎ করেই যেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানের রোষানলে পড়ে গেলেন বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (সদ্য সাবেক) মাকসুদ আহমেদ ও বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল। অথচ মাকসুদসহ বন্দর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে নিজের সন্তান বলে দাবি করতেন সেলিম ওসমান। একই সাথে আতাউর রহমান মুকুলকে নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে দাবি করতেন।
এমনকি বন্দরের যেকোন সিদ্ধান্তই তিনি বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এমএ রশিদ, বিনপি নেতা (বহিষ্কৃত) আতাউর রহমান মুকুল ও জাতীয় পার্টির সাবেক আহ্বায়ক আবুল জাহের (প্রয়াত) এর সাথে একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও জানান তিনি। আবুল জাহের মারা যাওয়ার পর সেসব সিদ্ধান্ত তাদের তিনজনকেই নিতে হয় বলে আফসোসও করতেন তিনি। অথচ সেই মাকসুদ হোসেন এবং আতাউর রহমান মুকুলই এখন এই সাংসদের রোষানলের শিকার হয়েছেন।
এক সময় তাদের বিরুদ্ধে আসা যেকোন অভিযোগকেই হজম করে তাদের পক্ষ নিয়ে কাজ করার অভিযোগও ছিল এই এমপির উপর। অথচ এখন তিনি নিজেই তাদের সকল দোষত্রুটি প্রকাশসহ তাদেরকে নির্বাচন থেকে দূরে সরে দাঁড়ানোর জন্য হুমকি দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে শুধু বন্দরই নয় পুরো নারায়ণগঞ্জ জুড়েই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে যারা কোনো না কোনো ভাবে রাজনীতির খবর রাখেন বা রাজনীতির সাথে জড়িত আছেন, তাদের যেকোন আড্ডায়ই এখন বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে।

গত শনিবার বন্দরের ধামগড়ে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় বন্দর উপজেলা পরিষদের আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিদকে একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন তিনি। একই সাথে নির্বাচনে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রচার প্রচারণায় থাকা দুই প্রার্থী মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন ও বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন তিনি।
এই সময় তিনি নির্বাচন করে টাকার অপচয় করার দরকার নেই উল্লেখ করে বন্দর উপজেলা পরিষদের এসব পদের জন্য এর আগের নির্বাচনের মত এবারও কোন নির্বাচন ছাড়াই নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি। এরপরের দিনই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেন মাকসুদ হোসেন এবং চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। একই সাথে নির্বাচনের মাঠে শেষ পর্যন্ত থাকার আশ্বাস দিয়ে তার সমর্থকদের নিরাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল তিনি তার সমর্থকদের নিয়ে মদনপুর ও ধামগড়ের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালান তিনি। অন্যদিকে পিছু হটেননি রোষানলের আরেক শিকার আতাউর রহমান মুকুল। তিনিও নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বন্দর কলাগাছিয়া এলাকার এক স্কুল শিক্ষক (নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক) বলেন, আমরা যেখানেই যাই সেখানেই শুনতাম বন্দর উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং এখানকার পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদে যারা বর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন তারা সবাই এমপি সেলিম ওসমানের লোক। এদের নির্বাচিত করানোর জন্যও শুনেছি এমপি সাহেব নির্বাচন বাতিল করতে চেয়েছেন অর্থাৎ নির্বাচন ছাড়াই যাতে তারা নির্বাচিত হন সেই ব্যবস্থাও করতে চেয়েছেন তিনি। উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এমএ রশিদও গতবার কোন নির্বাচন ছাড়াই চেয়ারম্যান হয়েছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমপি সাহেব ঘোষণা দিয়েও তা বলে বেড়ান।
তিনি প্রশ্নের সুরে বলেন, আপনারা কি মনে করেন সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল এই এমপি পরিবারের সমর্থন ছাড়া-ই হয়েছে! মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনসহ বন্দরের এহসান উদ্দিন, মদনপুরের সালাম এবং কলাগাছিয়ার দেলোয়ার হোসেন প্রধানও এই এমপির সমর্থন ও আশির্বাদ নিয়েই চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ এখন হঠাৎ করেই কেন মাকসুদ ও মুকুল এমপির রোষানলে পড়ে গেলেন তা-ই ভেবে দেখার বিষয়।
ধামগড় এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাসহ একাধিক লোকের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করলে তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে উৎসব মূখর করে তুলতে দলীয় লোকসহ একাধিক ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকতে উৎসাহিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। দলের সাধারণ সম্পাদকও বিষয়টির উপর জোর দিয়ে বারবার নেত্রীর এই ইচ্ছের কথা বলেছেন। কোন এমপি বা মন্ত্রীকে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীতার বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথাও তিনি বলেছেন।
আর সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েই এবারের নির্বাচনে অনেকেই প্রার্থী হতে চেয়েছেন। অথচ এমপি সেলিম ওসমান নিজেই জানিয়েছেন, তিনি নাকি সেসব ইচ্ছুক ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার জন্য বলেছেন। একই সাথে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অংশ নিতে চাওয়া মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (সদ্য সাবেক) মাকসুদ হোসেনকে এবং বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলকে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি দেন। যা খুবই দৃষ্টি কটু বলে মনে করেন তারা। এস.এ/জেসি


