শামীম ওসমান তার কয়েকজন বিশ্বস্তকর্মীর ওপর ভীষণ চটেছেন। তারা শামীম ওসমানকে বাইপাস করছেন বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। ওদের সাহস দেখে রীতিমতো চমকে ওঠছেন স্বয়ং শামীম ওসমান। সহ্যসীমা অতিক্রম করার আগেই তিনি তাদেরকে শাসিয়েছেন। কারো নাম উল্লেখ না করলেও যারা বুঝার তারা তাদের নেতার কথার সারাংশ বুঝে গেছেন।
শামীম ওসমান একজন পোড়খাওয়া নেতা। তিনি নেতা তৈরীর কারিগর। তার হাত ধরে আজ অনেকেই নেতার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, শামীম ওসমান একজন কর্মীবান্ধব নেতা। তিনি কর্মীদের মূল্যায়ন করতে জানেন। সুযোগ পেলেই তিনি তা করিয়ে দেখিয়েছেন। কিন্তু সেই নেতা-কর্মীরা যখন ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়ার চেষ্টা করে তখন কি আর চুপ থাকা যায়! যায় না। শামীম ওসমানও চুপ থাকেননি।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির লাগামটা এখন ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের হাতে। পালাবদলের সূত্রপাত ১৯৮৬ সালে। ওই বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃতীয় প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ সদস্য নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টির টিকেটে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর পরই দ্রুততার সাথে দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে।

পরবর্তীতে তিনি ওই আসন থেকে জাতীয় পার্টি এবং মহাজোটের প্রার্থী হয়ে ৩ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে নাসিম ওসমানের আকস্মিক মৃত্যু হলে তৃতীয় প্রজন্মের মেঝো সদস্য সেলিম ওসমান তার শূন্য আসনে এমপি নির্বাচিত হন। এবারও ওই আসন থেকে জাতীয় পার্টির এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি দীর্ঘসময় ধরে ঘুরে ফিরে ওসমান পরিবারের হাতেই আবদ্ধ থাকছে।
তবে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন থেকে এই পালাবদলে নতুন মাত্রা যোগ হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মঞ্চে ফিরে আসার পর থেকেই গোটা জেলার রাজনীতির চালকের আসনে অধিষ্ঠিত হন ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। ওই নির্বাচনে ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের কনিষ্ঠতম সদস্য শামীম ওসমান নারায়নগঞ্জ-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকেটে জয়লাভ করেন।
এরপর টানা ৫ বছর তার কথা মতোই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির উত্থান-পতন ঘটে। ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব দিয়ে তিনি গোটা জেলায় তার একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। ১৯৯৮ সালের ৯ জুন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুরে বিকল ট্রাকের বহর দিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ ঠেকিয়ে বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম হন। আর তখন থেকেই তার নামের সাথে ‘গডফাদার’ এর তকমা যুক্ত হয়ে যায়।
এবং তখনই তিনি বেগম খালেদা জিয়ার এক নাম্বার শত্রুতে পরিণত হন। লংমার্চ করতে না পেরে বেগম জিয়া ভবিষ্যতে শামীম ওসমানকে দেখে নেয়ারও হুমকি দেন। তা ছাড়া তার কিছু ঘনিষ্ঠ কর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিলো, শামীম ওসমান নিশ্চয়ই তার কর্মীদের এসব অপকর্মের কথা জানেন।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নৌকার প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চার দলীয় জোটের প্রার্থী গিয়াসউদ্দিনের কাছে হেরে যান। খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে চার দলীয় জোট সরকারের যাত্রা শুরু হয় ১০ অক্টোবর। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হতে না হতেই দেশের বিভিন্নস্থানে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর অকথ্য নির্যাতন শুরু করে চার দলীয় জোটের কর্মী ও সমর্থকরা।
এ রকম পরিস্থিতিতে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। প্রথমে ভারত এবং পরে কানাডায় থিতু হন। অনেক কষ্টে কেটেছে তার প্রবাসজীবন। দীর্ঘ ৮ বছর পর দেশে ফিরে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে টানা ৩ বার এমপি নির্বাচিত হয়ে নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করেন।
সেই পরাক্রমশালী শামীম ওসমান তার বিশ্বস্ত কয়েকজন কর্মীর ইদানিংকার কিছু নেতিবাচক কর্মকাণ্ড দেখে হতাশ হয়ে হুমকির সুরে কঠোর কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। সম্প্রতি নগরীর কাশীপুরে অনুষ্ঠিত থানা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় আসন্ন সদর উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা প্রার্থী হতে চান, তারা সবাই শওকত ভাইয়ের কাছে সিভি জমা দেন। আর যদি থানা আওয়ামী লীগ কিংবা আমাকে বাইপাস করে কিছু করতে চান করতে পারেন, আমার আপত্তি নেই।
কিন্তু আমাকে ভুলে গিয়ে তাকে নির্বাচন করতে হবে। আমার সাথে কোনদিন তার সম্পর্ক ছিলো, একথাটাও ভুলে যেতে হবে।আমার পরিবারে আমি কোন উইপোকা প্রবেশ করতে দেবো না। যে কয়দিন আছি আমরা একসাথে আছি একসাথে থাকবো, একসাথে মরবো। ইজ্জত নিয়েই থাকবো।’
খুব ভালোভাবে জেনে শুনেই শামীম ওসমান তার বক্তৃতায় ইংরেজী ‘বাইপাস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। বাইপাস শব্দটির বাংলা অর্থ পার্শ্বপথ। অর্থাৎ শামীম ওসমান যে রাস্তা দিয়ে তার বিশ্বস্ত কর্মীদেরকে চলতে বলেছেন বা বলছেন, তারা সেই রাস্তাকে অবহেলা করে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা উপেক্ষা করে অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। এটা কোন ক্রমেই বরদাস্ত করার মতো ঘটনা নয়। এস.এ/জেসি


