নারায়ণগঞ্জ উপজেলার নির্বাচনের ঢামাঢোল বাজতে শুরু করেছে। চলছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা। ইতোমধ্যে এই দুই উপজেলার নির্বাচনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীতা নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। গত নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকায় এবারের মত তেমন কোন হৈ চৈ ছিল না। কিন্তু এবার উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও দলের প্রার্থীতায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় সাংসদ।
অথচ আওয়ামী লীগের দলীয় হাই কমান্ড বার বার বলে আসছেন উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় এমপি মন্ত্রীরা কাউকে সমর্থন কিংবা কারো পক্ষে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কথায় আছে কে শুনে কার কথা। নারায়ণগঞ্জের এমপিদের ক্ষেত্রে তারই চিত্র উঠে এসেছে। এখানকার স্থানীয় এমপি মুখে বলেন তিনি কোন প্রার্থী ঘোষনা দেন না। আবার তার বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচন করলে তাকে ভুলে গিয়ে করতে হবে এমন হুশিয়ার দেন। যার ভয়ে কেউ প্রার্থী হতেও সাহস দেখান না।
এমন কারণ হিসেবে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ মন্ত্রী ও এমপি এখন থেকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে জয়ের কৌশল নিতে শুরু করেছেন। এজন্য তাদের প্রথম টার্গেট এই উপজেলা নির্বাচন। তারা এই নির্বাচনে অনেকে স্ত্রী, শ্যালক, সন্তান ও অনুগতদের প্রার্থী করতে চাইছেন। আর পছন্দের প্রার্থী জয়ী হলে অনেকটাই নিরাপদ থাকবেন বলে মনে করছেন এমপিরা। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করেই শামীম ওসমানসহ দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্ত্রী ও এমপি এমন কৌশল আটছেন বলে ধারণা করছেন খোদ আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নীতিনির্ধারক নেতা।
তারা বলছেন, গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১১জন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। কমপক্ষে ২৯ জন নির্বাচনে জয় না পেলেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। এ কারণেই অনেক মন্ত্রী ও এমপিদের মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ঘিরে একধরণের ভীতি ও আতঙ্ক কাজ করছে। তাদের কেউ কেউ গত সংসদ নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলতে পারছেন না। তাই তাদের ধারণা নিজের উপজেলায় পছন্দের কোন প্রার্থী জয়ী না হলে তিনিই হবেন আগামী দিনের প্রধান প্রতি পক্ষ।
এজন্যই শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানসহ নারায়ণগঞ্জের সকল এমপিরাই নিজের অনুগতদের দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী বানানোর কৌশল এটেছেন। শামীম ওসমান তার পছন্দের প্রাথী নাম ঘোষণা না করলেও সেলিম ওসমান বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিদ ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় পার্টির সভাপতি সানাউল্লাহ সানুর নাম ঘোষণা করেছেন। তবে শামীম ওসমানও তার অনুগতদের দমিয়ে নিজের প্রার্থীকে বের করে নিয়ে আসতে নানা হুঙ্কার দিয়েছেন কর্মীদের।

এ নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে নানা ধরণের সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। শামীম ওসমান তো একধাপ এগিয়ে ৮ মে সদর উপজেলা নির্বাচন না হওয়ার কথা বলছেন। কেননা গত এক দশকের বেশি সময় এইখানে মামলা জটিলতার কারণে বিএনপির আজাদ বিশ্বাস উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। নিজের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীকে বের করে নিয়ে আসতে না পারলে আজাদ বিশ্বাসের উপরই ভরসা করতে পারেন তিনি।
অপরদিকে বন্দর উপজেলায় যদি এমএ রশিদকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আটকে না রাখা যায় তবে আগামী নির্বাচনে তাকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দিতে পারে আওয়ামী লীগ এমন আশঙ্কা থেকেই এমএ রশিদকে উপজেলায় রাখাটাকেই শ্রেয় হিসেবে মনে করছেন সেলিম ওসমান। আর এ কারণে দীর্ঘদিনের অকৃত্রিম সঙ্গী মুসাপুরের চেয়ারম্যান মাকসুদ ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা আতাউর রহমান মুকুলকেও পাত্তা দিচ্ছেন না তিনি। তবে এবার তারা দুইজনই নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে মনস্থির করেছেন।
এদিকে গত ৩০ মার্চ ফতুল্লা কাশিপুর ইউনিয়নের আওয়াম লীগ অফিসে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রার্থীতা বিষয়ে বর্ধিত সভা হয়। এই সভায় সদর উপজেলার প্রার্থী ঘোষনা হবে এমন ধারণা নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী সহ সকল নেতা কর্মীরা সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু বর্ধিত সভায় প্রার্থী ঘোষনা তো হয় নাই, উল্টো যারা প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তাদের হুশিয়ারি দেয়া হয়। যাতে করে এমপির বাহিরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হতে না পারেন। অথচ দল যেখানে প্রার্থীতা নিয়ে উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। তাই এ নিয়ে তৃনমুলে ক্ষোভ তৈরী হয়েছে।
অপরদিকে জানা যায়, সদর উপজেলা সম্ভাব্য প্রার্থী থেকে শুরু করে সকলেই বর্ধিত সভায় বলেন, এখানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সাংসদ শামীম ওসমান যাকে প্রার্থী দিবেন আমরা তার পক্ষেই কাজ করে তাকে জয়ী করবো। সকলেই এমপির দেয়া প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সদর উপজেলায় যেন প্রার্থী উম্মুক্ত করে দেয়া হয় স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের কাছে এই দাবী কেউ তুলেন নাই।
ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় থানা আওয়ামী লীগের সদস্য আবু মো. শরীফুল হক তার বক্তব্যে বলেন, আমাদের নেতা এমপি শামীম ওসমান যাকে প্রার্থী দিবেন আমরা তাকে মেনে নিয়েই তার পক্ষে কাজ করে জয়ী করবো। একই ভাবে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেনও একই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে সকলের তাল মিলিয়ে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামও জানান এমপি শামী ওসমান যাকে প্রার্থী দিবেন তিনি তাকেই মেনে নিয়ে তার পক্ষে কাজ করবেন।
একই সাথে এখানকার সম্ভাব্য প্রার্থী মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু কিছু না বললেও সাংসদের প্রার্থীর বাহিরে যাবেন না বলে জানান তার সমর্থকরা। তাছাড়া সদর উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মীর সোহেল আলী। তিনিও শামীম ওসমানের সিদ্ধান্তে অটল। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কারো নাম প্রকাশ্যে না আসলেও ফতুল্লা মহিলা লীগ নেত্রী ফাতেমা মনির আবারও সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
তারা প্রত্যেকেই সাংসদ শামীম ওসমান যাকে প্রার্থী দিবেন তাকেই মেনে নিবেন বলে জানান। এছাড়া সভায় উপস্থিত থাকা সকলেই জানান তারা স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য মাঠে নেমে কাজ করবেন। তবে বাস্তবে তার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। প্রার্থীদের জয়ী করতে ফতুল্লা জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। যে কলঙ্ক মুছতে পারবে না। তবে সম্ভাব্য প্রার্থী থেকে শুরু করে কোন প্রার্থী থেকেই দাবী উঠে নাই উপজেলায় যেন প্রার্থীতা উম্মুক্ত করে দেয়া হয়। এমনকি সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ থেকেও স্থানীয় এমপির কাছে এই দাবী উঠাতে সহাস পান নাই।
দলীয় সুত্রমতে, উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় ও স্বতন্ত্র এমপিরা কাউকেই প্রার্থী করতে পারবেন না। এমনকি দলের জেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ দায়িত্বশীল কোনো নেতাও প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারবেন না। তবে স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
অপরদিকে সদর উপেজলা নির্বাচন প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেছেন, আমি এই উপজেলা নির্বাচন সিরিয়াসলি নিব। আমি মাঠে থাকবো। যদিও আমার মাঠে থাকার নিয়ম নাই। কিভাবে থাকতে হয় আমার জানা আছে। যারাই উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন আমার আপত্তি নাই। তবে আমার কথা একটাই যাকে প্রার্থী দিব সে জয় লাভ করে আসুক।
তিনি বলেন, আপনার সকলে বার বার একটা কথা বলেছেন আমি যাকে প্রার্থী দিব আপনারা তার জন্য কাজ করবেন। আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে বলেন যেটা বলছেন এটাই ফাইনাল। কেউ কেউ মনে করেছে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। থানা আওয়ামী লীগকে কিংবা আমাকে বাইপাস করে কেউ যদি কিছু করতে চান তাহলে করতে পারেন আমার আপত্তি নেই, কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাকে ভুলে গিয়ে তাকে নির্বাচন করতে হবে। আমার সাথে তার সম্পর্ক ছিল এটা তাকে ভুলে যেতে হবে। কে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান হবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যারা প্রার্থী হতে চান তারা সকলে শওকত ভাইয়ের কাছে সিভি জমা দেন।
কিন্তু দলীয় নেতা কর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে যেখানে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হতে দল থেকে উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে সেখানে আবার সম্ভাব্য প্রার্থীরা এমপির নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকবে কেন। তাছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী কিংবা নেতৃবৃন্দ কেন সাংসদ শামীম ওসমানের কাছে প্রার্থীতা উম্মুক্ত করে দেয়ার জন্য দাবী তুলতে সাহস পান না। এই প্রশ্ন রাজনীতি মহলে এখন আলোচনা হচ্ছে।
উল্লেখ্য প্রথম ধাপে নারায়ণগঞ্জের সদর ও বন্দরসহ সারা দেশের মোট ১৫২ উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৮ মে। ২১ মার্চ নির্বাচন কমিশনের ২৯তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হবে সদর ও বন্দর উপজেলা নির্বাচন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময় ১৫ এপ্রিল। বাছাই ১৭ এপ্রিল এবং প্রত্যাহারের শেষ সময় ২২ এপ্রিল। ২৩ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ। ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৮ মে। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এস.এ/জেসি


