Logo
Logo
×

রাজনীতি

‘বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা রেখে পিডিপিতে যোগ দেন শামসুজ্জোহা’

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:১৮ পিএম

‘বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা রেখে পিডিপিতে যোগ দেন শামসুজ্জোহা’
Swapno

 

আওয়ামী লীগ তো বটেই সারাদেশেই নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের সুখ্যাতি বিদ্যমান। এই পরিবারের সদস্যরা নানা সময় বিভিন্ন কারণে দেশব্যাপী আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। বর্তমানে এই পরিবারের দুই কৃতি সন্তান সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এর আগে ওসমান পরিবারের বড় সন্তান প্রয়াত নাসিম ওসমানও সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে এই তিন ভাইয়ের জনক একেএক শামসুজ্জোহার পরিচিতি ছিল দেশব্যাপী রাজনৈতিক অঙ্গনে। 

 

বিশেষ করে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তাছাড়া তিনি, ভাষা সৈনিক ও স্বাধীনতা পদকে (মরোণত্তর) ভূষিত হয়েছেন। তিনি ছিলেন একাধারে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, গণ পরিষদের সদস্য ও স্বাধীনতা পরবর্তী জাতীয় সংসদ সদস্য। প্রয়াত একেএম শামসুজ্জোহার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় ‘জিয়া হলের ম্যুরাল’ ভাঙা প্রসঙ্গে।

 

বিএনপি দাবি করছে, জিয়া হলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ম্যুরাল ভাঙার পেছনে একেএম শামসুজ্জোহার ছেলে একেএম শামীম ওসমান দায়ী। অপরদিকে শামীম ওসমান বিএনপির এই দাবিকে অস্বীকার করছেন। বিএনপির ভাষ্য, এই জিয়া হল নিয়ে শামীম ওসমান সংসদে এবং নানা সময়ে বক্তব্য রেখেছেন। শামীম ওসমানও বলছেন, জিয়া হলের জায়গায় ‘ছয় দফা’ মঞ্চ করতে চান। তবে অবাক করা ইতিহাস হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করলে নারায়ণগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্টচর হিসেবে পরিচিত একেএম শামসুজ্জোহা  ছয় দফাকে সমর্থন করেননি।

 

বরং তিনি ওই সময় নবাবজাদা নসুরুল্লাহসহ আরও কতিপয় কেন্দ্রীয় নেতার সহযোগিতায় গঠিত হয়ে যেই পিডিপি, নারায়ণগঞ্জে সেটির শাখা গঠিত হলে শামসুজ্জোহা পিডিপিকে সমর্থন জানান। নারায়ণগহ্জ জেলা প্রশাসন এর পৃষ্ঠপোষকতায় ঐতিহ্যবাহী সুধীজন পাঠগার কর্তৃক প্রকাশিত ‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ বইয়ে ছয়দফা ঘোষণাকালীন সময়ে একেএম শামসুজ্জোহার অবস্থান স্পষ্ঠভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ বইয়ের ১৫০নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, ‘১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের পর থেকে ধীরে ধীরে দুই প্রদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে আসছিল। এসবের প্রতিকারের জন শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি পেশ করেন।

 

এ সময় তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তাঁর ছয় দফা অবশেষে পূর্ব পাকিস্তানে এক বিরাট আন্দোলনের জন্ম দেয়। এদিকে নবাবজাদা নসুরুল্লাহসহ আরও কতিপয় কেন্দ্রীয় নেতার সহযোগিতায় গঠিত হয়ে যেই পিডিপি। নারায়ণগঞ্জে এর শাখা গঠিত হলে শামসুজ্জোহা পিডিপিকে সমর্থন জানান। কিন্তু গোলাম মোর্শেদ ফারুকী, মোস্তফা সারোয়ার, আনছার আলী, আফজাল হোসেন, ড. নিয়ামতউল্লাহ, আনছার আলী, টি হোসেন, খাজা মহিউদ্দিন প্রমুখ ছয় দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। 

 

১৯৬৬ সালের প্রথম দিকে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মোস্তফা সারোয়ার শহর কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মহিউদ্দিন আহাম্মদ খোকা। মোস্তফা সারোয়ার সভাপতি থাকাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৮ মে চাষাঢ়া বালুর মাঠে এক জনসভায় ভাষণ দান করেন। এ সময় ৬টি সাদা কবুতর উড়িয়ে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান একদিকে শান্তির বাণী ঘোষণা করেন এবং অপরদিকে ছয় দফা আন্দোলনের সূচনা করেন।

 

কিন্তু সেদিনই তিনি গ্রেপ্তার হন। আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা দিবস পালনের আহ্বান জানালে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগ কর্মীদের মধ্যে এ দিবসের কর্মসূচিকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার প্রস্তুতি নেয়া হয়। ওই দিন সাধারণ ধর্মঘটও ঘোষণা করা হয়। সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়। এ দিবসের প্রস্তুতিলগ্নে প্রথমে শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি মোস্তফা সারোয়ার তার মাসদাইরের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হন।

 

মহিউদ্দিন খোকা ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক বজলু রহমানের বিরুদ্ধেও জারি করা হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পুলিশ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে মহিউদ্দিন খোকা ও বজলুর রহমান পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের বৎসরাধিকাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকতে হয়। এর মধ্যে মাত্র অল্প সময়ের জন্য মহিউদ্দিন খোকা ‘প্যারোলে’ মুক্তি পেয়েছিলেন। 

 

৭ জুনের সকালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, রাস্তায় লোকজনের প্রচণ্ড ভিড় ছিল। গোদনাইল মিল এলাকা থেকে হাজার হাজার শ্রমিক চলে আসে শহরে। মিছিলের পর মিছিল। সরকারি পক্ষ থেকেও এ দিবসের কর্মসূচি বানচাল করার চেষ্টায় নারায়ণগঞ্জের পুলিশকে সহায়তার জন্য ঢাকা থেকে আনা হয় শত শত রিজার্ভ পুলিশ। তারা অবস্থান নেয় শহরের বিভিন্ন মোড়ে। এতৎসত্ত্বেও ৭ জুনের হরতালের কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্য ছাত্রকর্মীরা জীবন পণ করে নেমে পড়ে।

 

ভোরবেলা দুই নম্বর রেলগেটে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল প্রায় এক’শ ছাত্রলীগ কর্মী। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মনিরুল ইসলাম, রিয়াজুল হক মিলকী, আব্দুল গফুর, আবদুল হাই, মাহবুব, তোফাজ্জল হোসেন, আহসানউল্লাহ প্রমুখ কর্মী। অল্পদূরেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগ অফিস। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্থানীয় নেতাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই তখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে। সভাপতি মোস্তফা সারোয়ার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাই ওইদিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আফজল হোসেন, গোলাম মোর্শেদ ফারুকী, ডা. নেয়ামতউল্লা, টি হোসেন প্রমুখ ব্যক্তি। 

 

‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ বইয়ের ১৫১নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ওই দিন সকাল সাড়ে ছয়টায় তখন একটি ট্রেন নারায়ণগঞ্জ স্টেশন থেকে ছাড়ত। দুই নম্বর রেলগেটের নিকট ছাত্র-জনতা প্রথম এ ট্রেনটিকে বাধা প্রদান করে। ফলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক দফা ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ির পর পুলিশ এখান থেকে আবদুল গফুর, রিয়াজুল হক মিল্কিসহ বহু লোককে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। অপরদিকে নিতাইগঞ্জের দিকে খাজা মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একদল কর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শণ করেন।

 

বিক্ষোভ চলাকালে খাজা মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসেন। এ সময় তার উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার জনতা থানা আক্রমন করতে জমাযেত হয়। জনতা থানায় ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করলে কয়েকজন পুলিশ আহত হয়। পলে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিবর্ষণের ফলে পরস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এরমধ্যেই আটক ব্যক্তিগণকে ঢাকা পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

 

থানা প্রাঙ্গণে জনতা মারমুখো হয়ে উঠেলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করতে করতে থানা থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। ছাত্রজনতা তখন সোহরাওয়ার্দী সড়কের দিকে চলে যায়। পুলিশ সোহরাওয়ার্দী সড়কে এসেও গুলিবর্ষন করতে থাকে। ফলে ফকিরটোলা মসজিদ ও রমমতউল্লাহ ক্লাবের সম্মুখে কয়েক ব্যক্তি প্রাণ হারান। আহত হয় কয়েক’শ লোক এবং অনেককে গ্রেফতারা করা হয়। পুলিশ সোহরাওয়ার্দী সড়কের চেম্বার কেবিন পর্যন্ত এসে পুনরায় থানার দিকে চলে যায়।

 

এ সময় হাসু সারোয়ারের নেতৃত্বে শহীদ কালীপদ ও শামসুল হরের লাশ নিয়ে কয়েক হাজার লোকের এক মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বঙ্গবন্ধু রোড, বাবুরাইল, পাইকপাড়া, দেওভোগ, মণ্ডলপাড়া ইত্যাদি রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। এ গুলিবর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে মুসলিম লীগ নেতা তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান সরকারের চিফ হুইপ এম এ জাহেরের বাড়ি আক্রমণ করে যথেষ্ঠ ক্ষতিসাধণ করেন। 

 

‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ বইয়ের ১৫২নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬৬ সালে শহর আওয়ামী লীগের মতো মহকুমা আওয়ামী লীগেও পরিবর্তন ঘটে। মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এবং বজলুর রহমান পিডিপিতে যোগ দেয়ায় তার স্থলে আওয়ামী লীগের পুরনো কমিটির সদস্য এবং ছয় দফার একনিষ্ঠ সমর্থক আনছার আলী সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ফজলুর রহমান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালের পূর্বে আফতাবউদ্দিন ভূইঞা কয়েক বছরের জন্য মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বলে জানা যায়। 

 

‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ বইয়ের ১৫৩নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬৮ সালে শামসুজ্জোহা পুনরায় আওয়ামী লীগে চলে আসেন এবং শহর শাখার সভাপতির পদ লাভ করেন। সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন আলী আহাম্মদ চুনকা। আলী আহাম্মদ চুনকা দেরিতে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। 

 

‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ বইয়ের ১৭৩নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের ৬ দফা দিবসে নারায়ণগঞ্জের ছাত্রসমাজের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই এই দিনটি এখানে ব্যাপকভাবে পালিত হয়। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এ আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী আন্দোলনের পর্যায়ে ছাত্রদের ঐতিহাসিক ১১ দফাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক গণআন্দোলনের সূচনা হলে নারায়ণগঞ্জের ছাত্রসমাজ দুর্বা আন্দোলন গড়ে তোলে।

 

এ সময় আইয়ুব খানের উন্নয়ন দশক পালনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ছাত্ররা যে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে তা ধীরে ধীরে স্বাধীনতাসংগ্রামে পরিণত হয়। ১৯৬৬-৬৭ এবং ১৯৬৭-৬৮ সালে তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদে ছাত্র ইউনিয়ন মেন গ্রুপের কেবিনেট নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৬৬-৬৭ সালে কুতুবুদ্দিন আকছির ও মমতাজ এবং ১৯৬৭-৬৮ সালে হানিফ কবির ও মাসুদ যথাক্রম সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এস.এ/জেসি 
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন