Logo
Logo
×

রাজনীতি

গর্জনে এগিয়ে অর্জনে পিছিয়ে

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪, ০৫:৩৬ পিএম

গর্জনে এগিয়ে অর্জনে পিছিয়ে
Swapno

 

 

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নারায়ণগঞ্জের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত পরিবার ওসমান পরিবার। আর সেই পরিবারের সন্তান আলোচনায়-সমালোচনায় সবসময়মুখোর থাকা এমপি শামীম ওসমান। তাঁর বাবা একেএম শামসুজ্জোহাও এমপি হয়েছেন। তাঁর বড় ভাই প্রয়াত নাসিম ওসমানও বেশ কয়েকবার এমপি হয়েছেন। আরেকভাই দানবীর হিসেবে খ্যাত সেলিম ওসমানও কয়েকবার এমপি হয়েছেন।

 

এতো অর্জনেও উজ্জ্বল রাজনীতিক হিসেবে শামীম ওসমানকে ভাবা হলেও যতখানি ভাবা হয়েছিলো সেই ততখানি সাফল্য আসেনি। ১৯৮১ সালে সরকারি তোলারাম কলেজের ভিপি হয়ে সর্বপ্রথম রাজনীতির মাঠে আলোচনায় আসে। তখন থেকেই বিতর্কিত নানাকান্ডের পরও ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন শামীম ওসমান। তৎকালীন ৫ বছরের সাংসদ থাকাকালীন মেয়াদের অতীতের সকল বদনামকে ছাপিয়ে রেকর্ড বদনাম অর্জন করেন।

 

সেই বদনামের একটি বড় সিল শামীম ওসমানের পিঠে এঁেট যায়। যা এখন অবধি মুছতে পারেননি তিনি। তাই অনেক অর্জন সামনে এসেও ধরতে পারেননি। শামীম ওসমান ২০০১ সালে দেশ ছাড়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেও এমপি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সুযোগ পাননি তিনি। প্রয়াত বিখ্যাত অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী শামীম ওসমানের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এমপি হন। রাজনীতিক থাকলেও চেয়ারম্যান না থাকায় শামীম ওসমান নানা নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হন।

 

একদিকে সারাহ বেগম কবরীর সাথে আগ্রাসী ও শত্রুতাপূর্ণ ঝগড়া, অন্যদিকে ভাড়া বাড়ানো নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বর্তমান মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে ঘুষি মারার বিষয়টি সারাদেশে আলোচনায় আসলে একেবারেই ব্যাকফুটে চলে যান। এতো কিছুর মধ্যেও ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন গঠনের পর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েও রাজনীতিতে নবীন নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র চুনকা কন্যা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে হেরে যান।

 

তবে এই হেরে যাওয়ার আগে আবারো আগ্রাসী ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য ইতিমধ্যে শামীম ওসমানের নামের পাশে ‘গডফাদার’ শব্দটি সিল আকারে লেগে যায়। যেটি আজো ঘুচাতে পারেননি তিনি। শামীম ওসমানের সাথে টেলিভিশন টকশোতে গিয়ে মারামারি, আইভীর প্রতি উগ্র অশ্লীল মন্তব্যে সারাদেশে শামীম ওসমান নেতিবাচক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান।

 

পরবর্তীতে ২০১৩ সালে মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যা এবং ২০১৪ সালে আলোচিত সেভেন মার্ডার কান্ডেও শামীম ওসমান ও তার পরিবারের নাম বারবার আসায় শামীম ওসমানের কুখ্যাতি সারাদেশে ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে এমপি হিসেবে শামীম ওসমান চেয়ার দখল করতে পারলেও অতীতের সেই কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাপক সমালোচিতই থেকে যান।

 

এরপরেও ২০১৬ সালে আবারও সিটি নির্বাচনের আগে মেয়র আইভীকে বক্তব্যে আক্রমন, ২০১৮ সালে হকার ইস্যুতে মেয়র আইভীর উপর হামলার ঘটনার নেপথ্যে তাকে দায়ী করা সর্বশেষ ২০২২ সালের সিটি নির্বাচনে আবারো আইভীর বিরোধিতা এবং নেতিবাচক ব্যক্তব্যের দরুণ শামীম ওসমান তার পুরনো ‘গডফাদার’ খেতাবটি সরাতে পারেনি। তবে এরমধ্যে ‘খেলা হবে’ ডায়লগ দিয়ে তিনি দেশ ও দেশের বাইরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পান। এমনকি একেকসময় তাঁর নামাজ আদায়ের বিভিন্ন রাকাতের বর্ণনা সারাদেশে হাস্যরস তৈরি করে।

 

এতোসব গর্জনে শামীম ওসমানের মন্ত্রীত্ব, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রী পদের স্বাদ ও গন্ধ পাননি। এসব না পাওয়ার বেদনা থেকেই নানা সময় বলেছিলেন তাকে মন্ত্রীত্ব সাধা হয়েছিল তিনি নেননি। এমনকি একসময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদেরও স্বপ্ন দেখেছিলেন। শামীম ওসমান পিছিয়ে গেলেন নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য রাজনীতিকদের তুলনায়। যে আইভীকে নিয়ে সবসময় সমালোচনায় মুখর ছিলেন শামীম ওসমান সেই আইভী তিনতিনবার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা পেয়েছেন।

 

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ, রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতিক)  মন্ত্রীত্বের সাধ পেয়েছেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী হিসেবে গোটা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু এবার প্রতিমন্ত্রী পদপর্যাদায় জাতীয় সংসদের হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানে শামীম ওসমানে এক্ষেত্রে অর্জন তাদের থেকে ঢের দূরে। প্রায় ৪৫ বছরের রাজনীতিক জীবনে এতো গর্জন হাকঢাক ঝেড়েও মন্ত্রী পরিষদের কোন অংশে ঠাঁই পাননি।

 

রাজনীতিক বিশ্লেষকরা বলেন, শামীম ওসমানের নেতিবাচক অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে সামনের দিনেও এই অর্জন হওয়ার সম্ভাবান ক্ষীণ। যতবারই নতুনভাবে মন্ত্রী পরিষদ গঠন হচ্ছিল, শামীম ওসমান সেখানে ঠাঁই নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড ও নীতিনির্ধারকরা শামীম ওসমানকে ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান হিসেবে সাংসদ হওয়ার সুযোগ দিলেও আস্থাভাজন হিসেবে কখনোই মন্ত্রীপরিষদে ঠাঁই দেননি। কেননা তারা শামীম ওসমানের বেফাঁস মন্তব্য, তার নির্বাচনী এলাকার মাঠের উন্নয়ন চিত্রের কথা জানেন।

 

আওয়ামী লীগ ১৫ বছরের ক্ষমতায় থাকার পরও পুরো নারায়ণগঞ্জের সবচাইতে অবহেলিত এলাকা শামীম ওসমানের ফতুল্লা এলাকা। এটি নিয়েও বর্ষা মৌসুমে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ,কষ্ট আর দুর্ভোগের চিত্র ফলাও করে গণমাধ্যমে উঠে আসে।

 

আর একারণেই আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছেন শামীম ওসমানের ফাঁকা গর্জনের উদ্দেশ্য, আর তাই তারা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতিক) ও সর্বশেষ নজরুল ইসলাম বাবুকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা দিয়ে অলঙ্কিত করলেও শামীম ওসমানের ক্ষেত্রে এই অলঙ্করণ করেননি। গর্জনে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের এই তিন নেতার চেয়ে শামীম ওসমান এগিয়ে থাকলেও অর্জনে এদের তিনজনে চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছেন শামীম ওসমান।  

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন