যেসব কারণে কালামেই ভরসা রাখলো বিএনপি
# তিনি বেগম খালেদা জিয়ার বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলেন বলে অভিমত
# তার জনপ্রতিনিধিত্বেই শহর-বন্দরের বড় বড় উন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি
# তিনবার দায়িত্ব পেয়েও সম্পদ বৃদ্ধি না করে বিক্রি করতে হয়েছে তাকে
অবশেষে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির চুড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে আবারও বেছে নেওয়া হয়েছে। এর আগেও বিএনপি সমর্থন নিয়ে এই আসন থেকে বেগম খালেদা জিয়ার (সদ্য প্রয়াত) অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন হিসেবে আবুল কালাম তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এরই মধ্যে এই আসন থেকে যারা শুরু থেকেই বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে আবুল কালামকে মেনে নিয়ে তারা তাদের সমর্থকদের মার্কা হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকের জন্য কাজ করতে মাঠে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে বিএনপির প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনায়ন পাওয়া মাসুদুজ্জামান মাসুদসহ অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সমর্থকরাও তাদের প্রিয় নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবুল কালামের পক্ষে মাঠে কাজ করা শুরু করে দিয়েছেন। যার ফলে এই আসন থেকে আবুল কালামের জয়ের পথ আরও সুগম হবে বলে স্থানীয় বিএনপি নেতা, কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের ধারণা। একই সাথে এই আসন থেকে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির প্রবীণ নেতা হিসেবে মহানগর বিএনপি এক সময়ের কান্ডারী হিসেবে আবুল কালামকে মনোনীত করায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপির মনোনয়নে নবীন-প্রবীণের সংমিশ্রণ ঘটেছে।
গতকাল শনিবার জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এর ঘোষণা অনুযায়ী এই আসনের ১২টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে আটটি বৈধ এবং চারটি বাতিল করা হয়। একই সাথে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির প্রমাণ দাখির করায় অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে এই আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ঘোঘণা করেন তিনি।
এই আসনে তিনি ক্লীনম্যান হিসেবে পরিচিত। এখানকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করার পর আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। অথচ একমাত্র আবুল কালামকেই দেখা গেছে, যিনি নির্বাচন করে তিনবার জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও তার পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে সম্পত্তি কমাতে বাধ্য হয়েছেন। সে সময় দল হিসেবে বিএনপির নাম ব্যবহার করে অনেকেই অঢেল টাকার মালিক হলেও আবুল কালাম সে পথে হাটেননি। তাই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবুল কালামের বিজয়ের বিষয়ে আশাবাদী তার সমর্থকরা।
পারিবারিকভাবেই বিএনপির রাজনীতি করা আবুল কালামের পিতা হাজী জালাল উদ্দিন (প্রয়াত) ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জিয়াউর রহমানের সমর্থন নিয়ে ঢাকা-৩২ নং আসন (যা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-৫) সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
এরপর এরশাদ সরকারের দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাশাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন আপসহীন নেত্রী টাইটেল পাওয়া বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে তখন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম তার পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে ধানের শীষ মার্কার প্রতিনিধিত্ব করে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
এর আগে বিভিন্ন সময় প্রতিপক্ষ দলের বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিসহ অনেক কর্মী সমর্থকই বন্দর জুড়ে একটি কথা প্রচার করে বেড়াতেন যে আবুল কালাম নির্বাচিত হওয়ার পর শহর ও বন্দরে কোন প্রকার উন্নয়ন হয়নি। তবে আবুল কালামের পরিবার ও স্থানীয় সমর্থকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, আবুল কালাম সংসদ সদস্য থাকার সময় এসব এলাকায় যেসব উন্নয়ন কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে তার সিকিভাগও উন্নয়নও অন্যান্য সরকারের সময় হয়নি।
তাদের মতে, বন্দরের মদনপুর-মদনগঞ্জ সড়ক হতে রেল লাইন উঠিয়ে নেওয়ার পর সড়কটি যখন বছরের পর বছর অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল, এই আবুল কালাম এমপি হওয়ার পরই দীর্ঘ এই সড়কটি গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত করে বন্দরবাসীর জন্য একটি সড়ক পথের ব্যবস্থা করেছিল। বন্দরবাসীকে যখন সাধারণ কোন অসুস্থার জন্যও নদী পার হয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে নারায়ণগঞ্জে আসতে হতো তখন একটি হাসপাতালের নির্মাণের উদ্যেগ নেন, যা বর্তমানে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স নামে পরিচিত।
বন্দরের উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য যখন কোন কলেজের ব্যবস্থা ছিল না, তখন তার উদ্যোগেই বন্দরে একটি মানসম্মত কলেজ নির্মাণ করা হয়, যা কদম রসুল কলেজ নামে পরিচিত। বন্দরের পৌর এলাকার উন্নয়ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য যখন কোন আঞ্চলিক কার্যালয় ছিল না, তখন তার নেতৃত্বেই কদম রসুল পৌরসভা নির্মাণ করা হয়। তার প্রায় ১০ বছরের নেতৃত্বকালে হওয়া এসব উন্নয়ন কখনও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই বলেও তার সমর্থকদের দাবি।
অন্যদিকে শহর জুড়েও ছিল তার নেতৃত্বে উন্নয়নের ছোঁয়া। তার নেতৃত্ব থাকাকালীন সময় নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের নতুন ভবনের (বর্তমান ভবন) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। হাসপাতালের জন্য এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার (বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন) জন্য বিশেষ বরাদ্দ (তৎকালীন সময়ে ৫ কোটি টাকা)’র ব্যবস্থা করা হয়। নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের মাটি ভরাট করা দেয়াল নির্মাণ করা,
ছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হয়। ওনার পিতা সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময় নারায়ণগঞ্জ খানপুর হাসপাতালের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং জায়গা দখল করা হয়। নারায়ণগঞ্জ কলেজ, শহরের গণবিদ্যা নিকেতন, নারায়ণগঞ্জ বাস টার্মিনাল ও শহীদ জিয়া হল প্রতিষ্ঠা করা, এগুলো সব কিছুই শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে তার পিতা সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময় হয়েছিল।
স্থানীয় বিএনপিসহ কালাম সমর্থকদের দাবি অ্যাডভোকেট আবুল কালামের সময় শহর ও বন্দরবাসীর জন্য স্বর্ণযুগ ছিল। অন্যান্য সরকার উন্নয়নের যে দাবি করেন, আবুল কালামের উন্নয়নের তুলনায় তা কিছুই না। তার ব্যক্তি ইমেজ, উন্নয়ন ও বেগম খালেদা জিয়ার একজন বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে ভূমিকা রাখার অবদানের কারণে এই আসন থেকে শেষ মুহুর্তে আবুল কালামকেই বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এই আসনে আবুল কালাম দলীয় মনোনয়ন পাওয়াসহ মনোনয়নের বৈধতা পাওয়ায় এলাকায় বিএনপি সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ অনেক গুন বেড়ে গেছে বলে তাদের বিশ্বাস।


