গোপন ভোট ‘ফ্যাক্টর’
নারায়ণগঞ্জের সাংসদীয় ৫টি আসনের নির্বাচনী মাঠে যেমন উত্তেজনা, উৎকন্ঠাসহ কিছু জায়গায় শান্ত পরিবেশ বিরাজমান। এদিকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে ও নেই উত্তেজক শ্লোগান, নেই শক্তির মহড়া বা চোখে পড়ার মতো জনসভার ঢল। অথচ এই নীরবতার আড়ালেই তৈরি হচ্ছে এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা। এখানে বিপ্লবের ভাষা উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং নীরব ব্যালটই হয়ে উঠছে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। শীতল এই নির্বাচনী সমীকরণে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা, যারা কথা কম বলেন কিন্তু ভোটের দিনে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন।
যাকে ঘিরে এবারের ভোটের মাঠে ‘ফ্যাক্টর’ গোপন ভোট। এই নীরব ভোটের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের ভোটাররা খুঁজছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও আকাঙ্খার প্রতিফলন। তা ছাড়া এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটাররা যেমন ফ্যাক্টার, তেমনি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেন একাধিক তরুণ ভোটার। যাকে ঘিরে এবার ক্ষমতার চাবি এবারে এই তরুণদের হাতেই। তাই তরুণ ভোটারের চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ভাবনা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচনি প্রচারে অগ্রাধিকার পাচ্ছে তারুণ্যের চাওয়া-পাওয়া।
তারুণ্যের ভোট টানতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। তা ছাড়া গত ৫ আগষ্টের পরবর্তী সময়ে বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। যাকে ঘিরে বিএনপির সেই একাধিক অপকর্মকারীরা বিএনপিতে থাকায় ক্লিন ইমেজের প্রার্থীরা ও বর্তমানে করছে বিএনপির বিরোধীতা। তা ছাড়া নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে ৫ জন প্রার্থী বিদ্রোহ করছেন। যাকে ঘিরে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা বেকায়দায়। তা ছাড়া বর্তমানে নির্বাচনী মাঠে বিএনপির মনোনীত, বিএনপির বিদ্রোহী, ১০ দলীয় জোটের ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া এবারের স্বাধীন বাংলাদেশে উন্মুক্ত ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহনের ক্ষেত্রে এবার গোপন ভোটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৯২ হাজার ৩৭০ জন। কিন্তু জরিপ অনুযায়ী অর্ধেক ভোট পড়বে কিনা সেটা দেখার বিষয়।
সূত্র বলছে, আগামী (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তাই অন্যরকম। বছরের পর বছর ধরে সহিংসতা, দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক জুলুমে ক্লান্ত এই জনপদের মানুষ এবার পরিবর্তনের পথ খুঁজছে শান্ত অথচ দৃঢ় সিদ্ধান্তে। স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার ৫টি সাংসদীয় আসনে সারা দেশের থেকে ব্যতিক্রমী চিত্র উঠে আসছে। উত্তেজনাপূর্ণ শোডাউন, বিশাল জনসভা কিংবা মুখোমুখি বাকযুদ্ধ এখানে খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-২ আড়াইহাজারে জামায়াত-বিদ্রোহী প্রার্থী ও বিএনপির মনোনীতদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ লক্ষ্য করা গেলে ও দীর্ঘ ১৭ বছর পর হতে যাওয়া নির্বাচন হলে ও মাঠে নেই নির্বাচনী জমজমাট আমেজ।
নির্বাচনী মাঠ শান্ত, তবে এই শীতলক্ষ্যার ভেতরেই জমে আছে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সমীকরণ। এদিকে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. দুলাল জাহাজ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এছাড়া বিএনপির মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু ধানের শীষ। বর্তমানে সেই আসনে মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করলেও সেই আসনের ভোটাররা নৌকা বা ধানের শীষের চরিত্র ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছেন। তা ছাড়া গত ৫ আগষ্টের পূর্বে এবং পরবর্তীতে দুটি বড় দলের চরিত্র দেখে ফেলায় বর্তমানে যোগ্যতা যাচাই বাছাইসহ প্রার্থীদের আমলনামায় ভোট দিবে ভোটাররা।
যাকে ঘিরে বর্তমানে এই আসনে গোপন ভোটের ফ্যাক্টর। নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সাংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর কলস প্রতীকে নির্বাচন করবেন। অন্যদিকে বিএনপির নজরুল ইসলাম আজাদ ধানের শীষ সেই আসনে আজাদ ও আঙ্গুরের লড়াইয়ের আশঙ্কা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে এই আসনে প্রকাশ্যে আসছে না কার যোগ্যতা বেশি। বর্তমানে এই আসনে ভোটের মাঠ চাঙা বললেই চলে। কিন্তু নীরবতা অনেকটাই বেশি। নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ফুটবল ও রেজাউল করিম ঘোড়া প্রতীকে লড়বেন। এছাড়া বিএনপির আজহারুল ইসলাম মান্নান ধানের শীষ।
বর্তমানে এই আসনের দায়িত্ব কার হাতে উঠে সেটাই দেখার বিষয়। বর্তমানে এই আসনে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান বিভ্রান্তে রয়েছে। ভোটাররা খুঁজছে শিক্ষিত এবং হেভিওয়েট ও ক্লিন ইমেজের আমলনামাকারী। তা ছাড়া স্বতন্ত্র দাপটে প্রভাব এই আসনে। কিন্তু নীরব ভোট কার ভাগ্য চমকে উঠে সেটা নিয়ে উঠছে আলোচনা। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামীলীগের ভোটারদের পাশে টানতে কৌশলে অনেক প্রার্থীই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। যদি আওয়ামীলীগ সমর্থকরা ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তাহলে এই আসনটিতে ভোটের হিসাব নিকেষ অনেকটা পাল্টে যেতে পারেন বলেও মনে করছেন বিশ্লেষক মহল।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন গিয়াস উদ্দিন ও শাহ আলমসহ অনেকেই। দল উল্লেখিত দুজনকে মনোনয়ন দেননি। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্¦তন্ত্র থেকে উল্লেখিত দুজন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এই দুইজন তাদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে এক সময়ের বিএনপির সাবেক সাংসদও বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি তাকেও মনোনয়ন দেননি। এবার মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
বিএনপি তার শরীক দলের প্রার্থী মনির হোসেন কাশেীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। পদ পদবীধারী নেতারা দলের কমান্ড মেনে মনির হোসেন কাশেমীর বিভিন্ন সভা সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। তবে তৃনমূলে এখনো আশংকায় রয়েছে। সূত্র মতে,ভোটাররা এখনো ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করতে পারেননি। বিএনপির ভোট তিনভাগে বিভক্ত হওয়ার আশংকা করছেন, সেখানে রিপাবলিকান পার্টির মোহাম্মদ আলী ও জামায়াত সমর্থিত আব্দুল্লাহ আল আমিনের রয়েছে রিজার্ভ ভোট ব্যাংক। রিজার্ভ ভোটের সাথে আরো কিছু ভোট সংযুক্ত হলে সেক্ষেত্রে মোহাম্মদ আলী ও আব্দুল্লাহ আল আমিনের সেক্ষেত্রে বড় সুয়োগ আসতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।
সূত্রের দাবী,এই আসনটিতে যে প্রার্থীই জয়ী হবেন তিনি অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে জয়যুক্ত হবেন। সাধারণ ভোটারদের সাথে যে প্রার্থী বেশি মিশতে পারবেন জয়ের পাল্লা সেদিকেই যাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। জটিল সমিকরনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে চিন্তার ভাঁস রয়েছে প্রতিটি প্রার্থীরই। তবে শেষ পর্যন্ত কে হাসবেন বিজয়রে হাসি তা নিয়ে উঠছে আলোচনা। বর্তমানে এই আসন ঘিরে রয়েছে নানা বিভ্রান্ত। এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে শুরুতে নাটকীয়তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটি আস্থা রেখেছে পরীক্ষিত ও বিতর্কহীন একজন প্রার্থীর ওপর। তিনবারের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
অপরদিকে ১০ দলীয় ঐক্যজোটও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও শান্ত ভাবমূর্তিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবিএম সিরাজুল মামুন দেয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পেশায় তিনি একজন ইংরেজি শিক্ষক এবং ছাত্রসমাজে একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই আসনের মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ধানের শীষ প্রতীকের অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও দেয়াল ঘড়ি প্রতীকের সিরাজুল মামুনের মধ্যেই।
তা ছাড়া ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনও নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এ ধরনের নীরব ভোটারের সংখ্যা রয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি। প্রার্থীদের মতে, এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বড় শোডাউনের বদলে গণসংযোগকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীদের বলয় বাড়ানোর চেয়ে সরাসরি ভোটারের দরজায় পৌঁছানোই যে এখানে চূড়ান্ত বিজয়ের চাবিকাঠি, সে ধারণাই শক্ত হচ্ছে প্রতিটি শিবিরে। বর্তমানে কে হবে কঠিন নির্বাচনের গোপন ভোটে এমপি সেটা নিয়েই ভোটারদের গভীর ভাবনা।


