পুলিশের অস্ত্র লুট, নিরাপত্তা নিয়ে নগরবাসীর উদ্বেগ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
পুলিশের অস্ত্র লুট, নিরাপত্তা নিয়ে নগরবাসীর উদ্বেগ
# দুষ্কৃতিকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে : নাসিক প্রশাসক
# কঠোর হস্তে দমন করতে হবে : আব্দুল জব্বার
# সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন : রফিউর রাব্বি
গতকাল ভোরে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে এক পুলিশ সদস্য ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। এ সময় ছিনতাইকারীরা তার কাছে থাকা সরকারি পিস্তলও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এই ঘটনা সারা বাংলাদেশে ভাইরাল হয়েছে। এতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দেশে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। মাথা চারা দিয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ শহরের ছিনতাইকারীরা। তারা মানুষকে জিম্মি করে, অস্ত্র ঠেকিয়ে, গুলি করে অথবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। তাদের থেকে পুলিশ প্রশাসনের লোকও মাপ পাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ডিউটিতে থাকা পুলিশের পোষাক পরা অবস্থায় ছিনতাইকারীর শিকার হয়ে পিস্তল লুট হয়েছে। যা নিয়ে নগরবাসির মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। মনে তৈরি হয়েছে চাপা আতঙ্ক। এই আতঙ্ক নারায়ণগঞ্জের নগরবাসীর মাঝেও প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া সচেতন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে পুলিশ নিজেদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে মানুষের নিরাপত্তা দিবে কি করে। তাছাড়া রমজান মাসে ঈদকে ঘিরে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়েছে। তাদের অপরাধের লাগাম না টানলে এই কয়দিনের পুলিশের সাথে মানুষকে তার খেসারত দিতে হতে পারে। এব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে নগরীর প্রায় সব মানুষই ভয়াবহ অবক্ষয় নিয়ে শঙ্কিত-সংক্ষুব্ধ। অপরাধীরা ধরা পড়লেও নানাভাবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যায়। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু সকলেরই কথা প্রশাসনকে সিরিয়াস ভাবে দায়িত্ব নিয়ে অপরাধীদের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
অপরদিকে প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২৪ জুলাই আন্দোলনের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। রাজধানী লাগোয়া এই গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ জেলাটিতে গত ২০২৫ সনে ৭৩টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সেই সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০২৪ সনের আগস্ট মাস থেকে ২০২৫ সনের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সর্বমোট ৭৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ৫২টি চুরি, ১৩টি ডাকাতি, ৩১টি ছিনতাই এবং ২৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরবতায়, শহরের প্রতিটি এলাকায় লাগামহীন চুরি, ছিন্তাইয়ের ঘটনায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নগরবাসি। দলমত নির্বিশেষে নগরীর প্রায় সব মানুষই এই ভয়াবহ অবক্ষয় ও এর পাশবিকতার বিস্তার নিয়ে শঙ্কিত-সংক্ষুব্ধ।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এডভোকেট সাখায়াত হোসেন খান বলেন, পুলিশের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের শিকার ঘটনাটি প্রশাসন গুরুত্ব সহকার নিয়েছে। আমরা আশা করি দুষ্কৃতিকারীরা অতি শীঘ্রই আইনের আওতায় আসবে। তাছাড়া প্রশাসন নগরবাসীকে নিরপাত্তা দিয়ে মানুষের মাঝে স্বস্তি তৈরী করার কাজটি করবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ শহর পুরো জেলায় জিরো টলারেন্স হিসেবে ভুমিকা পালন করবে আমি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মনে করি।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আব্দুল জব্বার বলেন, যেখানে পুলিশ অস্ত্র থাকাবস্থায় নিজেকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে জনগণের নিরাপত্তা দিবে কি করে। আমরাও এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন। প্রশাসনকে আমরা আহবান জানাচ্ছি, ঈদের আগ পর্যন্ত সময়টা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। প্রশাসনকে সিরিয়াসলিভাবে সন্ত্রাসী বাহিনী, ছিনতাইকারীদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। অন্যতায় মানুষ মার্কেটে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে ফিরে যাবে। এতে প্রশাসনের ব্যর্থতার চিত্র মানুষের সামনে প্রকাশ পাবে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহরের ১৫টি স্পট রয়েছে যে জায়গাগুলোতে ভোর বেলায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়, এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। পুলিশ এ পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। আজকে পুলিশ নিজেই এই ঘটনার আক্রান্ত। যার ফলে ঈদকে ঘিরে ছিনতাইকারী চক্র বেপরোয়া হয়ে রয়েছে। নগরবাসীতো জিম্মি অবস্থায় রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। তারা বিভিন্ন কথা বলে যার কথা বাস্তবায়ন নেই। গতকালকের ছিনতাইয়ের ঘটনা মানুষের মাঝে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরী হয়েছে। পুলিশ যেখানে নিরাপদ না, সেখানে আমরা কিভাবে নিরাপদে থাকবো। প্রশাসনের অন্যান্য বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে অনেক দিন ধরেই ছিনতাই ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। এ বিষয়ে আমরা পুলিশ সুপারকে জানিয়েছি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শহরের কিছু নির্দিষ্ট স্থানেই বারবার ছিনতাই হচ্ছে, অথচ সেখানে পুলিশের টহল তেমন দেখা যায় না। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘যখন মানুষ সঠিক বিচার পায় না, তখন তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। ছিনতাই কিংবা কাউকে পিটিয়ে হত্যা—কোনোটিই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।’ ছিনতাইয়ের মামলা গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, “অনেক সময় পুলিশ ছিনতাই, চুরি বা ডাকাতির মামলা নিতে চায় না। ফলে ভুক্তভোগীরা থানায় যেতে নিরুৎসাহিত হন এবং হয়রানির ভয়ে অভিযোগও করেন না।’
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) তাসমিন আক্তার বলেন, ‘জেলায় ছিনতাই ও অপরাধ দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে। শহরের জিমখানা, নগর ভবন ও নিতাইগঞ্জ এলাকায় ছিনতাই কমাতে রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত টহল দেওয়া হচ্ছিল। ডিউটি শেষে ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় ওই পুলিশ সদস্যের ওপর এই ঘটনা ঘটে।’ তিনি আরও বলেন, “ছিনতাই রোধে টহল আরও বাড়ানো হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’


