মুক্তারপুর-পঞ্চবটি দ্বিতল সড়ক ধীরগতির কাজে ভোগান্তিতে মানুষ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
মুক্তারপুর-পঞ্চবটি দ্বিতল সড়ক ধীরগতির কাজে ভোগান্তিতে মানুষ
# ভোগান্তির দ্রুত লাগব চান শিল্প মালিকসহ স্থানীয়রা
ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কে নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি দীর্ঘ তিন যুগেও। বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে যেতে হয়। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে মুুন্সিগঞ্জ যেতে পাগলা-পঞ্চবটি মুক্তারপুর সড়ক দিয়ে দীর্ঘ দিন চলাচল করে আসছে। এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা বেসিক শিল্প এলাকায় পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত প্রায় হাজার খানিক গার্মেন্টস থেকে শুরু করে শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মাঝে বিসিক শিল্প এলাকায় প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক কাজ করে। বছর তিনেক যাবত পঞ্চবটি থেকে মুক্তার সড়কের সংস্কার এবং দ্বিতল সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু কচ্ছপ গতিতে কাজ চলায় এ সড়কে যাতায়াতে যানজটে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমনকি বিসিক শিল্প এলাকার মালিকরা তাদের শিপমেন্ট সঠিক সময়ে যেতে পারছে না। এজন্য শ্রমিকরা ঠিকমত বেতন ভাতা পাচ্ছে না। বৃষ্টি আসলে কোথাও গর্ত কোথাও সমান সড়ক তা বুঝা যায় না। আর এতে করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের চরম মাশুল দিতে হচ্ছে। এছাড়া ফ্যক্টরীতে সঠিক সময়ে পৌছাতে পারে না। একই সাথে এই কষ্ট যেন শ্রমিকদের এখন নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে রয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ দিনের মুন্সীগঞ্জ জেলার বাসিন্দাদের দাবী পুরন হতে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তা নারায়ণগঞ্জ বাসির জন্য যেন অভিশাপে পরিনত হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের সাথে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মুক্তারপুর হতে পঞ্চবটি পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ এবং এলিবেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (উড়াল সড়ক) নির্মাণ কাজ চলছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ১০ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়ক এখন ফতুল্লা বাসি তথা প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বিষ হয়ে দাড়িয়েছে। কেননা পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত সড়কটিতে কাজ চলমান থাকায় গাড়ি চলাচল করা যাচ্ছে না । আর এতে করে প্রতিদিন দূর্ঘটনা ঘটছে। দ্বিতল সড়কে চলছে ডেক্সস্ল্যাাব বসানোর কাজ। নীচে চলছে রাস্তা প্রশস্ত করণ কাজ। কিন্তু নিচের সড়কে কোন জায়গা ভালো ভাবে চলাচলের ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রকল্প পরিচালকের তথ্যমতে এই সড়কটিতে প্রায় ৩ হাজার ৩’শ কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তারপুর - পঞ্চবটি সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতালাকরণের কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু নিয়ম রয়েছে এই ধরনের বড় প্রকল্প কাজ করা আগে মানুষের যেন ভোগান্তি পোহাতে না হয়ে সে জন্য চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে এখানে সেই ব্যবস্থা রেখেই কাজ করে যাচ্ছে প্রকল্পটির পরিচালক।
অরদিকে সরেজমিনে কথা বলে জানাযায়, নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা বিসিক শিল্প এলাকায় প্রায় ৭শ’টির বেশি গার্মেন্টস শিল্প রয়েছে। এছাড়া বিসিক থেকে মুক্তাপুর পর্যন্ত প্রায় ৩শ’ শিল্প প্রতিষ্ঠ গড়ে উঠেছে। আর এই সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৪ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। মুক্তারপুরে ৫টি সিমেন্ট কারখানা সহ ৬টি হিমাগার থাকায় মুক্তারপুর - পঞ্চবটি সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জের বিসিক এলাকায় সকাল বিকাল প্রতিদিন কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করে।
তথ্যমতে, ২০২৬ সনের জুনের মধ্যে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করে যানচলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি এই সময়ে ৮০% কাজ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ হতে এই বছরের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে বলে জানান কর্তৃপক্ষ । প্রকল্পটির বাস্তবায়নে প্রথমে ধাপে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৬শ’৫৯ কোটি টাকা । তখন ২০২৫ সনের ৩০ জুনে নির্মাণকাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ ছিল। বর্তমানে সেতু কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করে। নির্মান কাজ শেষ হলে খুলে যাবে যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।লাঘব হবে মুন্সীগঞ্জ বাসীর দীর্ঘদিনের যানজট জনিত সীমাহনি দুর্ভোগ আর ভোগান্তি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সমাপ্তের জন্য দ্বিতল সড়কের ডেক্সস্লাব বসানো , রাস্তা প্রশস্ত করণ এবং ড্রেন নির্মান কাজ কচ্ছপ গতিতে চলছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ১০ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মুক্তারপুর - পঞ্চবটি সড়কে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৭ কিলোমিটার অ্যাটগ্রেড সড়ক দুই লেন এবং ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার অ্যাটগ্রেড সড়ক ৪ লেনে উন্নীত করা হবে। পঞ্চবটি থেকে শীতলক্ষ্যা -৩ সেতু পর্যন্ত ২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৬ টি র্যাম সহ দুই লেন বিশিষ্ট ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার হচ্ছে এলিবেটেড এক্সপ্র্র্র্র্র্র্র্র্রেসওয়ে (দোতালা সড়ক)। এর মধ্যে পঞ্চবটি থেকে কাশিপুর পর্যন্ত ৩.৫ কিলোমিটার এ্যাট -গ্রেড সড়কের উপর এবং কাশিপুর থেকে চর সৈয়দপুর পর্যন্ত ২.৭৬ কিলোমিটার নীচু ভুমির উপর দিয়ে যাবে। এছাড়া যানজট নিরসনে পঞ্চবটি মোড় থেকে ফতুল্লার দিকে ও নারায়ণগঞ্জের চাষারার দিকে ৩ শত ১০ মিটার করে ৬ লেন সড়ক নির্মান করা হবে। মুক্তারপুর সেতুর দক্ষিণপ্রান্তে ৪৪৩ মিটার এ্যাডগ্রেড সড়ক ৪ লেনে উন্নীত করা হবে। চর সৈয়দপুরে ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু পয়েন্টে একটি গোলচত্তর থাকবে। নিচে উপরে ২ টি করে ৪টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে এবং যানবাহনের ওজন পরিমাপের জন্য থাকবে ৬টি ওজন ষ্টেশন। নিচতলায় যানচলাচলের জন্য ফ্রি থাকলেও দোতালা সড়কে যাতায়াতে টোল পরিশোধ করতে হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখার সিনিয়র সহকারি সচিব রেনু দাস বলেন, ২০২৬ সনের জুন মাসে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সড়ক ও সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ বিসিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিকেএমইএ সহ সভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, এই কাজের যেই ধীরগতি এবং অগাছোল কাজ তাতে সময় অটোমেটিকেলি বেশি রাগবে। তাদের ধীর গতি কাজ কচ্ছপকেও হার মানাবে মনে হয়। রাস্তা ঘাটে মানুষকে দুর্ভোগ দেয়ার অধিকার নেই কর্তৃপক্ষের। এই ধরনের বড় প্রকল্পের কাজ হলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় মানুষের চলাচলে যেন কোন অসুবিধা না হয়। কিন্তু সেটাকে কোন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। মানুষ জনকে কষ্ট দিয়ে কাজ করলে সেটা কতটুকু ফলপ্রসু হয় তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা চাই নিরাপদকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষের চলাচলে ব্যবস্থা করে দেয়া হোক। যাতে মালিক শ্রমিকরা নিরাপদে তাদের কর্মস্থলে যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরীর রাস্তাঘাটের বেহাল দশা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা বর্তমানে রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যানজট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি নারায়ণগঞ্জের সড়কগুলোতে যানজট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিসিক শিল্পনগরী ঘেঁষে পঞ্চবটি-মুক্তারপুর ৬ লেন সড়কের নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে যানজট আরও বেড়েছে। আমাদের কথা হচ্ছে নিরাপদকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষের চলাচলে ব্যবস্থা করে দেয়া হোক। যাতে মালিক শ্রমিকরা নিরাপদে তাদের কর্মস্থলে যেতে পারে।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য নেয়ার জন্য পঞ্চবটি মুক্তারপুর ফ্লাই ওভার ও সড়ক সংস্কার প্রকল্পের পরিচালকের সাথে যোগযোগ করতে কাশিপুর প্রধান কার্যালয়ে গেলে গেটে দায়িত্বে থাকা সাব্বির ও অপূর্ব জানান ভিতরে প্রবেশ নিষেধ। এখানকার কোন ভিডিও বা কারো সাথে কথা বলা যাবে না। এমনকি সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ( অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান , প্রায় ৩৩’শ কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তারপুর - পঞ্চবটি সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতালাকরণের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে সমাপ্ত করার জন্য কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান স্যানডং লুকিয়াও গ্রুপ ও চায়না স্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক এন্ড টেকনিক্রার কো - অপারেশন গ্রুপ ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করবে। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। নারায়নগঞ্জ অংশের গোপচর এলাকায় অধিগ্রহনের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সেখানে কাজের গতি কম রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ৩০ জুনের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য সড়কটি খুলে দেওয়া যাবে।


