Logo
Logo
×

রাজনীতি

বিএনপিতে চলছে ‘দাবা খেলা’

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

বিএনপিতে চলছে ‘দাবা খেলা’

বিএনপিতে চলছে ‘দাবা খেলা’

Swapno



দাবা খেলার মতোই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার রাজনীতি শুরু হয়েছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনে। এদিকে চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতায় বর্তমানে বিএনপিতে সবাই নেতা। যাকে ঘিরে সেই পুরনো ছন্দ "বোয়ালের ডিম বোয়ালে ভাঙে"। এদিকে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে বিএনপির ৪ টি সাংসদ সদস্য থাকলে ও এগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে না। এদিকে কিছু এমপি নিজেদের মাথা ব্যাথা নিয়েই ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। এদিকে নির্বাচনের পরপরই বিভক্ত হয়ে পরেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি। জেলা বিএনপি পাঁচ সদস্যের কমিটিতে ঐক্যবদ্ধতা না থাকায় দুর্বল নেতৃত্বে একের পর এক ঘটনায় বিতর্কিত হয়ে পরেছে সংগঠনটি।


একই সাথে মহানগর বিএনপি ও বর্তমানে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব, যুগ্ম আহ্বায়ক সকলেই কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে পরেছেন। তা ছাড়া বর্তমানে দুটি সংগঠনেই ‘দাবা খেলার’ মতোই রাজনীতি চলছে। এই খেলায় যুক্ত হয়েছে জেলা ও মহানগর যুবদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দল। এদিকে একে একে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। এদিকে নির্বাচনের পর জেলার রাজনীতিকে আরো গতিশীল করতে সিদ্ধিরগঞ্জে জেলা বিএনপির আহ্বায়কসহ দলীয় নেতারা জেলা বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধন করেন। প্রধান ফটকের ওপরে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা’ লেখা সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।


কার্যালয়ের ভেতরে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের ছবি টাঙানো হয়। কিন্তু গত (১৮ জুন) সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের নির্দেশনায় তার অনুসারী সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেনসহ ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী কার্যালয়ে গিয়ে জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড খুলে ফেলেন। পরে সেখানে সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলামের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। একই সঙ্গে তিন সংসদ সদস্যের ছবি সরিয়ে দিয়ে শুধু আজহারুল ইসলামের ছবি রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতা–কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।


কিন্তু এতে কোন প্রকারের প্রতিবাদ করেনি জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দরা। পরবর্তীতে তা নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হলে পূনরায় পুরনো জেলা বিএনপির ব্যানার স্থাপন করা হয়। এরই কিছুদিন পরপরই নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে জেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে গত রবিবার (২১ জুন) দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেন। পরবর্তীতে তাকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়।


সেদিন রাতেই নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়কের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় যুবদল। একই দিনে রাত দেড়টায় মুচলেকা নিয়ে তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই সাথে সিদ্ধিরগঞ্জ ৩নং ওয়ার্ডে জেলা বিএনপির কার্যালয় ব্যানারে নয়া অফিস খুলেছেন।


জেলাতে শুরু হয়েছে সেই দাবা গুটি খেয়ে ফেলার মতোই খেলা। ইতিমধ্যে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ জেলা পরিষদের প্রশাসক, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ সদস্য। নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনডিএ) চেয়ারম্যান পদে যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব। রূপগঞ্জে নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত শরীফ আহমেদ টুটুল। তা ছাড়া কমিটি অন্যতম সদস্য মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বহিস্কার অবস্থায় রয়েছে । যাকে ঘিরে দুর্বল হয়ে পরেছে জেলা বিএনপি। পরবর্তীতে ৩৩ সদস্যে বিশিষ্ট উন্নতি কমিটি করলে ও জেলা বিএনপির নাম-গন্ধ কিছুই নেই নারায়ণগঞ্জে।


একই সাথে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপিতে আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান ও সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে আলাদাভাবেই বিভিন্ন পোগ্রামে তাদের লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তা ছাড়া একই সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ সদস্য আবুল কালামের পুত্র। তিনি বর্তমানে বন্দর দেখা শোনা করায় তিনি মহানগর বিএনপিতে কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না।


তা ছাড়া বাকি আরো অনেকেই রয়েছে কেউ মহানগর বিএনপির ব্যানারে একত্রিত হতে রাজি নয়, বর্তমানে বিভক্ত। একই সাথে কে কাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ফেলে বড় নেতা হিসেবে নিজেকে জাহির করতে পারবে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। এমনইভাবে মহানগর যুবদলে নতুন নেতৃত্ব আসতে দেওয়া হচ্ছে বাধা বর্তমানরাই আটকিয়ে রেখেছেন থানা, ওয়ার্ড,ইউনিয়ন কমিটি। একই সাথে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল এবং জেলাতে এই পুরনো দাবা খেলার মতোই সামনের জনকে ফেলে পিছনের জন আগে যেতে চাইছেন।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও নারায়নগঞ্জ বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। সংগঠনের ভিতকে দুর্বলতা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের টানাপোড়েন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনীহা যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তা ছাড়া জেলা ও মহানগরের রাজনীতিতে বিএনপির দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইউনিট পর্যায়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন ও কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যর্থতা এখন বড় উদ্বেগের কারণ।


সংগঠনের নিচের স্তরগুলো সক্রিয় না থাকলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়ে এমনটাই মনে করছেন অভিজ্ঞ নেতারা। এই প্রেক্ষাপটে ঈদের পর দল গোছানোর উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। তাদের মতে, তৃণমূলকে সক্রিয় করা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করাই এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশা, দ্রুত একটি নির্বাচিত ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হলে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও গতি ফিরে আসবে।


তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় অনিশ্চয়তা কাটছে না। তা ছাড়া জেলা বিএনপিতে বর্তমানে সবাই নেতা হয়ে জাহির করছেন যাকে ঘিরে সংগঠনে দেখা মিলছে অভ্যন্তরীন কোন্দল ও বিশৃঙ্খলা। সেই সকল দিক লক্ষ্য করে তৃনমূলকে মূল্যায়িত করে নতুন কমিটির মাধ্যমে বিএনপিতে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর দাবি তৃণমূলের নেতাদের। এরই মধ্যে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আর এই পতনের সাথে সাথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গাঁ ঢাকা দিয়েছেন।


এই অবস্থায় একদম খালি মাঠে রয়েছে বিএনপি। দীর্ঘদিন পর খালি মাঠে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। কেউ কাউকে মানছেন না। অনেক সময় নিজেরাই নিজেদের সাথে প্রভাব আধিপত্যের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছেন। বিএনপির নেতাকর্মীরাই যেন বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভাব হয়েছেন। প্রতিনিয়তই নারায়ণগঞ্জের কোনো না কোনো এলাকায় কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতার খবর পাওয়া হচ্ছে।


পাশাপাশি শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা নির্দেশনা দিয়েছেন একরকম কিন্তু অধস্তন নেতাকর্মীরা করছেন আরেক রকম। এদিকে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। আর এই ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ বিএনপি সহ তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনগুলো আরও বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন। কেউ কাউকেই মানতেই চাচ্ছেন না। যেন বিএনপির ও তাদের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনে সকলেই নেতা। আর তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না শীর্ষ পদধারী সিনিয়র নেতারা। বর্তমানে অঙ্গসংগঠনের নেতাদের দেখেই দাবা খেলছে বড় নেতারা।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন