Logo
Logo
×

রাজনীতি

সব কিছুই বিএনপির কব্জায়

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

সব কিছুই বিএনপির কব্জায়

সব কিছুই বিএনপির কব্জায়

Swapno



সবকিছুই এখন বিএনপির দখলে। হাট-ঘাট-বাস টার্মিনাল শুধু নয়, আইনজীবী সমিতি, চেম্বার অব কমার্স এমনকি বিসিক শিল্পনগরীতে থাবা পড়েছে দলটির নেতাদের। শুধু তাই নয় স্থায়ী-অস্থায়ী পশুর হাট, ময়লার সিন্ডিকেট সবই যেন বিএনপি নেতাদের একক নিয়ন্ত্রন। আরো অভিযোগ উঠেছে, বালুমহাল, ড্রেজিংয়ের ব্যবসা ও থ্রি হুইলার স্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার। নগরে থাকা সব সরকারি দপ্তরের টেন্ডারও এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপির ঠিকাদাররা।


৫ আগস্টের পর শুরু হওয়া এসব দখল-চাঁদাবাজি এখনো চলছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। ক্ষমতায় আসার ক্ষমতায় আসার ৫ মাসে সবকিছুই পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন বিএনপি নেতারা। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে দলের নানা পদক্ষেপ থাকলেও দিন শেষে সকলেই হয়ে যায় ম্যানেজ। গত (১৪ জুন) নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আওতাধীন হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট, গণশৌচাগার এবং অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা কার্যক্রম নিয়ে নগরজুড়ে শুরু হয়  আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়।


সদ্যসমাপ্ত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ইজারা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইজারাই পেয়েছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। ফলে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এ প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। এতে ইজারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সরকারি রাজস্ব আদায় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে উঠেছে ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ইজারা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে সরকার ও সিটি করপোরেশন সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রশাসন।


এদিকে গত ১৪ জুন নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বিভিন্ন সায়রাত মহালের দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। দরপত্র অনুযায়ী, ইনস্টিটিউট রোড পার্শ্বস্থ অস্থায়ী কাঁচাবাজার (মীর জুমলা সড়ক বাদে) সর্বোচ্চ এক কোটি ২২ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন আবু সালেহ আহম্মেদ সনেট। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি বিএনপি নেতা বদিউজ্জামান বদুর ভাগিনা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা জাকির খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।


নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ১৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন। নিউ মেট্রো হলের সামনে সড়ক বাসস্ট্যান্ড ৩০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. নজরুল ইসলাম। নিতাইগঞ্জ ও থানা পুকুরপাড় এলাকায় রাস্তার ক্ষতিপূরণ ফি আদায়ের ইজারা ২৩ লাখ টাকায় পেয়েছেন মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। গণশৌচাগারের মধ্যে সৈয়দ আলী চেম্বার সংলগ্ন গণশৌচাগার দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৩ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মাহাবুব আলম সুমন।


কেন্দ্রীয় পৌর শহীদ মিনার সংলগ্ন গণশৌচাগার ছয় লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন প্রয়াত বিএনপি নেতা ডেভিডের ভাই ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহেব উল্লাহ রোমান। ধর্মতলা গণশৌচাগার পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় ইজারা পেয়েছেন ফয়সাল আবেদ হিমু। তবে পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনালের দরপত্রে ত্রুটি থাকায় ওই মহালের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৩ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষে নাসিকের ২২টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা চূড়ান্ত করা হয়। সেখানেও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে।


সবচেয়ে বেশি দর দিয়ে ৮নং ওয়ার্ডের গোদনাইল ইব্রাহিম টেক্সটাইল মিলসের খালি মাঠ ৪৬ লাখ টাকায় ইজারা নেন যুবদল নেতা মো. মমতাজ উদ্দিন। অন্যদিকে সর্বনিম্ন তিন লাখ ৩০ হাজার টাকায় ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আলতাফ সাহেবের খালি জায়গা ইজারা পান আবদুল মান্নান শিকদার। ৫নং ওয়ার্ডের সাইলো রোডসংলগ্ন মোহর চান কন্ট্রাক্টরের খালি জায়গা সাত লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা নেন মুক্তার হোসেন। একই ওয়ার্ডের বটতলা বাদশা মিয়ার মাঠ তিন লাখ ৫০ হাজার টাকায় পান সিরাজুল ইসলাম। ৬নং ওয়ার্ডের এসও রোড টার্মিনালসংলগ্ন খালি জায়গা তিন লাখ ৯৫ হাজার টাকায় ইজারা নেন মাজহারুল ইসলাম।


সাত নম্বর ওয়ার্ডের নাভানা সিটি-১ মাঠ সাত লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পান সোহেল মিয়া। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জালকুড়ি দক্ষিণপাড়ার নতুন রোডসংলগ্ন খালি জায়গা ১৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় ইজারা নেন দেলোয়ার হোসেন। একই ওয়ার্ডের ডিএনডি খালসংলগ্ন খালি জায়গা ১৮ লাখ ১০ হাজার টাকায় পান বাবুল প্রধান। এছাড়া নাসিকের আওতাধীন আরো বেশ কিছু খালি জায়গা, মাঠ, বালুর মাঠ ইত্যাদির ইজারার ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা গেছে।


এদিকে আরো জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ একটি অসাধু সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজস করে নারায়ণগঞ্জের আওতাধীন ২৩টি ঘাটের নিয়ন্ত্রণে বিএনপির একাধিক অংশ। সদর উপজেলার হাট বাজারের নিয়ন্ত্রণে থানা বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের গ্রুপ। ফতুল্লা বাজার পশু জবাই খানা, বক্তাবলী হাটবাজার, রাজাপুর গুদারাঘাট, ডিঘীরচর গুদারাঘাট, ফতুল্লা হাট বাজার ও ডিঘীরচর হাট, বক্তাবলী ফেরিঘাট ও খেয়াঘাট, ফতুল্লা ঘাট, আলীগঞ্জ ঘাট, পাগলা ঘাট, ধর্মগঞ্জ ঘাট, চতলার মাঠ ঘাট। সবই সদর উপজেলার সঙ্গে যোগসাজসে নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপি।


গত (১৯ মে) নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১৬টি পশুর হাটের দরপত্র উন্মুক্ত করেছে উপজেলা প্রশাসন। যেখানে আগে থেকেই ইউএনও ও সদর উপজেলার যোগসাজসে এবং এনসিপি নেতাদের ১০% দেওয়ার চুক্তি করে সব অস্থায়ী পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা।


সদর উপজেলার সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছেন মো. লুৎফর রহমান। তিনি ৯২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টাকায় গোগনগর ইউনিয়নের পুরাতন সৈয়দপুর এলাকায় মোসা. হোসনে আরা বেগম গংদের নিজস্ব ভূমিতে অস্থায়ী পশুর হাট পেয়েছেন। হাটটি মূলত ছিলো গোগনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আক্তার হোসেনের। যিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি বরাদ্দকৃত টাকা না দিয়েই সেই হাট পরিচালনা করেন। যাকে ঘিরে রাজস্ব ক্ষতি হয় সরকারের।


অন্যদিকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বক্তাবলী বাজারসংলগ্ন খালি জায়গায় অস্থায়ী পশুর হাট নিয়েছেন নজরুল ইসলাম। যিনি বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। এ ছাড়া গোগনগর ইউনিয়নে সমিলসংলগ্ন আলী আকবর বেপারীর নিজস্ব ভূমি ২ লাখ ৬৬ হাজার টাকায় পেয়েছেন হাবিবুর রহমান সেলিম। এটা ও বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিলো। বাড়িরটেক ৩ নম্বর নিট রিফ্লেক্স গার্মেন্টস ও আলী হোসেন বেপারী মাদ্রাসাসংলগ্ন শাজাহান মিয়ার নিজস্ব ভূমিতে ৭ লাখ ৬ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন সোহেল। যা নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ফতুল্লা থানা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহীম।


গোগনগর ইউনিয়নের আওয়ালের গুদারাঘাটসংলগ্ন খালি জায়গা ২ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন গোগনগর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা লিটন মিয়া। এদিকে ১০ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর পূর্বপাড়ে ডিক্রিরচর খেয়াঘাটসংলগ্ন বালুর মাঠের ইজারা পেয়েছেন আব্দুর রহমান যিনি আলীরটেক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি।  বক্তাবলী ইউনিয়নে প্রসন্ননগর (ফকির মার্কেট) সংলগ্ন শাহ নুরুল ইসলামের নিজস্ব জমি ২ লাখ ২৫ হাজার টাকায় পেয়েছেন যুবদল নেতা আবুল খায়ের। কাশিপুর ইউনিয়নে ওরিয়ন পাওয়ার প্ল্যান্টসংলগ্ন মামুন সাহেবের নিজস্ব বালুর মাঠ ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন কাশীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফ মন্ডল।


কুতুবপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে হিমেল ও নুরে আলমের পরিত্যক্ত মাঠে মার্কাজ মসজিদসংলগ্ন (নয়ামাটি) এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকায় পেয়েছেন বিএনপি নেতা আরিফুর রহমান। একই ইউনিয়নের ভূঁইগড় সোনালী সংসদসংলগ্ন খেলার মাঠে ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ইজারা পেয়েছেন বিএনপি নেতা মাজেদুল হক মাজু । কুতুবপুর ইউনিয়নের সাইনবোর্ডসংলগ্ন শান্তিধারা মসজিদের পাশের খালি মাঠ ১৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় পেয়েছেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু।


একই ইউনিয়নের আলীগঞ্জে অবস্থিত ৪টি মসজিদ ও ২টি মাদ্রাসার উন্নয়নকল্পে অফসার ওয়েল মিলসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন। যা নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ফতুল্লা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাহমুদুল হক পলাশ। একই ইউনিয়নের পাগলা আন্তজেলা ট্রাকস্ট্যান্ড মাঠ ৬ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ-সভাপতি হাজী মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। একইভাবে বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও সকল হাট-ঘাট-বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা।


নারায়ণগঞ্জবাসীর একটি অংশের মতে, ইজারা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার প্রায় সব বড় মহাল বিএনপি ঘরানার ব্যক্তি বা তাদের ঘনিষ্ঠদের হাতে যাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন নজর থাকবে, ইজারাগুলো থেকে সিটি কর্পোরেশন কিংবা উপজেলা প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় করতে পারে কি না।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন