Logo
Logo
×

রাজনীতি

মহানগর বিএনপির বিষফোঁড়া টিপু

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

মহানগর বিএনপির বিষফোঁড়া টিপু

মহানগর বিএনপির বিষফোঁড়া টিপু

Swapno



নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড. আবু আল ইউসুফ খান টিপু। একের পর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে মহানগর বিএনপির বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছেন টিপু। গোটা বিএনপির ইমেজ ক্ষুন্ন করার মিশনে যেন নেমেছেন এই বিএনপি নেতা। আওয়ামী সরকার পতনের শেষ সময়ের কিছু সময় আগে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব পদ পান টিপু। এতেই তিনি হাতির পাঁচ পা দেখে ফেলেন এই বিএনপি নেতা। অথচ টিপুর সাথেই আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্টতা ছিল অনেক বেশি। আওয়ামী লীগের সময়ে বিএনপির মধ্যে যেকয়জন ওসমান ঘনিষ্ঠ ছিল তার মধ্যে টিপু ছিলেন অন্যতম।


যার ফলে পুরো আওয়ামী লীগের সময়ে অন্যান্য বিএনপি নেতারা যখন শত শত মামলা নিয়ে আদালতপাড়ায় ঘুরছিলেন, তখন টিপুর বিরুদ্ধে মামলা হয় মাত্র একটি, শেষ সময়ে একবারই গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। অথচ এই টিপু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় অবস্থা দুর্দিনে দুই দফা দল পরিবর্তন করে বিএনএফ এ যোগ দেন। ওই সময় বিএনপিকেও গালাগাল করেন। ওসমান পরিবারের সাথে বিএনপি নেতা টিপুর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি নারায়ণগঞ্জবাসী সকলের জানা ছিল।


চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ইউটার্ন নেন টিপু। ওসমান পরিবারের সাথে সখ্যতা নেই এটা প্রমাণ করতে করতে ৫ আগস্টের পর শামীম ওসমানদের পুরো বাড়ি হীরা মহল, সেলিম ওসমানের বাড়িতে টিপুর নেতৃত্বে ভাঙচুর-হামলা চালানো হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় ৫ আগস্টের পর ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতা আবারও প্রমাণ হয় বায়তুল আমান ভবন ভাঙার বিষয়টি নিয়ে।


২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সাথে মিল রেখে শামীম ওসমানের উপর বোমা হামলা, শেখ হাসিনা উপর আক্রমণের সাথে মিল রেখে শামীম ওসমানের উপর আক্রমণের ঘটনা এটি শামীম ওসমানের রাজনৈতিক ট্রেন্ড  হিসেবে পরিচিত। ৫ আগস্টের পর যখন ধানমন্ডি ৩২নং বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর চালানো হল, শামীম ওসমান না থাকলেও টিপুর নেতৃত্বে ওই ঘটনার পর আওয়ামীলীগের ঐতিহ্য জন্মবাড়ি দাবি করা ‘বায়তুল আমানে’ হামলা ভাঙচুর করে বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়।


অথচ এই বাড়িতে যারা বসবাস করতো শামীম ওসমানের চাচার পরিবার তাদের সাথে কখনোই শামীম ওসমান, সেলিম ওসমানের ভালো সম্পর্ক ছিলনা। বিএনপির একটি বুদ্ধিজীবী অংশ মনে করে, শামীম ওসমানের নির্দেশেই টিপু ‘বায়তুল আমান’ ভবন ভেঙেছিলেন। যাতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ভবিষ্যতে শামীম ওসমান দেখাতে পারে, ধানমন্ডি ৩২ ভাঙার পর নারায়ণগঞ্জের বায়তুল আমান ভাঙা হয়েছিলো। শামীম ওসমানের রাজনীতি শেখ পরিবারের রাজনীতির সমপর্যায়ের। অথচ বায়তুল আমান ভাঙার পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাস্তবিক অর্থে একটি নিরীহ বিধবা পরিবারের সদস্যরা। এতে মূলত টিপুর মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে শামীম ওসমান।


নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় টিপুর দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ আইনজীবীরা। নারী আইনজীবী আমেনা আক্তা শিল্পীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি পুরো দেশে ভাইরাল হয়। কখনো আইনজীবীকে মারতে তেড়ে যাওয়া, কখনো আইনজীবী শিক্ষকে নারায়ণগগঞ্জ আইন কলেজে ক্লাস নিতে না দেয়ার হুমকি, লাঞ্ছিত করার হুমকি, কখনো সিনিয়র আইনজীবীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে নিজ পেশার জায়গাতেও বিতর্কিত টিপু।


সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের গলি থেকে শুভ দাসের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় বাংলাদেশ হোসেয়ারি এসোসিয়েশনের ‘ হোসেয়ারি সমিতি ভবন’ যেটি টিপু ৫ আগস্টের পর দখল করে নিজের কার্যালয়ে পরিণত করেছেন সেখান থেকে ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত মাদকব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের সাথে বিএনপি নেতা টিপুর সংশ্লিষ্টতা ও ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। শহরের আমলা পাড়ায় মাদকের কারবারে জড়িতদের অধিকাংশদেরই টিপুর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখা গেছে। মাদকব্যবসায়ীদের সাথে বিএনপি নেতার টিপুর সাথে সখ্যতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।


প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের ঘোষণা দেন এড.সাখাওয়াত হোসেন খান। তবে এর প্রধান বাধা হয়ে উঠেন টিপু। টিপুর ভাই আবু আল বেলালের নেতৃত্বে প্রত্যক্ষ মদদে শহরের হকার নিয়ন্ত্রণে নেন টিপু। এর থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি চালু রাখা হয়। যার ফলে সাখাওয়াত আজ অবধি ফুটপাত থেকে হকার সরাতে সাফল্য পাননি।


এতো অরাজকতা তৈরি করায় টিপুকে এড়িয়ে চলতে থাকেন বিএনপি নেতারা। টিপু নিজেও বুঝে যান তার একটা শেল্টারদাতা প্রয়োজন। এতে তিনি ব্যবহার করেন নিজের মেয়েকে। নিজের মেয়ের বিয়েতে নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের এমপি নজরুল ইসলাম আজাদকে মেয়ের উকিল শ্বশুর বানিয়ে আজাদের বেয়াই বনে যান টিপু। জানা গেছে, মেয়ের বিয়েতে আজাদও অর্থ সহযোগিতা করেছে। আজাদ পরিবার চিন্তা করেছে নারায়ণগঞ্জ শহরে আমার একটা প্রভাব থাকুক, সেই চিন্তা করেই টিপুকে এতোটুকু সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছেন। এই বিয়ে উপলক্ষে শামীম ওসমান, সেলিম ওসমানের কাছ থেকেও আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে বিএনপি মহলে খবর চাউর রয়েছে।


টিপুর এমন ডাবল রাজনীতি নতুন কিছু নয়।  ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ থেকে টিপু ব্যবসায়ী প্রাইম বাবুলের ঘনিষ্ঠভাজন হন। নির্বাচনে তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে কয়েক দফায় প্রাইম বাবুলের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। এরপর যখন ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান দলীয় মনোনয়ন পান তখন তার কাছে ভিড়ে যান টিপু। তার কাছ থেকেও কয়েক দফায় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী হিসেবে বিএনপি ঘরনার এই দুই ব্যবসায়ী নেতা পরবর্তিতে বিএনপি ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন জনের কাছে স্বীকার করেছেন।


তবে একটি জায়গায় ধরা খান টিপু। সেটি হচ্ছে যখন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ এড. আবুল কালাম বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পান। স্থানীয়, সর্বজনগ্রহণযোগ্য এবং এলাকায় প্রভাবের দরুণ এড. কালামের কাছে পাত্তা পাননি টিপু। বিএনপি নেতা আবুল কালাম এবং তার ছেলে আবুল কাউছার আশার শক্ত স্থানীয় রাজনীতি, পারিবারির ঐতিহ্য এবং মানুষের গ্রহণযোগ্যতার দরুণ এই একটি জায়গায় এখনো সুবিধা করতে পারেননি টিপু। অন্যান্য বিএনপি নেতারাও টিপু অশালীন অঙ্গভঙ্গি আর অশ্রাব্য ভাষার দরুণ তাকে এড়িয়ে চলেন। কথায় কথায় বানানো লিখে ফেসবুকে স্ট্যাটাস আর ভিত্তিহীন আবোল তাবোল বক্তব্য দিয়ে নানা জনকে হেয় করার কুখ্যাতি রয়েছে টিপুর। তবে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে টিপু বিএনপির বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছেন।


সর্বশেষ ১২ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের ট্যাগ দিয়ে চাষাঢ়ায় সায়াম প্লাজায় হাসান ইমাম নামে এক কসমেটিক ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে টেনে বের করে টিপুর নেতৃত্বে মারধর করা হয়। টিপু দাবি করেছেন, এই ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগকে অর্থায় করছে। অথচ গত আড়াইবছর এই ব্যবসায়ী এই কসমেটিক দোকানে শান্তিপ্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে। ভেতরের ঘটনা জানা গেছে, সায়াম প্লাজা দোকান মালিকের সভাপতি হিসেবে আছে হাসান ইমাম।


এই মার্কেটের সামনে আওয়ামী শাসনমালেও ফুটপাতে হকার বসতে দেয়া হতো না। প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান ফুটপাতে হকার বসতে না দেয়ার কথা বলার পর এটি অব্যাহত থাকে। গত ৬ মাসে বেশ কয়েকবার এই মার্কেটের সামনে হকার বসানোর জন্য হাসান ইমামকে চাপ দেন টিপু। তাতে রাজি না হওয়ায় গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলকে উপলক্ষ্য করে ঝোপ বুঝে ট্যাগ দিয়ে হাসান ইমামকে দোকান থেকে টেনে বের করে মারধর করেন টিপু ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। পরে আওয়ামী লীগে অর্থায়নের নাটক সাজান।  


এদিকে বিএনপি নেতা টিপুর সারাদিন কোর্ট টাই পড়ে থাকা রাজনীতি নিয়ে হাস্যরস করেন খোদ বিএনপি নেতারা। তারা বলেন, এটি মূলত লেবাস, তিনি আইন পেশা দিয়ে রাজনীতি করেন। ৫ আগস্টের পর থেকে আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছেন টিপু। অনেক টাকার মালিক বনে গেছেন। টিপু আইনজীবী হলেও তেমন বড় ধরণের আইনজীবী ছিলেন না। নুন আনতে পানতা ফুরাতো। তবে ৫ আগস্টের পর কপাল খোলে টিপুর। অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে যান মহানগর বিএনপির বিষফোঁড়া টিপু।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন