রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই আমাদের দেশের ব্যবসায়ী মহল যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে ছিলেন। প্রতিদিনের বাজারে দাম বৃদ্ধির সেই উত্তাপ এখনো বর্তমান। সেই উত্তাপ বাড়তে বাড়তে মানুষের পকেট ছেড়ে গায়ে কামড় বসাচ্ছে। পরিবেশ ঝলসাচ্ছে আষাঢ়ের এই ভেপসা গরমে।
আরও একটু উষ্ণতার খবর পাওয়া গেল আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং চলবে। জনগনকে তা সহ্য করে নিতে হবে নিজ গুনে । সমাজ, সংসার, রাষ্ট্রের যাবতীয় উত্তাপ, উষ্ণতা জনগনেেকই সয়ে নিতে হয়। লোড শেডিং মোকাবেলা প্রস্তুতির দ্বারা যেন সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় , তেমন উপায়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, কখন, কোন এলাকায় লোডশেডিং হবে সেটি যেন জনগণ আগে থেকেই জানতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জ্বালানি উপদেষ্টা জানালেন, সপ্তাখানেকের মধ্যে একটি এপ্স তৈরি হবে, যার মাধ্যমে কেবলমাত্র কর্মকর্তারা জানতে পারবেন কখন কোথায় লোডশেডিং হবে। সারা দেশে কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই দিনের মধ্যে কয়েকবার লোডশেডিং হচ্ছে ।
ভোগান্তি জনগণের, বাড়তি মূল্য পরিশোধ করবে জনগণ, কিন্তু তথ্য জানবে শুধু কর্মকর্তারা । সারা দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে, এমন ঘোষণার কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হচ্ছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন ক্ষমতা ২২ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। ক্যাপ্টিভ পাওয়ারসহ ২৫ হাজার ৫৬৬ মেগাওয়াট। এক হিসাবে দেখা গেছে ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস ও জ্বালানি তেল দিয়ে। সরকার প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭, এখন সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সর্বমোট ১৫২। দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ার কারণেও এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করে। তাছাড়া বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । আবার সিস্টেম লস এর নামে আমাদের দেশে অদৃশ্য উৎপাদনখেকো আছে বিভিন্ন বিভাগে।
মূলত পরিকল্পিতভাবে একটি চক্রের সহায়তায় অপব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের অর্থ, বিদ্যুৎ, গ্যাস,পানি প্রভৃতি অপচয় হচ্ছে । তথাকথিত এই সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বিদ্যুৎ খাতসহ অন্যান্য বিভাগের দুষ্ট প্রভাব বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। অধ্যাপক ম. তামিম, বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, তার আমলে সিস্টেম লস ১০% থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশে নামিয়েছিলেন। বাংলাদেশে রিজার্ভের বড় উৎস প্রবাসী আয় ।
করোনা সহ অন্যান্য কারণে প্রবাসী আয় কমতির দিকে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদও কম। এমতাবস্থায় উচ্চমূল্যে জ্বালানি ক্রয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সরকারি মজুদের তহবিলে ডলারের টান পড়বে অথবা কুলোবে না। কাজেই বিকল্প হিসেবে ব্যয় সাশ্রয়ী হয়ে অথবা বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে তা সমাধান করতে হয়। সরকার প্রথম ব্যবস্থায় সংকট উত্তরণে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার সাংবাদিক সম্মেলনের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে, কিভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে, বিধি-নিষেধ দেয়া হয়, পরামর্শ দেয়া হয় । জ্বালানি উপদেষ্টার আশা লোডশেডিং ও অফিস আদালতের সময় কমিয়ে, ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে । যদিও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে সংকট নভেম্বর পর্যন্ত চলবে।
বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমে এলে নভেম্বর ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে পারে । তখন লোডশেডিংও দূর হবে। বাংলাদেশের মানুষ অল্প কিছুদিন মাত্র লোডশেডিং থেকে মুক্ত ছিল। এখন তা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। এক সময় বলা হত বিদ্যুৎ যায় না, বিদ্যুৎ আসে, সেই অবস্থা যারা দেখেনি, এবার তাদের সেই সুযোগ এল । আমাদের দুর্ভাগ্য বিদ্যে বোঝাই, বুদ্ধি বোঝাই আমলা মশাইগন ‘নাও কেনার আগে লগি বইঠা’ নিয়ে তোলপাড় করেন বেশি।
বিদ্যুৎ বিভাগেও দেখা যায়, সঞ্চালন লাইন তৈরি না করে, বিতরণের উপায় না করেই তারা বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়িয়ে দিলেন চাহিদার চেয়ে অনেক গুণ বেশি । তাছাড়া ১০ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ৭০ হাজার কোটি টাকা পাইয়ে দিয়েছেন সরকারি কোষাগার থেকে। ডলার মজুদ কম হওয়ার পেছনে এটাও একটি কারণ বটে। বহু লক্ষ টাকা বেতন দিয়ে আমলা মশাইদের দায়িত্ব দেয়া হয় দেশের ব্যবস্থাপনার, জনগণের সুবিধা পাওয়ার উপায় সন্ধান ও ব্যবস্থা করার।
তারা কেন সেটি করেন না বা পারেন না অথবা পারলেও কেন করে দেখান না ইত্যাকার প্রশ্নের কোন জবাবদিহিতা তাদের করতে হয় না। করতে হয় না বলেই জনগণের সংকট নিরসনে তারা কোন ভূমিকা রাখেন না। বরং বাণিজ্যবান্ধব সহযোগী হিসেবে তেজারতকারীদের সহশক্তি রূপে কাজ করেন। কিছুদিন আগে ব্যবসায়ীরা তেল নিয়ে তেলেসমাতি করেছেন। আমলা মশাইরা সঙ্গে ছিলেন।
তারাও তেলেসমাতি দেখাতে পিছ পাও হননি । মাঝখান থেকে শাস্তি পেয়েছে কিছু ক্ষুদ্র তস্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর তেলের পিছনে ছুটতে ছুটতে হয়রান হয়েছে সাধারণ মানুষ। পত্রপত্রিকা, গণমাধ্যম, মিডিয়া এই সমস্ত অভিযান সম্পর্কে সোচ্চার থেকেছে।
বাংলাদেশের নিয়মে অভিযানের ঢেউ কিছুদিনের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে আসে, গা সওয়া হয়ে যায় এই সবকিছু। তখন এইসব সংকট সমস্যা নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে কাউকে দেখা যায় না, মিডিয়াও নীরব হযে যায়। যেমন রোহিঙ্গা সংকট, যানজট, গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি সবই এখন গা সওয়া ।
আর কয়েকদিন পরে লোডশেডিংও মানুষের সহ্য ক্ষমতায় স্থায়ী জায়গা করে নেবে । রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হবার পর কম বেশি মাস চারেক সময় পাওয়া গিয়েছে। এই দিনগুলোতে আমাদের বিদ্যুৎ গ্যাস জ্বালানি মন্ত্রণালয় অনুমান করতে পারেনি, নিজের সরবরাহ সক্ষমতা, উৎপাদন ক্ষমতা, বিতরণ ব্যবস্থা কতদূর পর্যন্ত সহনীয় থাকবে, অব্যাহত থাকবে।
আজ চার পাঁচ মাস পরে এসে হঠাৎ করেই জানান দেয়া হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেশি, নিজস্ব উৎপাদিত গ্যাসের সরবরাহ কম। যদিও গ্যাসের দেশীয় ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা নতুন উৎস সন্ধানের কোন কার্যকর উদ্যোগ চেষ্টা এ পর্যন্ত করা হয়নি।
নীতি নির্ধারকরা সংকট দুয়ারে পা রাখলে পরেই নিদান নিয়ে ভাবনাচিন্তা, গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং সর্বোপরি উপদেশের বাণী বিতরণে তৎপর হয়ে ওঠেন । যাতে জনগণের নাভিঃশ্বাসে কোরামিন জাতীয় কোনও ওষুধও যোগ হয় না । তাই লোডশেডিং নামের ভুতের আছর থেকে জাতি কবে মুক্ত হবে তা আগাম বলার মত জ্যোতিষীর খোঁজ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।


