ডন বজলুর অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন রিতার হাতে
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:০৯ পিএম
# জনপ্রতিনিধির আড়ালেই প্রকাশ্যে চলছে নানা অপকর্ম
চনপাড়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও রিতার ভাইদের কেউ কেশাগ্রও ছুঁতে পারেনি। বাবু ও দেলোয়ার দুই ভাই মাদকের পাইকারী ডিলার। এখনো তারা দেদারছে মাদক বিক্রি করছে। চনপাড়ায় সে পামেলা কিংবা পাপিয়ার মতো রাজ্য গড়ে তুলেছে। ডন বজলুর জেলহাজতে চলে যাওয়ার পর থেকে এখন চনপাড়ার নিয়ন্ত্রণ করছে রিতা। গড়ে তুলেছে নারী বাহিনী।
তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চাইলে তাকে নারী নির্যাতনের মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া রিতার দুলাভাই নাসির আহম্মেদের (যিনি নিজেকে এলাকায় সিআইডির অফিসার পরিচয় দেন) প্রশাসনিক ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে দাবড়ে বেড়ান। কেউ ডাকে পামেলা। আবার কেউ জানে নেত্রী। মেম্বারনী হিসাবে পরিচিত রয়েছে তার। একই অঙ্গে বহুরূপ। রাজনীতির বদৌলতে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে রিতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিতার পিতার নাম আহম্মদ খাঁ। একসময় চনপাড়ার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাডাওয়ালার বাড়িতে কাজ করতো আহম্মদ খাঁ। পরে আহাম্মদ খাঁ নিজেই মাঠার ব্যবসা দিয়ে বসেন। সেখানে রিতাও বাবার সঙ্গে মাঠা বানানো ও বিক্রির কাজ করতেন। এরপর তারা ভাঙ্গারী ব্যবসা শুরু করেন। অভাব অনটনের সংসারে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো রিতার।
স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, গত ২০১১ সালে রিতার কোন কাজকর্ম না থাকায় ডন বজলুর সঙ্গে হাত মেলায়। পরে চনপাড়া এলাকার পানির বিল উঠনোর জন্য বজলু তাকে চাকরী দেয়। বিনিময়ে পেতো প্রতিদিন ২০০ টাকা করে। সেই হিসেবে মাসে আয় হয় ৬ হাজার টাকা। তখন থেকেই বজলুর সহযোগী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন রিতা। চনপাড়ার অপরাধীদের নিয়ন্ত্রক ডন বজলুর হাত ধরে হয়েছেন কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য। এখন রিতা ৩ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান। আর বজলু ১ নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান। ঘুরেফিরে তাদের হাতেই ক্ষমতা। তবে, শেষের দিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রন নিয়ে বজলুর সঙ্গে রিতার বিরোধের সৃষ্টি হয়। এভাবে মাত্র ১১ বছরের ব্যবধানে রিতা এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চনপাড়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও রিতার ভাইদের কেউ কেশাগ্রও ছুঁতে পারেনি। বাবু ও দেলোয়ার দুই ভাই মাদকের পাইকারী ডিলার। এখনো তারা দেদারছে মাদক বিক্রি করছে। আবার খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের দিয়েও মাদক বিক্রি করানো হচ্ছে। আইনশৃংখলা বাহিনী অভিযান করতে আসলে বিশেষ স্থান থেকে তদবির আসায় রিতার ভাইদের গ্রেপ্তার করেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবার কখনও কখনও অভিযানের আগেই রিতার নিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব কাজে সহযোগীতা করছেন রিতা। অভিযান করতে গেলে মাদক ব্যবসায়ীসহ অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা চালায়। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এরপর চনপাড়ার ডন বজলুর রহমান বজলু গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই চনপাড়ার পুরো অপরাধের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে সেলিনা আক্তার রিতা। বজলুর অনুপস্থিতিতে নানা কুকর্মের অপরাধীদের সেল্টার দিচ্ছেন রিতা।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউনে রয়েছে বাড়ি। ষ্টাফ কোয়ার্টার ইসলাম প্লাজায় কাপড়ের শো-রুম। চনপাড়া পূর্নবাসনে রয়েছে ৮ টি প্লট। রয়েছে গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেন্স। চনপাড়ার মাদক ও নানা অপরাধের একটি অংশ সেল্টার দিয়ে এসব সম্পদের মালিক বনে গেছেন রিতা। আরেকটি অংশের সেল্টার দিতো বজলু। আর এ জন্যই বজলুর সঙ্গে রিতার বিরোধ ছিলো।রিতার ঘনিষ্ট সূত্র জানায়, রিতার ব্যক্তিগত জীবনে দুই বিয়ে হয়েছে। গত ২০০৭ সালে ড্রাইভার বাবুলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ঐ সংসারে এক ছেলে সন্তান রয়েছে। কিন্তু এ সংসার খুব বেশি দিন গড়ায়নি। ২০১১ সালে তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। পরে ২০১২ সালে আবার বিয়ের পিড়িতে বসে রিতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চনপাড়ায় সে পামেলা কিংবা পাপিয়ার মতো রাজ্য গড়ে তুলেছে। ডন বজলুর জেলহাজতে চলে যাওয়ার পর থেকে এখন চনপাড়ার নিয়ন্ত্রণ করছে রিতা। গড়ে তুলেছে নারী বাহিনী। তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে চাইলে তাকে নারী নির্যাতনের মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া রিতার দুলাভাই নাসির আহম্মেদের (যিনি নিজেকে এলাকায় সিআইডির অফিসার পরিচয় দেন) প্রশাসনিক ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে দাবড়ে বেড়ান।
রিতার সঙ্গে উঠবস করেন এমন দুজন নারীর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রিতা নিজেই নানা কুকর্মের হোতা। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন সুন্দরী নারী রয়েছে। রয়েছে তার ছোট বোনও নানা কুকর্মে জড়িত। সূত্রটি আরো জানায়, রূপগঞ্জের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও নেতাদের বিভিন্ন সময়ে রিতা মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করেন। আর এসব দিয়ে সুবিধা আদায় করে নেন। চনপাড়া এলাকার কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রিতা ইসলামি ফাউন্ডেশনের তিনটি শাখা নিয়ে দিব্যি প্রতিমাসে ১৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। রিতাকে এসব কাজে সহযোগীতা করে গেছেন রূপগঞ্জ উপজেলার ইসলামি ফাউন্ডেশনের তৎকালীন অফিসার আবু সুফিয়ান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, আমরা চনপাড়া কখনোই শান্তিতে থাকতে পারিনা। একজন যায় আরেকজন আসে। খুন খারাবি দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি আমরা। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথও দেখছিনা। আমাদের বঙ্গবন্ধু এই জায়গাটা দিয়েছে বাস্তহারা জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করার জন্য। আওয়ামীলীগ সরকার আমলে প্রথমে বিউটি আক্তার কুট্টি। তারপর বজলু। এখন অত্যাচার করছে সেলিনা আক্তার রিতা। যেই আসে তাকেই টাকা দিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। সরকার দিল আমাদের সুবিধার্থে পানির ব্যবস্থা হেরা টাকা নেয়। টাকা নেয় নেক তাও শান্তি চাই আমরা। এভাবে চলতে পারেনা আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে করাতে গেলেও এই এলাকার বদনামের কারণে ভালো সম্বন্ধ করাতে পারিনা ভেঙে যায়।
নাম না প্রকাশ শর্তে চনপাড়ার কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতা বলেন, চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকা থেকে কেউ ডাক্তার হয়েছেন, কেউ পুলিশে, কেউ সেনাবাহিনীতে, কেউ শিক্ষক হয়েছেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত রয়েছেন চনপাড়ায়। বজলু ও রিতাদের মতো অপরাধীদের জন্য আজকে চনপাড়ার বদনাম হচ্ছে। হচ্ছে দলের বদনামও। এখন এসব অপরাধীরা রূপগঞ্জের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শেল্টারে চলে। আর ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই বজলু ও রিতাদের মতো অপরাধীদের জনপ্রতিনিধি বানিয়েছেন। যার ফলে প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও পাননা দলের নেতাকর্মীরা। যার ফলে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছেই।
এ বিষয়ে কথা বলতে সেলিনা আক্তার রিতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমার বিরুদ্ধে সবগুলো অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমি নিজে নেতৃত্ব দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেছি।
এস.এ/জেসি


