রহস্য উদঘাটনের ৭ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত, দাখিল হয়নি অভিযোগপত্রও।দাবি, শুনানির মধ্য দিয়ে পূর্ণ হল তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার আট বছর। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরেও এ মামলায় তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয় নি। তবে ত্বকী হত্যা মামলায় তদন্ত চলমান ও আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
এদিকে হত্যাকান্ডে জড়িত আসামীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি, হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করে র্যাবের সংবাদ সম্মেলনের ৭ বছর পরও তদন্ত ও বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে ক্ষুদ্ধ নিহত ত্বকীর পরিবার ও স্বজনরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (১ মার্চ) নারায়ণগঞ্জের তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার ও অভিযোগপত্র দাখিলের আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। আগামী ২০ এপ্রিল মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ত্বকী হত্যা মামলার বাদীর আইনজীবী এড. জিয়াউল ইসলাম কাজল জানান, আমরা বিগত কয়েক বছর যাবতই ত্বকী হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার ও অভিযোগপত্র দাখিলের আবেদন করে আসছি। কিন্তু কোনো কার্যকরিতা নেই। অথচ ১৬৪ ধারায় এখন আমাদের সরকারের কাছে একটাই দাবি এ মামলায় দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল ও আসামীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এদিকে মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল মিডিয়া উইং মো. আশিক বিল্লাহ্ জানান, তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ৮ জন কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন। ২০১৩ সালে ২০ শে জুন এ মামলায় তদন্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর র্যাব ৩ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ১৮ এপ্রিল ফতুল্লাহ্ থেকে সালেহ মোহাম্মদ সিমান্ত, একই বছর ১২ নভেম্বর সুলতান শওকত ভ্রমরকে ও সর্বশেষ তায়েব উদ্দীন আহমেদকে আমরা গ্রেফতার করি। তাদেরকে আমরা বিভিন্ন সময় জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এছাড়াও ইউসুফ হোসেন লিটন ও রিফাত বিন ওসমানকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
তিনি আরো জানান, যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। মামলার সংবেদনশীলতা চিন্তা করে বিবেচনায় এনে মামলাটি যথা উপযুক্ত গুরুত্ব সহকারে র্যাব তদন্ত করছে।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকালে পাঠাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে তানভীর মুহম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়। খোঁজাখুঁজির পর কোনো খোঁজ না পেয়ে ঘটনার দিন রাতেই ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং র্যাব-১১ এর কার্যালয়ে চিঠি দেন।
কিন্তু এর দু‘দিন পর ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালের পাড় থেকে পুলিশ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে। সেই রাতেই ত্বকীর বাবা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দ-বিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ১৮ মার্চ তিনি জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন।
প্রাথমিকভাবে মামলার তদন্ত পুলিশ করলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৩ সালের ২০ শে জুন ত্বকী হত্যা মামলাটি র্যাবের-১১’র কাছে হস্তান্তর। র্যাব হত্যা মামলায় জড়িত সন্দেহে সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন লিটন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে ২৯ শে জুলাই ইউসুফ হোসেন লিটন ও ১২ই নভেম্বর সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে হত্যাকান্ডের জড়িত ১১ জন ও নির্দেশ দাতার নাম।
নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর তার দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের (বর্তমানে প্রয়াত) একমাত্র ছেলে আজমিরী ওসমানের নেতৃত্বে তারই অফিসে (উইনার ফ্যাশনে) ত্বকীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। খুনের পর লাশ বস্তাবন্দি করে আজমেরী ওসমানের গাড়িতে তুলে চারারগোপে নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তীতে ভ্রমর আদালতে এ জবানবন্দি বাতিলের আবেদন করে।
কিন্তু দুই আসামির জবানবন্দির ভিত্তিতে র্যাব-১১, নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের ওই সময়ের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক র্যাব সদস্য ওই বছরই ৭ই আগস্ট দুপুরে প্রায় দুই ঘণ্টা শহরের আল্লামা ইকবাল সড়কে আজমিরী ওসমানের মালিকানাধীন উইনার ফ্যাশন কার্যালয়ে অভিযান চালায় (এ কার্যালয়টি আজমিরী ওসমানের টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত)। ওই টর্চার সেল থেকে র্যাব একটি রক্তমাখা আকাশি রঙের জিন্স প্যান্ট, গুলির চিহ্নসহ সুটকেস ও সোফা, একটি পিস্তলের বাঁটের ভাঙা অংশ, তিনটি লাঠি, চারটি মোবাইল সেট, লাইলনের রশি, একটি কম্পিউটার সিপিইউ, এলসিডি মনিটর, কয়েকটি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা এবং ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
পরে ত্বকী হত্যার ১ বছরের মাথায় ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাবের প্রধান কার্যালয়ে র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের কাছে ত্বকী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে তথ্য প্রকাশ করেন । সে সময় সাংবাদিকদের তারা একটি খসড়া অভিযোগপত্রও সরবরাহ করেন এবং অতিদ্রুতই এ অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করার কথা জানায় র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের ৩ মাসের মাথায় ২০১৪ সালের ৩ জুন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমানের ভাই সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদে আনা শোক প্রস্তাবের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা জানানোর পর থেকেই ত্বকী হত্যার তদন্ত কার্যক্রম থামিয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রফিউর রাব্বি ও তার পরিবারের।
প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাবেই ত্বকী হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছে না :
নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি জানান, সংবিধান অনুযায়ী কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে ৬০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিলের একটি বিষয় রয়েছে। আর তা না হলে এটা বার্ধিত করে ৭৫ দিনের মধ্যে দিতে হয়। কিন্তু ৮ বছর যাবৎ একটা অভিযোপত্র আটকে থাকে না। কিন্ত ত্বকীর ক্ষেত্রে তা ৮ বছর আটকে রাখা হয়েছে। অথচ হত্যাকান্ডের ১ বছরের মাথায় র্যাব এ হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করে সংবাদ সম্মেলন করে । কখন কে কিভাবে কারা এ হত্যা করে তা বিস্তারিত জানানো হয়। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের ৭ বছরেও চার্জশীট আদালতে পেশ করা হয় নি। এ ঘটনা থেকে আমরা বিচার বিভাগের চিত্রটা বুঝতে পারি।
তিনি জানান, কেন কি কারণে কাদের জন্য তদন্ত কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রিতা এবং এর পেছনের কারন তা এখন নতুন করে কিছু বলার নেই। সবাই সবটা জানে। তাছাড়া নতুন করে তো এখানে তদন্তের কিছু নেই। মূলত প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাবেই এ হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছে না। উনি চাইলেই এ হত্যাকান্ডের বিচার করা সম্ভব। কারন ওনার অনুমতি ছাড়া কোনো বিচার কার্য সম্পন্ন হয় না।
কোনো এক রহস্যজনক কারণে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না:
কোনো এক রহস্যজনক কারণে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না উল্লেখ করে সন্ত্রাস নিমূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব, কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ জানান, প্রতিমাসের ৮ তারিখ আমরা মোমবাতি প্রজ্জ্বালনের মধ্য দিয়ে ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি। আমরা আশাবাদি ত্বকী হত্যার বিচার পাবো। এভাবে তো কোনো বিচার আটকে থাকতে পারে না। বিচার তো হতেই হবে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিভাগীয় প্রধান এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম জানান, যতদিন না ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে ততদিন আমরা রাজপথ ছাড়বো না। শুধু ত্বকী নয় সকল হত্যাকান্ডের বিচার আমরা চাই।


