Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

মৌলবাদীদের ট্রানজিট না’গঞ্জ

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২১, ০৮:৩২ এএম

মৌলবাদীদের ট্রানজিট না’গঞ্জ
Swapno

# ঢাকার নিকটবর্তী জেলা হওয়ায় বড় নাশকতার পরিকল্পনার জন্য মৌলবাদী অপশক্তি নারায়ণগঞ্জকে তাদের সুবিধাজনক জায়গা মনে করে #

 

যুগযুগ ধরে নারায়ণগঞ্জ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বাক্ষর বহন করেছে। তবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ গত কয়েক বছর ধরে আলোচনায় আসছে নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হয়ে। ধর্মকে পুঁজি করে হেফাজতের ইসলামীর বদৌলতে ২০১৩ সালের পর আবারো এবছর জ্বালাও পোড়াও, ভাঙচুর দেখেছে নারায়ণগঞ্জ। সম্প্রতি  ২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালে সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের তাণ্ডব এবং ৩ এপ্রিল হেফাজত নেতা মামুনুল হক কাণ্ডে সোনারগাঁয়ে হেফাজত নেতা কাণ্ডে বিষয়টি নিয়ে আবারো ভাবিয়ে তুলছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। নানা সময় দেশের ভয়াবহ জঙ্গী হামলার আসামীরা নারায়ণগঞ্জ থেকে সংগঠিত হয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার হওয়ায় বিষয়টি মাথায় রেখে গুরুত্ব আরোপের ব্যাপারেও জোর দিতে পরামর্শ তাদের।


সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এলাকা বিধায় বিভিন্ন জেলার মানুষ এখানে রুটি রুজির জন্য আসে। সেই সুযোগটাই মৌলবাদী ও বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন কাজে লাগায়। শ্রমিক-কর্মচারী সেজে নারায়ণগঞ্জে তারা আস্তানা গাড়ে। ঢাকার নিকটবর্তী জেলা হওয়ার কারণে বড় বড় নাশকতার পরিকল্পনার জন্য মৌলবাদী অপশক্তি নারায়ণগঞ্জকে তাদের সুবিধাজনক জায়গা মনে করে। জঙ্গি তৎপরতা যখন বেড়ে গিয়েছিলো তখনও নারায়ণগঞ্জ থেকেই অনেক বড় বড় জঙ্গি হামলার আসামীদের গ্রেফতার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ব্যবহার করা হয় নারায়ণগঞ্জকে।


সূত্র জানায়, জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আলোচনায় এসেছিলো। জেএমবির বোমা বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার সালাউদ্দিনের (৩৮) বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দর। তিনি জেএমবির শুরা সদস্য। তিনি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) ছাত্র ছিলেন। ২০০৬ সালে তাঁকে জঙ্গি তৎ্পরতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে চট্টগ্রাম থেকে আটক করা হয়। ২০১০ সালে তিনি কাশিমপুর কারাগারে যান। তিনি ১৩ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, এর মধ্যে তিনটিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা বিচারাধীন আছে।

 

 ২০১৮ সালের ২ মার্চ সকালে প্রকাশ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে গুলি চালিয়ে ও বোমা মেরে জঙ্গি মামলার আসামি সালাউদ্দিনসহ তিন আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন শুরা সদস্য সালেহীনকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ তাকে রেখেছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ অপরাধীদের তালিকায়। সেখানে হাফিজুর রহমান শেখ ওরফে মাহিন নামেও সে নিজেকে পরিচিত করেছে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে পুলিশ। বলা হয়, এই সালেহীনই ত্রিশালে পুলিশ ভ্যান থেকে পালানো আরেক জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম মিজান ওরফে বোমা মিজানকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে জেএমবির নতুন শাখা খুলেছেন, যার নাম তারা দিয়েছেন জামায়াতুল মুজাহিদিন ইনডিয়া। 

 


এখানে শুধু সালেহীনই নয়, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড নিক্ষেপকারী শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েলের বাড়িও নারায়ণগঞ্জ। তিনি নারায়ণগঞ্জে ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভোট ভাই। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও সিরিজ বোমা হামলারও আসামি তিনি। এছাড়া ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলার আসামীও এই শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল। এখানেই শেষ নয়, ২০০১ সালের ১৬ জুন  চাষাঢ়ায় সবচাইতে ভয়ংকর বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। যার নেতৃত্বে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ছিল। যিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামীও ।

 

তিনিও বেশ কয়েকবার নারায়ণগঞ্জে এসে মিটিং মিছিল করেছেন বলে জানা যায়। চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার আসামীও এই মুফতি হান্নান। ২০০১ সালের ১৬ জুন শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে দেশের অন্যতম নৃশংস বোমা হামলার ঘটনায় মারা যান ২০ জন। সেদিন আহত হয়েছিলেন ওই সময়ের ও বর্তমান এমপি শামীম ওসমানসহ অর্ধ-শতাধিক, তাদের অনেকেই এখন পঙ্গুত্বের জীবন কাটাচ্ছেন। বোমা হামলার পরের দিন বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে একটি বিস্ফোরক আইনে ও অন্যটি হত্যা মামলা।

 


সূত্র জানায়, জেএমবির শায়েখ আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর জেএমবির চীফ ড.সাইদুর রহমান সিদ্ধিরগঞ্জে ধরা পড়েন। জেএমবির পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাইদুর। তাছাড়া ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার আসামী মাওলানা আকবর সিদ্ধিরগঞ্জে গ্রেফতার হন। হলিআর্টিজেন বোমা হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম পাইকপাড়া ছোট কবরস্থান এলাকায় একটি বাড়ির তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট  ‘অপারেশন হিট স্ট্রিং-২৭’ ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট। এছাড়া নানা সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একের পর এক নানা অপতৎরতার অভিযোগে গ্রেফতার হন ভয়ংকর সব সন্ত্রাসী। 

 


রাজনীতি সচেতন মহল বলছে,  সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মের কথা বলে সাধারণ মানুষকে উত্তপ্ত করার মিশনে নেমেছে একটি চক্র। ত প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক আদর্শিক চর্চার চেয়ে ব্যক্তিপূজা, ব্যক্তি তোষণ সংস্কৃতির কারণে দলগুলোতে অন্তর্দ্বন্দ্ব, আত্মকলহ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে একটি চক্র। প্রত্যেক রাজনৈতিক চর্চার অভাবে অপরাজনীতি স্থান করে নিয়েছে।বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্ররাজনীতির অনেক দাপট ছিল।

 

পরবর্তীতের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর নানামুখী মৌলবাদী অপশক্তি মাথাচারা দিয়ে উঠলেও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো এসব মৌলবাদী চিন্তাভাবনাকে প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল অতীত এখন অনুপুস্থিত। এখন ছাত্রকর্মীরা, রাজনৈতিক কর্মীরা রাজনৈতিক দলের ‘বড় ভাইদের’ ক্রীড়ানকে পরিণত হচ্ছেন। বড় ভাইদের নির্দেশে নীতি-আদর্শ থেকে সরে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টায় সবসময় সক্রিয় থাকে। বড় ভাইদের প্রতিপক্ষ ঘায়েলের এই নির্দেশ অনেক সময় নিজ দলের নেতাকর্মীরাই হয়ে থাকে। যেহুতু এরা সবসময় পারস্পরিক অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে সেই কারণে সেই সংস্কৃতির অনুপুস্থিতির কারণে নারায়ণগঞ্জ জেলা মৌলবাদীদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। 

 


এব্যাপারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য এড.আনিসুর রহমান দিপু বলেন, ‘এধরণের সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যক্তি তোষণ, ব্যক্তি পূজা থেকে সরে এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন আদর্শিক রাজনীতি করা। এমন চর্চা যতই বাড়বে ততই মৌলবাদী অপশক্তি এখানে পরাজিত হবে। এজন্য দরকার প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শিক ঐক্য।’

 


নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদ বলে, ‘হেফাজতের যে ধরণের তান্ডব দেখছি তা রীতিমত ভয়ংকর। তারা দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে সংগঠিত হচ্ছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অজস্র কওমী মাদ্রাসা তারা গড়ে তুলেছে। কথায় কথায় তারা সড়ক বন্ধ করে দেয়, আগুন জ্বালে। অনেকেই তাদের নারায়ণগঞ্জে এমন অবস্থা তৈরি করতে সহযোগিতা করেছে। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে মনিটরিং দরকার।  

 


নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নীতি-আদর্শের রাজনীতি বুকে ধারণ করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে নষ্ট না হয়, সেটি সুস্থ্য ধারার সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের মাথায় রাখতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থে মৌলবাদী শক্তিকে মাথাচারা দিয়ে উঠতে দেয়া যাবেনা।’

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন