করোনার ক্লাস্টার জেলা হিসেবে দুর্নাম কুড়ানো নারায়ণগঞ্জ ছিল বরাবরই ব্যতিক্রম। এই জেলায় করোনায় সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা যেমন আশংকাজনক রূপ নিয়েছে। তেমনি ধর্ম জাতি ভেদাভেদ ভুলে সকলের সেবায় নিয়োজিত হতেও দেখা গেছে মানবসেবীদের। ডাক্তার, নার্সদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে মহামারী নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এসেছেন অনেকেই।
তাদের কারও নাম উচ্চারিত হয়েছে বহুবার, আবার কেউ নীরবে কেবল সেবা দিতে পেরেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। প্রত্যাশা রাখেননি গণমাধ্যমের আলোচনায় আসার। সব মিলিয়ে যৌথ প্রচেষ্টায় করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে নিচ্ছে সকল শ্রেনীর মানুষ।
করোনার শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে বেশী যেই নামটি উচ্চারিত হয়েছে তা হচ্ছে কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও তার টিম খোরশেদ। করোনা ভাইরাসের আগমনের শুরু থেকে প্রচার প্রচারনা, মাস্ক বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ, লিকুইড সাবান বিতরণ, খাদ্য সরবরাহ, ডিম দুধ সরবরাহ, করোনায় আক্রান্তদের মাঝে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ, আক্রান্ত মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকার, টেলিমেডিসিন সেবা, প্লাজমা ব্যাংক সহ নানা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ ক্লাব খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে (করোনা হাসপাতাল) ৬০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রদান করেছে। করোনায় সংক্রমিত হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবার জন্য প্রদান করা হয়েছে এসকল সিলিন্ডার সমূহ। করোনার দ্বিতীয় ওয়েভে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের এমন মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সকলেই।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের বর্তমান সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু বলেন, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের পক্ষ থেকে শনিবার খানপুর করোনা হাসপাতালে ৬০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছে। মূলত চলমান করোনা ভাইরাসের কারনে রোগীদের অক্সিজেন সেবা খুবই জরুরী। এমন অবস্থায় আমরা ক্লাবের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যরা মিলে হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। আমাদের ক্লাবের সদস্যরাও এই খাতে ডোনেশন করেছেন।
এছাড়া করোনার লকডাউন চলাকালে নারায়ণগঞ্জে এক বেলার আহার চালু রেখেছে নারায়ণগঞ্জের জনপ্রিয় ফেইসবুক গ্রুপ নারায়ণগঞ্জস্থান। এই গ্রুপের পরিচালনা সদস্যরা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে শহরের অসহায় গরীব মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন। বর্তমানেও তাদের কার্যক্রম অব্যহত রেখেছেন বলে জানায় গ্রুপের এডমিনরা।
করোনাকালে রোগীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন বাহন এম্ব্যুল্যান্স। সাধারণত করোনা আক্রান্ত রোগীকে গাড়িতে তুলতে চান না চালকরা। ফলে এম্ব্যুল্যান্স এর বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে ফ্রি এম্ব্যুল্যান্স সেবা দিয়ে আলোচনায় এসেছে নারায়ণগঞ্জের মডেল ডি ক্যাপিটাল গ্রুপ। এই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান এই অভাবনীয় উদ্যোগ নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে হাজির হন। এমন মহানুভবতার কারনে সর্বমহলেই প্রশংসা কুড়িয়ে নেন তিনি।
সেবায় সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে বাম দলগুলো।
প্রতিনিয়ত কোন না কোন ভাবে সাধারন ও খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা। বিশেষ করে গণসংহতি আন্দোলন করোনার শুরু থেকে বিভিন্ন স্থানে জিবানুনাশক ছিটিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সম্মুখসারীর যোদ্ধাদের পাশে থেকে তাদের সহায়তা করেছেন। করোনার সতর্কতামূলক গ্রাফিতি একে সারাদেশেই আলোড়ন তৈরী করেছেন তারা। পাশাপাশি দরিদ্রদের মাঝে সহায়তাও বিতরণ করেছেন।
একইভাবে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের পক্ষ থেকে চালু করা হয়েছে কমিউনিটি কিচেন। এর মাধ্যমে অসহায়, গরীব ও কর্মহীন মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। বাসদের জেলার অন্যতম নেতা আবু নাইম খান বিপ্লব বলেন, এক বছর আগেও মহামারী করোনার সময় লকডাউনে অসহায় ও কর্মহীন মানুষদের মাঝে আমরা খাবার বিতরণ করেছি। এবারও জেলা বাসদের উদ্যোগে সেই কমিউনিটি কিচেন চালু করা হয়েছে। এই সেবা রোজার ৩০ দিনেই চালু থাকবে।
বাম সংগঠনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও দলীয় উদ্যোগেও এগিয়ে এসেছিলো ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি। দলের নেতাকর্মীরা দলীয় এবং ব্যক্তিগত ব্যানারে অসহায় মানুষদের মাঝে সহায়তা বিতরণ করেছেন। গতবছরের ন্যায় এবারও তারা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দলের কর্মীরা।
করোনার প্রথম থেকেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জে ২০ হাজার ৬শ’ দুস্থ পরিবারকে রমজানে খাদ্যসামগ্রী কিনতে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা দিয়েছেন। এ টাকা দেওয়া হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, রকেট বা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে।
এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে ২০ জন করে মোট ৪৮০ জন যুবককে রমজান মাসের জন্য ৪ হাজার ৫শ টাকা করে সম্মানি দেন তিনি।
পাশপাশি করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও ২০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার কথা জানান সেলিম ওসমান। এছাড়াও ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক যারা ত্রাণ ও সেবায় নিয়োজিত তাদেরও নয় লাখ টাকা দেন তিনি। করোনা আক্রান্তদের আনা নেওয়ার কাজে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন।
তবে এই বছর এমন কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে সাংসদ সেলিম ওসমান বলেন, গত বছরের চাইতে এই বছরের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এখন সরকার যেই লকডাউন দিয়েছে তাতেও মানুষ কিছুটা কাজ কর্ম করে খেতে পারে। তবে কিছুটা প্রভাব অবশ্যই পড়ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ফলে এই বছর তেমন কোন পরিকল্পনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে মানুষকে সচেতন হতে হবে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এই কাজটা সাংবাদিকদেরকে বেশী বেশী করতে হবে।


